বর্ষার পরের বিকালটা খুব মিষ্টি আমার কাছে। জুন মাসের বাতাসটাই খুব মলায়ম। গরমের ছেঁকার পরে প্রিয়জনের মুখের থেকে আসা ঠাণ্ডা ফুঁ-এর মতন। তাই বিকালবেলাটা একটা সিগারেটের সাথেই আমি রাস্তায়ে নিজের সাথে সময় কাটাই। রোজ অবশ্য হয়ে ওঠেনা। আমি ড্রাইভার তো, তাও বাইকে।
ছিলাম না ভালো পড়াশুনাতে। কোনমতে গ্রাজুয়েট করি, অশিক্ষিতের তকমা যাতে প্রতিবেশীরা গায়ে না দিতে পারে। খুব শিগগির বুঝে যাই, বাবু হয়ে মাসিক মায়না পাবার কোন কাজ আমি পারবোনা। বাইক চালাতে পারতাম তাই অ্যাপ এর মাধ্যমে মানুষের সহযাত্রী হয়ে তাদের গন্তব্যে পৌঁছেদি। মাসিক সামান্য বেতন আর যাত্রীদের দাওয়া ভাড়ায় দিন বেশ ভালই কেটে যায়।
সন্ধ্যে ৬.২০ বাজবে হয়তো। শিবু-দার দোকানে রোজের মতন চা আর সিগারেট নিয়ে বসেই ছিলাম। গঙ্গার ধারের হাওয়া আর শিবু-দার দোকানের ভাঁড়ের চা- নিজের জন্য কাটানো এই অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতি যেন রোজ আমি মনের কোনে বাক্সবন্দি করে রাখতে চাই। যেদিন জীবন কোন কঠিন সময়ে ফেলে দ্যায়, আমি সেই বাক্স থেকে ওই অনুভূতিগুলোকে চুমুক দিয়ে রষাস্বাধন করি।
হটাতই ফোনে নোটিফিকেশান এলো। বলছে- "কাজে লেগে পর"। একজন যাত্রীকে তুলতে যেতে হবে। দেরী না করে, হেলমেট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ১.৭ কি.মি দূরে যেতে হবে ৬ মিনিটে। সঠিক সময়ে পৌঁছে গেলাম। ফোন করে নিশ্চিত করে বললাম যে আমি এসেগেছি।
যাত্রীর হেলমেটটা বার করছিলাম। হটাত একটা চেনা গলা শুনতে পেলাম। বলল... " দাদা, পানপারা যাব। চলো"
খালি ঘরে ঝড়ো হাওয়া যেভাবে দরজাকে সপাটে বন্ধ করে, ঠিক তেমনই বুকের ভীতরে একটা আওয়াজ করল। ঘাড় ঘুরিএ দেখার আগেই আবার বুকের ভীতরে সেই আওয়াজটা করে উঠল। একটা চেনা হাত বাঁ কাঁধে এলো। সেই আঙ্গুল গুলো যত শক্ত করে আমার কাঁধের জামাটা ধরছে, আমার বুকের ভিতরের আওয়াজটাও আরও জোরে জোরে হচ্ছে। ঝড়ো হাওয়াটা আমার সব মনটাকে উথাল পাতাল করে দিচ্ছিলো। বুঝতে পারলাম শাড়ী পরা এক যাত্রী আমার বাইকের পিছনে বসেছে, বসেই কাঁধের হাতটা সরিয়ে নিলো। আমি কিছু বুঝলাম না। বাইক স্টার্ট করে দিলাম। পানপারা -আমি চিনি। তাই মাথায় চেনা রাস্তাটা মনে পরেগেল। মনে একটা কৌতূহল দানা বেঁধে ছিল... "কে ইনি"। ছটফট করা মনটা বলল লুকিং গ্লাসে তাকাতে। চোখটা সেদিকে যেতেই আবার সেই আওয়াজটা সপাটে বেজে উঠল। হেলমেটের ভিতরে থাকলেও ওই চোখ দুটো আমি খুব ভালো চিনি। হাঁ... ও নেহা ছিল।
মিনিট ২০ আমি নেহার সাথে বাইকে ছিলাম। সেই ২০ মিনিট আমার জীবনের ৭ বছরের সব পুরানো স্মৃতি এক নিমেষে চোখের সামনে দিয়ে চলে গেছিল। ৭ বছরের পুরানো ভালোবাসা আজ আমছলছে।পাশে বসে, আমারই সাথে চলছে কিন্তু মাঝখানে অনেক বারণ। সাইকেলে চরা প্রেমটা আজ এভাবে ফিরে আসবে বুঝিনি। বুকের ভিতরটা থম ধরে আছে। মিনিট ২০ পর পানপারায় আমি নেহাকে নামিয়ে দিলাম। ও ভাড়া দিয়ে চলে গেল। আমি নির্লজ্জের মতন ওর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম ঠিক যেমনটা ওঁকে আগে বাড়ি দিয়ে আসার সময়ে দেখতাম। ... দেখলাম ও পানপারা পার্ক থেকে একটা ফুলের মতন মিষ্টি মেয়ের দিকে ছুটে গেল। দুপাশে ঝুটি করা ওই পুছকি মেয়টা "মা" বলে ডেকে নেহাকে জরিয়ে ধরল। ওরা চলে গেল...
হেলমেটটা খুললাম। হাতের টাকাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বুকের ভিতরটা আর বন্ধ থাকল না। ৭ বছরের পাথরটা আজ আর ভার রাখতে পারল না। অঝোরে কেঁদে ফেললাম।
মনের ভীতরে হাওয়া ঝোড়ো;
আজ তুমি অন্য কাঁরও...