Thursday, September 13, 2018

নিস্তব্ধতা

"আজ বিকালটা যেন কাটতেই চাইছে না। কলেজের ল্যাবটাও আজ তারাতারি শেষ হয়ে গেল।"- বিড়বিড় করে এই কথাটা বলে বিছানাটা ছেঁড়ে উঠে পড়ল সুদীপ। বিছানা ছেঁড়ে ৪-৫ হাত দূরে ড্রেসিং টেবিল পর্যন্ত পায়চারি করছিল, হটাত কি মনে হোল ; বিছানার নীচে সিগারেট আর দেশলাইয়ের বক্সটা বার করে নিয়ে বিছানার পাশের বাল্কনির দরজাটা খুলে বাইরে এলো।

আশ্বিনের বিকাল। সূর্যটা তখনও পুরোপুরি ডোবেনি। আকাশের এক কোনে যেন কে এক ছড়াক আবীরের লাল রঙটাকে ছড়িয়ে দিয়েছে। সুদীপ একটা সিগারেট বার করে জ্বালিয়ে বাল্কনিতে দাড়িয়ে আছে ওই লাল রঙের আকাশটাকে স্থির চোখে তাকিয়ে। আনমনা মনে হটাতই ওর চোখ পড়ল সামনের বাড়ির জানলাটার উপর। রিমা যে জানলার ধারে বসেই ছিল, সুদীপ সেটা বুঝতেই পারেনি।

রিমা, সুদীপের কলেজেই পরে। সেই ছোট্ট বেলা থেকে ওরা দুজন দুজনকে চেনে। একসাথে বড় হওয়া, একসাথে খেলাধুলো, একসাথে বন্ধুত্ব, একই সাথে একই সাবজেক্ট নিয়ে কলেজে প্রবেশ। এক সাথে বড় হওয়া বন্ধু গুলোর মতন ওদের মধ্যে কোন রেষারেষি ছিলনা কোনোদিনই। কলেজটা যত শেষের দিকে এগিয়ে আসছে, সুদিপ-রিমার সম্পর্কের সেঁকলটা ততো ওদের আস্টেপিস্টে বেঁধে ফেলেছে। বলাই বাহুল্য, সুদীপ আর ওর নিজের জীবনটাকে রিমা ছাড়া ভাবা শুরু করেনি। ওর ভাবনা- যেমনটা করে ওদের জীবনের ২৪ টা বছর কেটে গেছে, বাকি জীবনটাও সেভাবেই বন্ধুত্ত-স্নেহ-খুনসুটিতে কেটে যাবে।
কিন্তু এমনটা হয়েতো ওদের বাবা-মা ভাবেনি। গত পরশু কানা-খুসোতে সুদীপ জানতে পারে, রিমার বাড়িরতে ছেলে দেখাশুনো চলছে। যাচাই করতে কাল সুদীপ, রিমাকে জিজ্ঞাসা করেছে, কিন্তু কোন লাভ হয়েনি। ব্যাপারটা রিমাও প্রথম শুনেছে সুদীপের মুখ থেকে, রিমাও তাই আশ্চর্য হয়ে যায়ে। এই নিয়ে ওরা আর আলোচনা করেনি নিজেদের মধ্যে। ওরা দুজন এখনও বিচ্ছেদের ব্যাথা অনুভব করেনি।

আজ হয়েতো সেই কথাগুলই সুদীপকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। জানলাতে চোখ পরতেই সুদীপ তাই সেই পরিচিত চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ছিল। কি যেন একটা বই পরছিল রিমা। হটাত একটা দমকা হওয়া দিল। হরিণী ওই চোখ দুটো থেকে রেশমি চুলটা সরাতে রিমাও দেখল ওর সাথীকে, বাঙ্কলিতে দাড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে। কত কি বলা বাকি থেকে গেল , সুদীপের চাওনিতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাছে। হয়েতো একটু ভুল বলা হোল, রিমার চোখে আজ সেই প্রফুল্লতা কেমন মলিন হয়েগেছে সুদীপকে দেখে। এক দৃষ্টিতে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে, একটা শূন্যটা দুজনকে ভিতর থেকে খেয়ে ফেলছে। দুজনে জীবনের বইটা লেখা শুরু তো করেছিল, কিন্তু শেষটা লিখতে পারবে কিনা সেটার কোন সম্ভাবনা ওরা খুজে পেল না। একে অপরের চিন্তায়ে হারিয়ে ফেলা  মনে সুদীপ নিজেকে খুজে পেল যখন বুঝতে পারল ওর হাতের সিগারেটটা জ্বলে ওর আঙুলে সেঁকা দিল। হাত নাড়িয়ে সিগারেটটা ফেলে দিতেই সুদীপ এক চেনা হাসির আওয়াজ শুনতে পেল, দেখতে পেল সুদীপের বাড়ির বাল্কনির উল্টো দিকে থাকা মেয়েটির অপরিম্লান হাসিটা এখানও একই রকম আছে।

Tuesday, September 4, 2018

খুশির দিন

আজ সকাল থেকেই অজানা খুশিতে মিনু ঘরের কাজ করে যাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে বাসি কাজ সেরে মিনু সকালের জল খাবার তৈরির প্রস্তুতি করছে আর গুন গুন করে কি যেন একটা গান ধরেছে। "আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রান সুরের বাঁধনে---" বোধ করি এই গানটাই গুন গুন করে গাইছে। হটাতই গান বন্ধ করে দিয়ে তারস্বরে চিৎকার করল- "অঅঅঅঅমিমিমিতততত!!!!!"
-"উউঠছি"- ভিতরের ঘর থেকে বালিশে চাপা মুখ থেকে খীণ স্বরে ভেসে এলো আওয়াজটা।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার কাজে মন দিল মিনু। ঠিক যেন হটাত বিস্ফোরণের পরের স্থির পরিবেশের মতন।

অমিত,২৯ বছর বয়সই একটা প্রোডাক্ট কোম্পানির ব্যাস্ত ম্যানেজার। বাড়িতে এসে রাতের খাবার খাওয়া, রাতের ঘুম আর ভোরবেলা স্নান সেরে আবার অফিস যাওয়া- বাড়ির সাথে তার এইটুকুই সম্পর্ক। এমনকি রবিবারও সে বাড়িতে ল্যাপটপে কাজের রাশি নিয়ে বসে থাকে। সহজ সরল জীবন জাপনের থেকে মুখ সরিয়ে ধকলমূলক ব্যাস্ত কাজে অমিত নিজের খুশি খুজে পায়ে।

অপরদিকে- মিনু ওরফে মানসী, ২৭ বছরের প্রাপ্তবয়স্কা শুভ্র, শান্ত, সুশ্রী, স্রান্ত একটি মেয়ে, যে বাঁধনছাড়া জীবন থেকে বেরিয়ে এসে সে প্রনয়ে বাঁধা পরেছে। সে ব্যাস্ত, নিজের সংসারকে স্বপ্নের সংসারে পরিনত করতে,সে ব্যাস্ত, স্বামীর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে, উড়িয়ে দাওয়া খুশির ডানা গুলোকে লাগাম দিয়ে নিজেকে কারো মনের মতন করে তুলতে ব্যাস্ত, সর্বোপরি ওর ওই লাল সিঁদুর-শাঁখা-পলাকে জিয়িয়ে রাখতে সে ব্যাস্ত।

-"কি করছ মিনু?"- ঘরের ভিতর থেকে গম্ভীর গলায়ে জিজ্জাসা করল আমিত।
-"চা বসালাম, রুটি তরকারী করব এরপর, তুমি তারাতারি তৈরি হয়ে নাও" অনুরাগী মন, নিজ মনে হেসে মিনু আবারও বলল- "আজ জানো তোমার প্রিয় বাটার পনিরটা করব ভাবছি"

কথাটা শেষ হতে না হতেই ঘর থেকে কি যেন খছ খছ আওয়াজ এলো। সন্দেহের মতন করে একবার ভেবে মিনু আন্দাজ করলো অমিত হয়তো নতুন টুথ ব্রাশ খুঁজছে। আনমনা হয়ে গুন গুন করতে করতে আবার নিজের কাজে মন দিল সে।

রান্নাঘরে হটাত বজ্র বিদ্যুতের মতন আবির্ভাব ঘটল আমিতের। কাজে ব্যাস্ত মিনু সবজি হাতেই ঘুরে দাঁড়ালো।এ যেন এক হাসকর রূপে! মিনুর এক হাতের পনিরের এক টুকরো, তাই নিয়ে ও ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আমিতের দিকে; কালকে রাতের বাসী নমনীয় কাপড় পরা, চুল এলমেল, ঘুম ভরা চোখ আর হাত দুটো পিছনে করে রাখা। আকস্মাত উদয়নে বিস্মিত মিনু বলল "কি হয়েছে?"

২ সেকেন্ড সব স্তব্ধ। আমিত একটা মলিন হাসি হাসল।

এ যেন সেই ব্যাস্ত মিনুর জীবনের এক বিরল দিন। না! ব্যাস্ততায়ে সদ্য বিবাহিত সম্পর্ক ভুলে যাবার ছেলে আমিত নয়। এর আগেও অনেকবার কাটা সবজি থেকে গাজর তুলে খেয়ে নাওয়া, এঁটো বাসন রান্নাঘরে এসে রেখে দাওয়া, ব্যাস্ত কাজে বিরক্ত করতে এসে পিছন থেকে মিনুকে আদরের আলিঙ্গন- এসবে মিনু ওয়য়াকিবহল। কিন্তু আজ যেন সেসব ইঙ্গিতের কোন লক্ষন পেল না মিনু আমিতের আকস্মাত উদয়নে।

হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল আমিত। অপ্রত্যাশিত মিনুর মন তখন, চখ দুটো বড় হয়ে গেলো, হাত থেকে পনিরের টুকরোটা পরে গেলো। আমিত পিছনে রাখা হাতটা  সামনে আনল। বিস্মিত মিনুর চোখ তখন আমিতের হাতের দিকে। 

একটা লাল গোলাপ আর একটা চকোলেটের প্যাকেট মিনুর দিকে বাড়িয়ে অমিত বললো -

তুমি চাইলে মেঘ হবো ,এনে দেবো বৃষ্টি ।।
তুমি চাইলে আকাশ,হবো ,হবো হাসির মিষ্টি ।।
তুমি না চাইলেও জনম জনম ,,
বাসবো তোমায় ভালো ।।
তুমি চাঁদ নও, তবে চাঁদের আলো।
তুমি ফুল নও, তবে ফুলের সৌরভ।
তুমি নদী নও, তবে নদীর ঢেউ।
তুমি অচেনা নও, তুমি আমার চেনা কেউ॥
““শুভ জন্মদিন সোনাই!!””

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে ...