Thursday, December 27, 2018

কলঙ্কিনী রাঁধা

আজ সকাল থেকেই দিদিভাই খুব সেজে গুজে ছিল। ও এতো সকালে সেজে গুজে অফিসে যায় না। জানিনা কেন। যাইহোক, আমি রোজকারের মতন সকালে উঠে ঘরের কাজ গুলো করে, খাবার খেয়ে পরতে বসে গেছিলাম। দিদিভাই আর বাবা খেয়ে বেরিয়ে গেছে। এবার ঘর একলা, শান্তি। আমি নিশ্চিন্তে পরতে বসে গেলাম। আমার আবার সামনেই পরিক্ষা। তার উপর আজ বিকালের পড়াটা বাতিল করতে হল। বিকালে জানিনা ভুলভাল কে সব আসবে। জানিনা বাবা! কিসব শুরু করেছে বাড়িতে, আমি এমনই ছোট্ট; সবে বি.এ ২য় বর্ষ।

ভুলভাল বলে কথাটা উড়িয়ে দিলেও আজ আমার জীবনে একটা বড় পরিক্ষা- মা এই কথাটা কেন যে মাথায়ে ঢুকিয়েছিল। আজ আমাকে দেখতে আসবে। তাই সারাটা দিন মাথার মধ্যে একটা গুমোট চিন্তা বাসা বেঁধে পরে ছিল। বিকালের শাড়ীটা দিদিভাই পছন্দ করে বিছানার উপর রেখে গেছিল, আর ওই শাড়ীটার দিকে চোখ গেলেই আরও চিন্তা গুলো নড়ে চড়ে বসে। নীলাভ সবুজ শাড়ীটা, উপরে কালচে বেগুনী রঙের জড়ির কাজ করা, পড়লে এতো মখমলে আর মলায়ম যে অন্যান্য জামদানী শাড়ীর মতন চলা ফেরা করতে অসুবিধা হয়ে না। তাই এই শাড়ীটা ওর খুব পছন্দের।

সকাল থেকে ২০-২৫ বার ফোন করে আমার খোঁজ নাওয়া হয়েগেছে ওর। এইতো দুপুরে খাবার পর ফোনে মাকে বলছে- টুলু যেন খেয়ে না ঘুমিয়ে পরে। স্নেহ, মমতায়, ভালোবাসা, আদর, শাসনে দিদিভাই আমার দ্বিতীয় মা।

ঘড়ীর কাঁটায়ে ৪.৩০ তখন, মা বলল তৈরি হতে। ছেলে বাড়ি থেকে নাকি ৬ টার দিকে আসবে। বাবা, ছেলে বাড়ির লোকজনকে ফোনে বাড়ির পথের দিকগুল বলছে মনে হয়ে। মা কি যেন করছে রান্না ঘরে। আমি একগুচ্ছ উত্তেজনা আর উদ্দেক নিয়ে নিজেকে আয়ানায় সাঁজাতে ব্যাস্ত। এমনই সময়ে শাঁখের কড়াত! আজই টি.ভি সারানোর মেকানিকটা এসেছে। শাড়ীতে সেফটি পিনটা লাগাতে যাব আর ওইদিকে ছেলে আর ছেলে বাড়ির লোকজন এসেগেল। কি আর হবে! বাবা ওদেরকে আমার ঘরেই বসাল। কারন দস্যু মেকানিকটা ওই ঘরে টি.ভি নিয়ে বসেছেন।

হলুদ টি- শার্ট, একটা জ্যাকেট আর জিন্‌স পরে চলে এসেছে দিব্যি ছেলেটা, ভুল! যুবকটা। আমি মনে মনে যতটা বুড়ো আর খারাপ ভাবছিলাম, ততটাও খারাপ নয়। শাড়ী ঠিক করার নাম করে ৩ বার দেখেও নিএছি। অগত্যা পাথরের মতন চেয়ারে বসতে হল। কিন্তু যতটা উদাসিন হবো ভেবে বসেছিলাম, ততটা হইনি। ছেলে আর ছেলে বাড়ির লোকজন খুব অমায়িক আর সরলপ্রাণ। খুব অল্প সময়েই একটা স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশের শুরু হয়েগেছিল। সেটা বেশিক্ষণ থাকল না। তীরের বানের মতন একটা প্রশ্ন এলো ওদের তরফ থেকে- " আচ্ছা! বড় মেয়ের বিয়ের বাপ্যারে ভাবেননি? "

২ সেকেন্ডের জন্য সবাই চুপ। মায়ের হাসিটাও হারিয়ে গিয়ে একটা কৃত্রিম হাসি বেরিয়ে এলো। তারপর একটা স্থব্ধতার মধ্যে মা কিছু কথা ওদেরকে বলছিল যেই কথা গুলো আমি মনে করতে চাইনা কোনদিনও।

মা বলল- তখন ২০১৬ সাল, তুকাই, আমার বড় মেয়ের খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল। ওর ভালো নাম শ্রেয়সী। সে কি মজা। আমাদের বাড়ির প্রথম বিয়ে। খুব হুল্লোড়। ছেলের বাড়ি থেকে জানেন ৩ তোলার একটা হার আমার মেয়েকে দিয়েছিল। খুব আনন্দ হয়েছিল বিয়ের দিন। কত্ত বাজি পোরানো হয়েছিল। খুব আনন্দের সাথে দিনটা কেটেছিল। ওর বাবা, মানে আমার হাসব্যান্ড একটা বড় চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। বিয়ের দিন রাতে ওনার হাসি মুখটা আজও মনে পরে আমার।
বউ ভাতের দিন আমরা আবার মজা করে গাড়ি নিয়ে ওদের বাড়ি যাই। গিয়ে দেখি তুকাইের চোখ লাল। প্রথমে ভাবলাম আমাকে দেখে কাঁদছে হয়েতো, কোনদিন আমাকে ছেঁড়ে থাকেনি। কিন্তু না। মেয়ে জানাল আমাকে- মা! কালরাত্রিতে, ছেলে আমাকে আলাদা করে ডেকে বলল- একটা কথা বলি, দয়া করে কাওকে জানিও না। তোমার যত খুশি শপিং করার করো, সোনায় মুরিয়ে রাখব তোমাকে, কিন্তু দয়া করে কোনদিন কাওকে জানিও না যে আমি যৌনসঙ্গমে শক্তিহীন।
কি আর বলি দুঃখের কথা, মেয়ের কান্না আর ওই কথা শুনে রক্ত হিম হয়ে যায়ে আমার, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। সাথে সাথে ওর বাবার হার্ট এটাক।
দেড় বছর লাগে। কোর্টের মামলার রায় বেরোয়। তুকাইের বিয়েটা নাকচ করা হয়। এটা কোর্টের ভাষায় নালিফায় বিয়ে, ডিভোর্স নয়। কারন ও ছেলের বাড়িতে ৩দিন থেকেছিল। সম্পর্ক তো দূর, কাঁদতে কাঁদতে মেয়টার জীবন শেষ হয়ে গেছিল।
সব সেরে উঠতে ২ বছর লাগে। তুকাই তাই বলে- টুলুর বিয়েটা আমি সামনে দাড়িয়ে দেব।

২ বছরের অবসাদটা মা কয়েকটা লাইনে ওদেরকে জানিও দিল। মিষ্টি খাওয়া দাওয়া আর কিছু প্রশ্ন উত্তরের বৈঠক শেষ করে ছেলে আর ছেলে বাড়ির লোকজন চলে গেল।

রাত ১০.৩০। দিদিভাই,মা আর আমি আমার ঘরেই বসেছিলাম। দিদিভাইকে সব বলছিলাম। চুলে ঢাকা মাথা নিচু করে রাখা দিদিভাইয়ের মুখটা দেখতে পাছহিলাম না। মুখ তুলতেই সেই বউ ভাতের দিনের মতন চোখ লাল করে মায়ের দিকে তাকিয়ে দিদিভাই বলল- মা, আবার বলছি , টুলুর বিয়েটা আমি সামনে দাড়িয়ে দেব। ওর মুখের হাসি দেখলেই আমি সুখি হবো। ১ টা বাচ্ছা বা ২ টো বাচ্ছার বাবাকে আমি বিয়ে করতে পারবো না মা। আমি ডিভোর্সি মেয়ে নই, ৩ দিনের সিঁদুরের বিয়ে আমি মানি না। আমি কলঙ্কিনী রাঁধা। আমাকে বিয়ের জন্য জোর করো না মা।

বাইরে চলে আসি। মাকে জরিয়ে দিদিভাইকে কাঁদতে দেখতে পারছিলাম না আমি।
৩ দিনের সিঁদুরের বিয়ে আমি মানি না মা

Wednesday, December 5, 2018

দশ টাকা

"দাদুভাইইইইইইইইই!!!!" ভারী পরিনত অথচ তীব্র গলার আওয়াজ শুনলাম।

দাদুবাড়িতে আমার সব থেকে প্রিয় ডাক। আগে "মুন" বলে দিদুন ডাকত। দিদুন চলে যাবার পর ওই বাড়িতে আমার ঘুরতে যাবার জন্য যে সব থেকে বড় অপেক্ষা করে সে হল আমার দাদুভাই।

আমি হলাম মডার্ন নাতি। সকালের গরম দুধ চা আর খবরের কাগজে সকাল হয়ে না আমার, ফেসবুকের নোটিফিকেশান চেক করেই আমার সকাল হয়ে। সেই দিনটার শুরুটাও অন্যথা হয়েনি। তাই দাদুভাইের ডাকটা রীতিমত অবজ্ঞা করে দিলাম। মোবাইলের ৬ ইঞ্চির স্ক্রিনটা আমার সমস্ত ধ্যান, ভাব, বিবেচনা, একাগ্রতাকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে একটা কাল্পনিক জগতের মধ্যে, যেখানে থেকে আমি বাস্তবিক স্নেহ, আদর, ভালবাসাকে অনুভব করতে পারিনা।

"দাদুভাই, চল ঘিএর পরোটা খেয়ে আসি" আমার কোন সাড়া না পেয়ে দোতলা থেকে দাদুভাই আবার আমাকে বলল।

শিবু ময়রার দোকানের ঘিএর পরোটা,সাথে ছোলার ডাল; শালপাতা থেকে পরোটা একটা টুকরো নিয়ে ছোলার ডালে ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে মুখে দিলে প্রথম যে নিঃশ্বাসটা নাক দিয়ে বেরোয়, সেটা ঘিএর; তারপর ময়দা ভাঁজাটা ডালের সাথে মেখে যখন মুখের চারপাশে দাঁত দিয়ে পেষা হয়ে- আমি স্বর্গ সুখ পাই। তাই পেটুক বলে জিভের লালসাটাকে অবহেলা করতে পারলাম না। সাড়া দিলাম- "চলো, যাচ্ছি দাদুভাই"

ফোনটা রেখে জামাকাপড় পরে দোতলা চলে গেলাম। দেখি দাদুভাই আগে থেকেই তৈরি হয়ে বসে আছে, ধবধবে সাদা পায়েজামা আর সিফন ধুতি, সাথে এক গাল হাসি আর বলল- " এইযে দাদুভাই, কই ছিলে? আমি কখন থেকে ডাকছি। শোন আর দেরী করও না, চলো বেরোই। ওই কোনা থেকে আমার লাঠিটা দাওতো"

আমি আমার কোম্পানিতে টিম লিড, তাও দাদুভাইএর কাছে আমি ছোট নাতির মতন প্রবৃত্তিটা রেখে দিয়েছি।
দরজার পাশ থেকে লাঠিটা এনে দিয়ে দুজনে বেরিয়ে পরলাম আসতে আসতে। ঠিক যেমনটা বছর ২০ আগে আমার ছোট্ট হাতটা ধরে দাদুভাই ঘুরতে নিয়ে যেত।

মিনিট আটেকের রাস্তা আমরা ১৬ মিনিটে পৌঁছালাম। শিবু ময়রা এখন আর বেঁচে নেই তবু তার নামের দোকানটা ওনার ছেলে বাবার মতনই চালিয়ে যাছে। দাদুভাই আস্তে আস্তে দোকানের ভিতরে ঢুকে বলল- "কই হে! দুটো করে পরোটা দুই জায়গায় দাও হে দেখি।" আমি সুবোধ বালকের মতন বসে রইলাম।

মিনিট দুয়েক পর পরোটা এসে গেল, দাদুভাই একগাল হাসি দিয়ে বলল-" এই নাও দাদুভাই! গরম গরম খেয়ে নাও"। তারপর দুজনেই পরোটা খেতে মনোনিবেশ করলাম। আমি যেন সেই ছোট্ট বেলার দিনের সুখ ফিরে পাচ্ছিলাম। পরিনত বয়স বলে স্বভাবতই দাদুভাইএর খেতে সময়ে লেগেছিল, তাও আমি খাবার পর হাত ধুয়ে এসে বসলাম। দাদুভাই হাত ধুয়ে কোচল থেকে ৪০ টাকা আর কিছু খুচরো পয়সা নিয়ে দোকানদারকে দিল। আমি ওয়ালেট বার করে ১০০ টাকা বারিয়ে দিতেই ভ্রু কুচকে দাদুভাই তীব্র স্বারে বলল- "পইসা সরা। আমি দিছি তো"

তুমি থেকে তুইতে দাদুভাইের কথা শূনতেই আমি একটু ভয়ে পেয়ে যাই, ছোট্ট বেলা থেকেই ভালবাসা আর ভয়ের অন্যতম স্থান হল দাদুবাড়িতে, দাদুভাইএর উপর। আমি চুপ করে গেলাম। অথচ উৎসুক মন দেখছে  দাদুভাই কিছু একটা খুজছে কোচলে, কিছুক্ষণ পর টের পেলাম যে ৫০ টাকা দিতে পেরেছে, আরও ১০ টাকা বাকি, সেটাই কোচলে হাত বারিয়ে খুঁজছে।

ওয়ালেট পকেটে ঢোকাবোই কি এই দৃশ্য দেখে ১০ টাকা বার করে আমি চুপিসারে দোকানদারকে দিয়ে দিলাম। রৌদ্রের আলোয়ে চিন্তিত দাদুভাইকে ডেকে দোকানদার বলল- "কাকামশাই, হয়েগেছে, আর তো টাকা লাগবে না"

৩২ বছর ব্যাবসাদারের ১০ টাকার হিসেব ভুল হতে পারে না। জিজ্ঞাসা করল ঘুরে- "কেন হে! ৪টা পরোটা ১৫ টাকা করে ৬০ টাকা হয়ে, ৫০ টাকা আমি দিলুম যে!"
"ও লাগবে না কাকামশাই!"- দোকানদার একটু হেসেই বলল।
"ও আচ্ছা"- মনে অনেক প্রশ্ন রেখেই একটা সম্মতিজনক উত্তর দিল দাদুভাই।

দুজনেই বাড়ি ফিরে এলাম। আমার শুধু দিনটাই মনে থেকে গেল। অনেক প্রশ্ন নিরুত্তর থেকে গেল। "কেন দাদুভাই দোকানদারের মিথ্যে কথাটা ধরতে পারল না?", "সবটা জেনে শুনেই কি দাদুভাই চুপ থেকে গেল?", "নাকি বয়সের ভারে ওত হিসেবের খুঁটিনাটি দাদুভাই বুঝতে পারেনি?", "আমি টাকাটা দিয়ে দাদুভাইকে ছোট করলাম না তো?"

কোন উত্তর নেই আমার কাছে। তবুও এখন মনে হয়ে, স্বর্গসুখটা মনে হয়ে পরোটা খাওয়াতে নয়, স্বর্গসুখ হল জীবনে প্রথম আর শেষবার দাদুভাইকে ১০ টা টাকা দিয়ে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছিলাম।

হাসি মুখী শরীরটা জ্বরা জীর্ণ হয়ে কাঁধে উঠলেই শোনে হরিনাম
জানিনা কোথায় আছো? ভালো থেকো, লহো শত সহস্র প্রণাম ।।

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে ...