Wednesday, March 10, 2021

শেষ যাত্রা

 বয়সটা বেশী নয় আমার, তাই পাড়ার কোন কাজে আমাকে ডাকা হয়না। বরং বাবা সব অনুষ্ঠানে আমাদের পরিবারের প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থিত হয়। আজও পোস্ট অফিসের ঠিকানায় বাবার সন্তান হিসাবে নিজেকে পরিচয় না দিলে চিঠি বাড়ি আসতে একটু আসুবিধা হয়। বিয়েবাড়ি, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন এমনকি শ্রাদ্ধ বাড়িতেও আমি যাই আমান্ত্রন পত্র পাবার পরেই। তাই আমার অভ্যাসটা তাই আছে- যদি কেউ না নিমন্ত্রন করে, আমি কারো কাজে নিজে থেকে এগিয়ে যাই না। দম্ভ কিন্তু একদমই নয়, শুধু একটু সঠিক পরিচালনার অভাব।

বসন্তের এক বিকেল, কিন্তু দিনটা ছিল সোমবার। হাঁ হাঁ !!!!! তাই গরম চা আর শরৎচন্দ্র নিয়ে বসে থাকার দিন ছিল না। আমি এক অফিসের ভার্চুয়াল মীটিং-এ ছিলাম। একটা ফোন এলো আমার ছোটবেলার বন্ধুর, দিপকের। মিটিং -কে মিউট করে দিপকের ফোন ধরলাম। 

-হাঁ, বল...

-ব্যাস্ত আছিস?

-ওই, অফিসের কলে আছি। তুই বল...

-কাল ছুটি নিস অফিস থেকে।বিকালে দরকার আছে। রিয়ার বাবা মারা গেছে। আমি তোকে এখন কিছু বলতে পারবোনা। আমি শ্বশুর বাড়ি থেকে সবাইকে নিয়ে হাসপাতাল যাচ্ছি। অন-ডিউটি হার্টঅ্যাটাক মারা গেছে, তাই ময়না তদন্ত করে কাল বিকালে শ্মশানে যাব। 

-( নিস্তব্ধতা...আমি কিছু বুঝতে পারছিনা কি বলব। দুবার শুঁকনো গলায় ঢোক গিলে বললাম...) আমি কিছু করব এখন? সায়ানও বাড়ি এসেগেছে, একসাথে বেরিয়ে যাব।

-না! তোরা বাড়ি থাক আজ। সায়নকে জানিএ দিস। আমি রাখলাম।

-খেয়াল নিস। 

-হুম

---কিছু না বুঝে আমি সায়ানকে ফোন করে সব বললাম। ও বলল- ঠিক আছে, কাল সকালে দেখা কর। 


একটু পরিচয় দিয়ে দি... আমি, সায়ান আর দিপক- ছোট্টবেলার বন্ধু। শুধু দিপক-ই আমাদের মধ্যে বিবাহিত আর রিয়া ওর বউয়ের নাম। 


...... পরদিন সকাল। 

আমি আর সায়ান পাড়ার দোকানে দাড়িয়ে। গোল্ড-ফ্লেকে টান দিতে দিতে বললাম...

-আমি কি করব বিকালে?

-কি আবার করবি! দিপকের সাথ দিবি। শ্মশানে যেতে হবে তো।

-(একটু আশ্চর্য হয়ে) মানে?? শ্মশানে যেতে বলেছে তোকে? আমাকে তো বললনা কিছু যেতে হবে কিনা।

-আরে গাধা!! শ্মশানে কাওকে নিমন্ত্রন করে না। সবাই এমনই যায়। তুই তো জানবি না, গেছিস কোনোদিন?

- কই না তো। বাবাই যায় সব জায়গায়। আমি জানিনা।

-শোন... শেষযাত্রাতে যাওয়া ভালো। পুণ্যি হয়। 

-আমার এই প্রথমবার। জানিনা কি হয় ,কি করতে হয়।

-তুই চিন্তা করিস না। দুজনে থাকব। বিকালে দেখা করছি। 


.........বিকালবেলা

সবাই এক জায়গায় হলাম। রিয়ার বাড়িতে হাহাকার। কান্নাকাটি, চিৎকার। আমি আর সায়ান অনেক দূরে দাড়িয়ে আছি। ময়না তদন্ত সেরে রিয়ার বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসা হল। ধরে রাখা যায়ে না কাওকে। আসলে বয়সতো মানুষটার বেশী নয়, ৫০-৫৫ হবে। 

সায়ান আমাকে টেনে আরও দূরে নিয়ে এলো। ও কান্নাকাটি দেখতে পারেনা। আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। না পারছি, কষ্ট দেখতে, না পারছি কাওকে সামলে ধরতে। আমরাও দর্শকের মতন দারিয়ে থাকলাম ঠিক যেমনকরে সব প্রতিবেশীরা দাড়িয়ে ছিল। 

কিছুক্ষণ পরে, সবাই রওনা দিল মানুষটার অন্তিম কর্ম সাধন করতে। আমরাও যাচ্ছি পিছন পিছনে।


অদ্ভুত এক অনুভূতি। শুনশান জায়গা কিন্তু মানুষ ভরতি। একটু এগোতেই দেখলাম ছোট কাঠের বিছানায় সারি করে রেখেছে। সারি করা সেই চাতালের পাশে ছাউনি দাওয়া বসার জায়গা। আর তার পাশ দিয়ে বাঁধান গলি যেটা গঙ্গার সিঁড়িতে গিয়ে মিশেছে। আমি একটু অবাক হয়ে দাড়িয়ে থাকলাম। একটু লক্ষ্য করার পর বুঝলাম সবাই মৃতের আত্মীয় নয়। বিভিন্ন রকমের মানুষ সেখানে।  


...একটা গাড়ি এসে শরীর নামিয়ে বলল- "দাদা আমাদের টাকাটা দিন আর আমরা বেরুছি, শ্রীপল্লীতে আরও একজনকে আনতে যেতে হবে"।

...একজন মানুষ একটা অফিস ঘরে বসে অনেকক্ষণ কিসব অফিসিয়াল কাজ করে যাছে। জানতে পারলাম উনি সরকারি কর্মচারী। মৃতদের সরকারি খাতায় নাম লেখে।

...কোমরে লাল রঙের গামছা বাঁধা কিছু মানুষ দাড়িয়ে একজোট হয়ে কথা বলছে। কি না! তারা টাকা যোগার করে মদ্ খাবে।

...একটা মোটা করে মানুষ কাগজে লিখে দিপকের হাতে দিল আর বলল-"বাবা! এই নাও, পাড়ার শ্মশান যাত্রীর নাম। এই নামগুলো হাড়িও না"

...এসব দেখতে না দেখতেই চুল্লীর দরজা খুলে একজন লোক বেরিয়ে এলো। বড় আল্মুনিউমের একটা ট্রেতে জলন্ত অন্তিম দেহাবশেষ নিয়ে। আবার বলছে- "দেরী করবেন না, নিয়ে আসুন পরের জনকে"

...আমার পাশে একটা বয়স্ক কাকুও আমার মতন সব দেখছিল। হতাত আমাকে বলল- "আরও ৪০-৪৫ মিনিট লাগবে। তোমাদের তো ৩ নম্বরে, তাইনা? এখানও ভেবে নাও রাত ১২.৩০ হবে। তাও ভালো ইলেক্ট্রিক, কাঠে হলে ৭-৮ ঘণ্টা লাগত।"

...কিছু উত্তর না দিয়ে আমি সামনে তাকালাম। দেখলাম একজন পুরহিত একজনের মৃতের ওই সারিতেই মুখগ্নি করিয়ে দিছে। সে কান্না দেখা যায়ে না। কাজ শেষ করতেই সেই পুরহিত পাশের শরীরের দিকে এগিয়ে গেল। 


প্রায় ৫ ঘণ্টা ছিলাম, সব সেরে বাড়ি ফিরে নিজে যখন শুলাম, ভাবছি............ জীবনের শেষ চরম সত্য হল মৃত্যু।  এত বড় শরীরটা একমুঠো ছাই হয়ে যায়। সেই অন্তিম জাত্রাতেও মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য যায়ে, সেখানেও মদ পানের উল্লাস।  এ. টি.এম -এর  লাইনের মতন দাড়িয়ে থকাতে হয়। বড় কঠিন বাস্তব দেখে এলাম আজ। রক্ত মাংসের শরীর নিয়ে তো বেঁচে আছি, মরার পর স্মৃতি হয়ে কি বাঁচতে পারবো? তেমন কিছুই তো করলাম না। 

একটা ছেলের কথ মনে পরল। সে তার বাবার পাশেই বসে ছিল। কাঁদছিল না। কতবার ডাকল, তাও উঠল না ও বাবাকে ছেঁড়ে। শুধু চোখ বোজা মানুষটার দিকে তাকিয়ে ছিল আর ওনার কপালে হাত বুলিএ দিচ্ছিল। 

...... আমার মতে, যে মানুষটা শরীর ছেঁড়ে দেয়, তিনি মরে যায়ে না........... যাদের ছেঁড়ে মানুষটা চলে যায়ে, তারা মরে যায়। 

No comments:

Post a Comment

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে ...