Saturday, August 18, 2018

বাড়ির খাবার

"নাহ! তারাতারি স্নান করেনি, বিকালে ফল কিনতে যেতে হবে"- আনমনে নিজেই বিড়বিড় করে বলে স্নান ঘরের দিকে চলে গেলো অনিমেষ।

বেঙ্গালরে আইটি সেক্টরে কাজ করে অনিমেষ, ৪ বছরের অভিজ্ঞতায়ে ৯ জনের টিমের টিম-লিড সে এখন। কলকাতার বিমাগঞ্জে বাড়ি। ব্যাবসাদার বাবা আর ছেলের বাড়ি ফেরার আশায়ে বসে থাকা মামনি; এই হল অনিমেষের বাড়ির কথা। ছোট বেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র, খুবই কষ্ট করে, বাঙ্কের কাছে লোণ নিয়ে ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানায় মনোময় বাবু, অনিমেষের বাবা। নিমন্ত্রন বাড়ি খেতে গেলে, খাবার শেষে আইস-ক্রিমটা নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আসত মনোময় বাবু, নিজে না খেয়ে ছেলেকে খাওয়াবে বলে। কিন্তু কপাল! কলকাতার চাকরিটা বেশিদিন করতে পারলনা অনিমেষ, এই ছোট্ট সুখের সংসারটাকে খাঁখাঁ করে দিয়ে চলে আসে বাঙ্গালরে।

বামুন ছেলের মতন অনিমেষ পইতাটাকে মুছে, জামা-কাপর পরে স্টিলের থালাটা নিয়ে বাড়ির নিচে চলে গেলো। ও এখানে পেয়িং গেস্টে থাকে। সারাদিনের ব্যাস্ততার মাঝে নিজের জন্য সময়ে কম, তিনবেলা খাবার পায়ে বলে নিশ্চিন্তে থাকার আশায় অনিমেষ পেয়িং গেস্টে থাকে। নীচ থেকে খাবার নিয়ে আবার ৪তলায়ে উঠে এসে খাবারটা একটা পেপারের উপর রাখল। সবুজ প্লাস্টিকের বাটিতে একটু চানাচুর আর ভুজিয়া নিলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াটা খুলল, হটাৎ ২ বছর আগের শেয়ার করা পোস্ট দেখছে ও। হ্যাঁ! ৭ই অক্টোবর আজ, ২৮ বছরে পা দিল আজ অনিমেষ।

২ বছর আগের ওই পোস্ট গুলো ওকে সেই পুরানো দিনগুলোতে নিয়ে গেলো। এই জন্মদিনের দিন অনিমেষ হল বাড়ির রাজা। ওর পছন্দের রান্না হবে, ওর পছন্দের ইংলিশ গানে বাড়ি কাঁপবে। পোস্টের ওই ছবিটাতে ওর ২ বছর আগের জন্মদিনের দুপুরের খাবারের পিকচার। তাতে রয়ছে  - বাসমতী চালের ফ্রাইড রাইস, ৫ রকমের ভাজাতে সাজানো থালা, আর থালাকে ঘিরে আছে বিভিন্ন সুস্বদু তরিতরকারি; বা দিক দিয়ে শুরু করলে ঢাকা যাচ্ছে: সুক্ত, পটল চিংড়ি, দই ইলিশ, কষা মুরগি, চাটনি, মিষ্টি দই, ৪ রকমের মিষ্টি ভরা ছোট্ট বাটি আর পায়েস। অনিমেষের মামনি একা হাতে প্রতি জন্মদিনে এমন করে সাজিয়ে খাওয়ায়ে।

মোবাইলটা বন্ধ করে পি.জির খাবারের দিকে তাকাল অনিমেষ, মোটা চালের ভাত আর রসম। ভাতটা মুখে দিতেই বাঁ চোখটা দিয়ে জল গড়িয়ে পরল। আজ সত্যি ওর খুব মনে পড়ছে মায়ের হাতের বাড়ির খাবারের কথা। পুরানো কথা ভাবতে ভাবতে চানাচুর দিয়ে খাবার খাবার খাছে অনিমেষ। মায়ার টান; মামনি ফোন করল, চোখের জলটা মুছে ও ফোনটা তুলল-"হ্যাঁ, মামনি বল"।
-"কি করছিস মনা?"
-"এইতো খেতে বসেছি, মামনি। তুমি কি করছ?"
-"কিছুই নারে, কাজ সেরে টি.ভি টা খুললাম, ভাবলাম মনাকে ফোন করি, কি করছে জন্মদিনের দিন ছেলেটা"
-"সকালে বললাম তো। আজ সারাদিন কোন কাজ নেই।"
-"কি খাছিস রে?"
২ সেকেন্ডের জন্য চুপ, "এইতো মামনি, ভাত, ডাল, তরকারী, আর তোমাকে বলি না যে চানাচুর দিয়ে খাই, দারুন টেস্ট লাগে"
-"কি তরকারী রে?"
-"বাঁধা কপির তরকারী, আলু দিয়ে, পুর তোমার হাতের রান্নার মতন। তুমি চিন্তা করনা মামনি, এখানে তো মণ্ডা মিঠাই পাব না, তবে বিকালে গিয়ে মিষ্টি কিনে খেয়ে নেব"
-"আছা! তুই খাঁ, বিকালে ফোন করব"
-"হ্যাঁ মামনি"।
কাঁদতে কাঁদতে ফোন রাখল দুজনেই।

No comments:

Post a Comment

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে ...