"দাদুভাইইইইইইইইই!!!!" ভারী পরিনত অথচ তীব্র গলার আওয়াজ শুনলাম।
দাদুবাড়িতে আমার সব থেকে প্রিয় ডাক। আগে "মুন" বলে দিদুন ডাকত। দিদুন চলে যাবার পর ওই বাড়িতে আমার ঘুরতে যাবার জন্য যে সব থেকে বড় অপেক্ষা করে সে হল আমার দাদুভাই।
আমি হলাম মডার্ন নাতি। সকালের গরম দুধ চা আর খবরের কাগজে সকাল হয়ে না আমার, ফেসবুকের নোটিফিকেশান চেক করেই আমার সকাল হয়ে। সেই দিনটার শুরুটাও অন্যথা হয়েনি। তাই দাদুভাইের ডাকটা রীতিমত অবজ্ঞা করে দিলাম। মোবাইলের ৬ ইঞ্চির স্ক্রিনটা আমার সমস্ত ধ্যান, ভাব, বিবেচনা, একাগ্রতাকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে একটা কাল্পনিক জগতের মধ্যে, যেখানে থেকে আমি বাস্তবিক স্নেহ, আদর, ভালবাসাকে অনুভব করতে পারিনা।
"দাদুভাই, চল ঘিএর পরোটা খেয়ে আসি" আমার কোন সাড়া না পেয়ে দোতলা থেকে দাদুভাই আবার আমাকে বলল।
শিবু ময়রার দোকানের ঘিএর পরোটা,সাথে ছোলার ডাল; শালপাতা থেকে পরোটা একটা টুকরো নিয়ে ছোলার ডালে ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে মুখে দিলে প্রথম যে নিঃশ্বাসটা নাক দিয়ে বেরোয়, সেটা ঘিএর; তারপর ময়দা ভাঁজাটা ডালের সাথে মেখে যখন মুখের চারপাশে দাঁত দিয়ে পেষা হয়ে- আমি স্বর্গ সুখ পাই। তাই পেটুক বলে জিভের লালসাটাকে অবহেলা করতে পারলাম না। সাড়া দিলাম- "চলো, যাচ্ছি দাদুভাই"
ফোনটা রেখে জামাকাপড় পরে দোতলা চলে গেলাম। দেখি দাদুভাই আগে থেকেই তৈরি হয়ে বসে আছে, ধবধবে সাদা পায়েজামা আর সিফন ধুতি, সাথে এক গাল হাসি আর বলল- " এইযে দাদুভাই, কই ছিলে? আমি কখন থেকে ডাকছি। শোন আর দেরী করও না, চলো বেরোই। ওই কোনা থেকে আমার লাঠিটা দাওতো"
আমি আমার কোম্পানিতে টিম লিড, তাও দাদুভাইএর কাছে আমি ছোট নাতির মতন প্রবৃত্তিটা রেখে দিয়েছি।
দরজার পাশ থেকে লাঠিটা এনে দিয়ে দুজনে বেরিয়ে পরলাম আসতে আসতে। ঠিক যেমনটা বছর ২০ আগে আমার ছোট্ট হাতটা ধরে দাদুভাই ঘুরতে নিয়ে যেত।
মিনিট আটেকের রাস্তা আমরা ১৬ মিনিটে পৌঁছালাম। শিবু ময়রা এখন আর বেঁচে নেই তবু তার নামের দোকানটা ওনার ছেলে বাবার মতনই চালিয়ে যাছে। দাদুভাই আস্তে আস্তে দোকানের ভিতরে ঢুকে বলল- "কই হে! দুটো করে পরোটা দুই জায়গায় দাও হে দেখি।" আমি সুবোধ বালকের মতন বসে রইলাম।
মিনিট দুয়েক পর পরোটা এসে গেল, দাদুভাই একগাল হাসি দিয়ে বলল-" এই নাও দাদুভাই! গরম গরম খেয়ে নাও"। তারপর দুজনেই পরোটা খেতে মনোনিবেশ করলাম। আমি যেন সেই ছোট্ট বেলার দিনের সুখ ফিরে পাচ্ছিলাম। পরিনত বয়স বলে স্বভাবতই দাদুভাইএর খেতে সময়ে লেগেছিল, তাও আমি খাবার পর হাত ধুয়ে এসে বসলাম। দাদুভাই হাত ধুয়ে কোচল থেকে ৪০ টাকা আর কিছু খুচরো পয়সা নিয়ে দোকানদারকে দিল। আমি ওয়ালেট বার করে ১০০ টাকা বারিয়ে দিতেই ভ্রু কুচকে দাদুভাই তীব্র স্বারে বলল- "পইসা সরা। আমি দিছি তো"
তুমি থেকে তুইতে দাদুভাইের কথা শূনতেই আমি একটু ভয়ে পেয়ে যাই, ছোট্ট বেলা থেকেই ভালবাসা আর ভয়ের অন্যতম স্থান হল দাদুবাড়িতে, দাদুভাইএর উপর। আমি চুপ করে গেলাম। অথচ উৎসুক মন দেখছে দাদুভাই কিছু একটা খুজছে কোচলে, কিছুক্ষণ পর টের পেলাম যে ৫০ টাকা দিতে পেরেছে, আরও ১০ টাকা বাকি, সেটাই কোচলে হাত বারিয়ে খুঁজছে।
ওয়ালেট পকেটে ঢোকাবোই কি এই দৃশ্য দেখে ১০ টাকা বার করে আমি চুপিসারে দোকানদারকে দিয়ে দিলাম। রৌদ্রের আলোয়ে চিন্তিত দাদুভাইকে ডেকে দোকানদার বলল- "কাকামশাই, হয়েগেছে, আর তো টাকা লাগবে না"
৩২ বছর ব্যাবসাদারের ১০ টাকার হিসেব ভুল হতে পারে না। জিজ্ঞাসা করল ঘুরে- "কেন হে! ৪টা পরোটা ১৫ টাকা করে ৬০ টাকা হয়ে, ৫০ টাকা আমি দিলুম যে!"
"ও লাগবে না কাকামশাই!"- দোকানদার একটু হেসেই বলল।
"ও আচ্ছা"- মনে অনেক প্রশ্ন রেখেই একটা সম্মতিজনক উত্তর দিল দাদুভাই।
দুজনেই বাড়ি ফিরে এলাম। আমার শুধু দিনটাই মনে থেকে গেল। অনেক প্রশ্ন নিরুত্তর থেকে গেল। "কেন দাদুভাই দোকানদারের মিথ্যে কথাটা ধরতে পারল না?", "সবটা জেনে শুনেই কি দাদুভাই চুপ থেকে গেল?", "নাকি বয়সের ভারে ওত হিসেবের খুঁটিনাটি দাদুভাই বুঝতে পারেনি?", "আমি টাকাটা দিয়ে দাদুভাইকে ছোট করলাম না তো?"
কোন উত্তর নেই আমার কাছে। তবুও এখন মনে হয়ে, স্বর্গসুখটা মনে হয়ে পরোটা খাওয়াতে নয়, স্বর্গসুখ হল জীবনে প্রথম আর শেষবার দাদুভাইকে ১০ টা টাকা দিয়ে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
দাদুবাড়িতে আমার সব থেকে প্রিয় ডাক। আগে "মুন" বলে দিদুন ডাকত। দিদুন চলে যাবার পর ওই বাড়িতে আমার ঘুরতে যাবার জন্য যে সব থেকে বড় অপেক্ষা করে সে হল আমার দাদুভাই।
আমি হলাম মডার্ন নাতি। সকালের গরম দুধ চা আর খবরের কাগজে সকাল হয়ে না আমার, ফেসবুকের নোটিফিকেশান চেক করেই আমার সকাল হয়ে। সেই দিনটার শুরুটাও অন্যথা হয়েনি। তাই দাদুভাইের ডাকটা রীতিমত অবজ্ঞা করে দিলাম। মোবাইলের ৬ ইঞ্চির স্ক্রিনটা আমার সমস্ত ধ্যান, ভাব, বিবেচনা, একাগ্রতাকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে একটা কাল্পনিক জগতের মধ্যে, যেখানে থেকে আমি বাস্তবিক স্নেহ, আদর, ভালবাসাকে অনুভব করতে পারিনা।
"দাদুভাই, চল ঘিএর পরোটা খেয়ে আসি" আমার কোন সাড়া না পেয়ে দোতলা থেকে দাদুভাই আবার আমাকে বলল।
শিবু ময়রার দোকানের ঘিএর পরোটা,সাথে ছোলার ডাল; শালপাতা থেকে পরোটা একটা টুকরো নিয়ে ছোলার ডালে ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে মুখে দিলে প্রথম যে নিঃশ্বাসটা নাক দিয়ে বেরোয়, সেটা ঘিএর; তারপর ময়দা ভাঁজাটা ডালের সাথে মেখে যখন মুখের চারপাশে দাঁত দিয়ে পেষা হয়ে- আমি স্বর্গ সুখ পাই। তাই পেটুক বলে জিভের লালসাটাকে অবহেলা করতে পারলাম না। সাড়া দিলাম- "চলো, যাচ্ছি দাদুভাই"
ফোনটা রেখে জামাকাপড় পরে দোতলা চলে গেলাম। দেখি দাদুভাই আগে থেকেই তৈরি হয়ে বসে আছে, ধবধবে সাদা পায়েজামা আর সিফন ধুতি, সাথে এক গাল হাসি আর বলল- " এইযে দাদুভাই, কই ছিলে? আমি কখন থেকে ডাকছি। শোন আর দেরী করও না, চলো বেরোই। ওই কোনা থেকে আমার লাঠিটা দাওতো"আমি আমার কোম্পানিতে টিম লিড, তাও দাদুভাইএর কাছে আমি ছোট নাতির মতন প্রবৃত্তিটা রেখে দিয়েছি।
দরজার পাশ থেকে লাঠিটা এনে দিয়ে দুজনে বেরিয়ে পরলাম আসতে আসতে। ঠিক যেমনটা বছর ২০ আগে আমার ছোট্ট হাতটা ধরে দাদুভাই ঘুরতে নিয়ে যেত।
মিনিট আটেকের রাস্তা আমরা ১৬ মিনিটে পৌঁছালাম। শিবু ময়রা এখন আর বেঁচে নেই তবু তার নামের দোকানটা ওনার ছেলে বাবার মতনই চালিয়ে যাছে। দাদুভাই আস্তে আস্তে দোকানের ভিতরে ঢুকে বলল- "কই হে! দুটো করে পরোটা দুই জায়গায় দাও হে দেখি।" আমি সুবোধ বালকের মতন বসে রইলাম।
মিনিট দুয়েক পর পরোটা এসে গেল, দাদুভাই একগাল হাসি দিয়ে বলল-" এই নাও দাদুভাই! গরম গরম খেয়ে নাও"। তারপর দুজনেই পরোটা খেতে মনোনিবেশ করলাম। আমি যেন সেই ছোট্ট বেলার দিনের সুখ ফিরে পাচ্ছিলাম। পরিনত বয়স বলে স্বভাবতই দাদুভাইএর খেতে সময়ে লেগেছিল, তাও আমি খাবার পর হাত ধুয়ে এসে বসলাম। দাদুভাই হাত ধুয়ে কোচল থেকে ৪০ টাকা আর কিছু খুচরো পয়সা নিয়ে দোকানদারকে দিল। আমি ওয়ালেট বার করে ১০০ টাকা বারিয়ে দিতেই ভ্রু কুচকে দাদুভাই তীব্র স্বারে বলল- "পইসা সরা। আমি দিছি তো"
তুমি থেকে তুইতে দাদুভাইের কথা শূনতেই আমি একটু ভয়ে পেয়ে যাই, ছোট্ট বেলা থেকেই ভালবাসা আর ভয়ের অন্যতম স্থান হল দাদুবাড়িতে, দাদুভাইএর উপর। আমি চুপ করে গেলাম। অথচ উৎসুক মন দেখছে দাদুভাই কিছু একটা খুজছে কোচলে, কিছুক্ষণ পর টের পেলাম যে ৫০ টাকা দিতে পেরেছে, আরও ১০ টাকা বাকি, সেটাই কোচলে হাত বারিয়ে খুঁজছে।
ওয়ালেট পকেটে ঢোকাবোই কি এই দৃশ্য দেখে ১০ টাকা বার করে আমি চুপিসারে দোকানদারকে দিয়ে দিলাম। রৌদ্রের আলোয়ে চিন্তিত দাদুভাইকে ডেকে দোকানদার বলল- "কাকামশাই, হয়েগেছে, আর তো টাকা লাগবে না"
৩২ বছর ব্যাবসাদারের ১০ টাকার হিসেব ভুল হতে পারে না। জিজ্ঞাসা করল ঘুরে- "কেন হে! ৪টা পরোটা ১৫ টাকা করে ৬০ টাকা হয়ে, ৫০ টাকা আমি দিলুম যে!"
"ও লাগবে না কাকামশাই!"- দোকানদার একটু হেসেই বলল।
"ও আচ্ছা"- মনে অনেক প্রশ্ন রেখেই একটা সম্মতিজনক উত্তর দিল দাদুভাই।
দুজনেই বাড়ি ফিরে এলাম। আমার শুধু দিনটাই মনে থেকে গেল। অনেক প্রশ্ন নিরুত্তর থেকে গেল। "কেন দাদুভাই দোকানদারের মিথ্যে কথাটা ধরতে পারল না?", "সবটা জেনে শুনেই কি দাদুভাই চুপ থেকে গেল?", "নাকি বয়সের ভারে ওত হিসেবের খুঁটিনাটি দাদুভাই বুঝতে পারেনি?", "আমি টাকাটা দিয়ে দাদুভাইকে ছোট করলাম না তো?"
কোন উত্তর নেই আমার কাছে। তবুও এখন মনে হয়ে, স্বর্গসুখটা মনে হয়ে পরোটা খাওয়াতে নয়, স্বর্গসুখ হল জীবনে প্রথম আর শেষবার দাদুভাইকে ১০ টা টাকা দিয়ে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
হাসি মুখী শরীরটা জ্বরা জীর্ণ হয়ে কাঁধে উঠলেই শোনে হরিনাম
জানিনা কোথায় আছো? ভালো থেকো, লহো শত সহস্র প্রণাম ।।
জানিনা কোথায় আছো? ভালো থেকো, লহো শত সহস্র প্রণাম ।।
No comments:
Post a Comment