Saturday, October 13, 2018

ভয়

"বিকাল ৫টা বেজে গেল, তানিয়াটা এখনও এসে পৌঁছাতে পারল না"- দূর্বা ঘাসের পাতাগুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিজের মনেই বিড়বিড় করছিল রিশভ। "আজ ওর একদিন কি আমার একদিন, সপ্তাহে একদিন দেখা করার সুযোগ মেলে, তাও সময়ে আসতে ওর কি যে হয়ে কে জানে"

এইভাবে বিড়বিড় করতে করতেই ডানদিকের পার্কের গেঁটের দিকে তাকাল রিশভ, মনে একটা শান্তি আর চোখে মুখে রাগের ছাপ ফেলে দেখতে পেল তানিয়াকে। আসতে না আসতেই জোর গলা করে বলে উঠল রিশভ-

"এতো কিসের কাজ তোমার বাড়িতে যে একটা দিন সময় করে দেখা করতে আসতে তোমার এতো অসুবিধা হয়?"

তানিয়া কিছু বলল না, শুধু এক গাল হাসি দিয়ে বলল- "দুপুরে কি খেয়েছো?" বলতে বলতে কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে ব্যাগ থেকে একটা টিফিনবাটি বার করে রিশভকে দিয়ে বলল- "পায়েসটা খেয়ে নাও"

কিন্তু রিশভকে দেখে মনেনা হচ্ছে তানিয়ার দেরী করে আসাটার কথা এখানও মন থেকে ক্ষমা করে দেবার মনভাব নিয়ে বসে আছে। পায়েসের বাটিটা হাতে নিয়ে, আবার বলে উঠল-

"কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলাম কিন্তু।" আজ উত্তর জানতেই হবে,মিষ্টি হাসি আজ মায়ার কাজ করলনা রিশভের উপর, ভ্রু কুচকে সহস্র প্রশ্নের হাড়িওয়ালা চোখ নিয়ে তাকিয়ে- "না সত্যিটা বলত আজ, তোমার এতো কিসের অসুবিধা দেখা করতে আসার?"
"কোথায়ে অসুবিধা? এইতো এসেছি, একটু দেরী হয়েগেছে।"- আবারও হেসে বলল তানিয়া।

"একদিন হলে মানতাম, রোজরোজ মানা যায় না, তানিয়া। তোমাদের মেয়দেরই দেখি এতো আসুবিধা। দেখা করতে আসতে অসুবিধা, ফোনে কথা বলতে অসুবিধা, ঘুরতে যেতে অসুবিধা।"

নিজের উপর কথাগুলো সহ্য করতে পারছিল তানিয়া, কিন্তু রিশভের মেয়দের নিয়ে বলাটা সহ্য করতে পারলনা, নিজের মধ্যে একটা অহংবোধ চারা দিয়ে উঠল। মিষ্টি হাসির পিছনের শত সহস্র  প্রতিবাদে জিতে আসা মনটা থেকে শ্রান্ত হাসিটাও মিলিয়ে গেল তানিয়ার। বলল-

"কথায় কথায় না জেনে মেয়েদের নিয়ে কেন মন্তব্য কর? কতটুকু জানো তুমি মেয়েদের জীবন নিয়ে?"

"সব জানি আমি, তোমরা শুধু অজুহাত খোজ আর ভয় পাও, হা, কথা বলতে ভয় পাও, ঘুরতে যেতে ভয় পাও, শুধু ভয় পাও"

"তাই না?"বিনত হাসি দিয়ে তানিয়া মুখ নিচু করে বলল-"হ্যাঁ, আমরা মেয়েরা ভয় পাই।
ঠিক বলেছ, শুধু ভয় পাই। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ভীত থাকে নারীদের মন।" একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে চোখ মেলে তানিয়া আবারও বলে উঠল-"হ্যাঁ ভয় পাই। আমরা ভয় পাই এটা ভেবে যে মায়ের পেটে ৯ মাষ থাকার পর মেয়ে হয়ে জন্মে নর্দমায় মরে যেতে হয়ে। আমরা ভয় পাই শ্যামলা হয়ে জন্মানোর পর থেকেই। ভয় পাই মেয়ে হয়ে জন্মানোর পর ছেলেদের সাথে খেলতে যেতে। স্কুলে প্রথম পিরিয়ডের লাল দাগ দেখে উত্ত্যক্ত করা ছেলে বন্ধুদের সাথে দিতিয়বার কথা বলতে ভয় পাই। বয়ঃসন্ধি কালের পর মায়ের মানা না শুনে দৌড়াদৌড়ি করতে ভয় পাই। ভয় পাই পুরুষ আত্মীয়সজনের চোখে চোখ রাখতে। গরমকালে ছোট প্যান্ট পরতে ভয় পাই। সালওারের সাইডে বেশি কাটতে, বড় পিঠের ব্লাউজ পরতে ভয় পাই। এমনকি ছেলেদের সাথে উঁচু গলা করে কথা বলতে, একটু ভালভাবে মিশতে ভয় পাই। ভালোবেসে বারে বারে কষ্ট পেটে ভয় পাই। বাড়ি ফেরার সময়ে গণ্ডির বাইরে একটু মজা করতে  ভয় পাই। নাইট ডিউটি করে বাড়ি ফিরতে ভয় পাই, এমনকি দিনের বেলায়ে ৫ টা ছেলে এক জায়গায়ে থাকলে সেখান দিয়ে যেতে ভয় পাই। শ্যামলা হওয়াতে সম্মন্ধ আসলে প্রত্যাখ্যাত হতে ভয় পাই। মায়ের আদর, বাবার ভালবাসা ছেঁড়ে স্বামীর নতুন ঘরে যেতে ভয় পাই। স্বামীর পছন্দকে নিজের করে নিয়েও আমার পছন্দগুলোকে অগ্রাহ্য করতে ভয় পাই। বিবাহিত বলে প্রতি রাতে স্বামীর ব্যবহার হতে ভয় লাগে। ৯ মাষ পেটে রাখার পর নিজের অংশকে পৃথিবীতে আনতেও মেয়েরা ভয় পায়। সংসার সামলে, চাকরি সামলে, অফিসের ইভ টিজিং দূরে রেখে, স্বামিকে সামলে সন্তান বড় করতে ভয় পাই। স্বামীর ঘরকে নিজের করে বানিয়ে, সন্তানের অব্বগ্যা শুনে সেই ঘর ছেঁড়ে বৃদ্ধাশ্রমে মরতে নারীজাতি ভয় পায়।
হ্যাঁ রিশভ, তুমি ঠিকই বলেছ, আমরা মেয়েরা ভয় পাই"

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে ...