Saturday, May 15, 2021

ছাব্বিশে ছোবল

৫ম অগাস্ট আমার জন্মদিন। বাবা ঠিক করেছিল ওইদিনে আমার বিয়ে দেবে। ঠাকুরমশাইয়ের পাঁজিটাও দিনটিকে ভালো বলল। সময়টা ছিল বিশ্ব মহামারি করোনার অন্ধকারে। তাই পুলিশকে বলে ১৫০ জন মানুষের অনুষ্ঠানের আয়জন করতে পারবে বলে অনুমতি নিয়ে এসেছিল। আমি সবারই মতন জীবনে এই শুভ দিনটার অপেক্ষা আর নতুন জীবনের আশায়ে ছিলাম। বাড়ীর আমি একমাত্র সন্তান আর আমার বিয়েটা ছিল বাড়ীর সব থেকে বড় একটা কাজ। নবরাত্রির পরে আমরা বাড়িতে যেমন তৃপ্তি করে আমিষ খাই, আমার বিয়েটা ছিল বাবামায়ের কাছে সেরকম পরিতুষ্ট কাজ ছিল।


হাঁ! আমিও খুব খুশি ছিলাম। ও... আমার কথা জানবেন না?  বললাম বলে ইচ্ছা করল জানতে? বলব তো বটেই। আচ্ছা, একবার ভেবে বলুন তো আপনার জীবনে এমনটা ঘটেছে কিনা.... যে- জীবন থেকে আপনি কখনো কিছু চাইলেন, আর, জীবন আপনাকে ঠিক তার উল্টোটা দিয়েছে। ঘটেছে? আমার কথাই বরং বলি। 


...আমি কলকাতা শহরের এক সাধারণ বাড়ীর একমাত্র মেয়ে। বাবার গয়নার ব্যাবসা। মা হউসওয়িফ। সংস্কৃতি-তে মাস্টার্স করা, দুবেলা ছাত্র পরিয়ে নেল-পালিশ কেনার খরচা চালানো এবং মালদিভে বিয়ের প্রথম সপ্তাহ কাটানোর স্বপ্ন দেখা পাখি আমি। বাবা সরকারি ছেলে দেখে আমাকে পর করে দিল আমার জন্মদিনের দিন। ১২ ভরি গয়না, খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, কাঁসার থালা, বাটি, গ্লাস আর বিয়ের উপহার নিয়ে আমি শ্বশুর বাড়ি পা রাখলাম।


আমার বয়স এখন ছাব্বিশ। এই বছরের জন্মদিনটা বাকি ২৫ বছরের মতন কাটেনি। কোন কেক ছিল না, বেলুন দিয়ে সাজানো ঘর ছিল না, মায়ের পায়েসর বাটি ছিল না, কিন্তু এক চিলতে সিঁদুর ছিল এই বছর আমার কপালে। ওই যে বললাম- যা চাই জীবনে - সেটা হুবাহু দায় না জীবন। বিয়ের প্রথম সপ্তাহে আমার মালদিভে যাওয়া হয়েনি। বরং আমি রোজ করকরে লাল তাঁতের শারি পরে শাশুড়ি মায়ের সাথে হাতে হাতে সাহায্য করতাম। কোন আলাদা অনুভূতি ছিল না আমার জীবনে বাপের বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ীর মধ্যে। কারন ওই সিঁদুর দানের পরে আমি বরের পাশে আর থাকতে পারিনি। জানিনা কেন? ... 


দেখাশোনা করে বিয়ে হয়ে আমার। ছেলে গ্রুপ-বি অফিসার। রাজারহাটে ত্রিপ্পল বেডরুম ফ্লাট। বাবা দেখে একটু সমৃদ্ধ পরিবারে বিয়ে দায়ে। সপ্তম দিনে শাশুড়ি মা আমাকে বলে- দেখো বউমা, বিয়েতে আমরা কিছু চাইনি, নতুন ফ্লাট দেখতেই পাচ্ছ। কিছু ইন্তেরিয়ার ডিজাইনার জন্য লাখ খানেক টাকা লাগবে, তোমার বাবাকে বলবে?


-"উমম...এত গুলো টাকা..."

-"আঁতকে উঠলে! আমরা তো বিয়েতে কিছু চাইনি। একটা মোটর-সাইকেল পর্যন্ত দিলে না"

-(আকাশ থেকে পরলাম আমি, সবটা ভালো করে জানতে চাই এবারে)..."বুঝলাম না। কি বলতে চাইছ?"

-"নেকামো করো না তো। বাবাকে বলে একটা মোটর-সাইকেল আর দেড় লক্ষ টাকার ব্যাবস্থা করো"


জীবন্ত গিরগিটি এই প্রথম দেখলাম প্রথমবার, তাও আবার মানুষরূপী । ধীরে ধীরে জানলাম সবটাই ও বাড়ীর ছক। যত দিন যেতে থাকল, ওদের হুমকার আর আমার উপর অত্যাচার দুতই বাড়তে লাগল। খেতে কম দাওয়া, পাথরের মেঝেতে জল ফেলে রাখা, বাড়িতে ফোন করলে সামনে দাড়িয়ে থাকা, এমনকি বাড়ীর ছেলে আমার সাথে এক ঘরে শোয়াটাও বন্ধ করে দিল। 


পন... শুধু আইনের খাতায় নিষিদ্ধ। বাস্তবে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সব মেয়ের বাবা টেবিলের তলা দিয়ে কিছু না কিছু দিয়েই থাকে ছেলে বাড়িতে। বাঙালি রীতিতে মেয়েকে বাপের বাড়ি কিছু নিয়ে যেতে হয়ে জানি যেটা উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া, কিন্তু চেয়ে নাওয়াটা কি খুবই জরুরী। তাও ঠিক আছে, সেটাও মেনে নিলাম। কিন্তু, বিয়ের পর চাওয়া টাকা পয়সা? সেটা পন নয়? সেটা আইনের বাইরে? নাকি সেটা শুধুই আত্মীয়ের নামে জুলুম করে চেয়ে নাওয়া লোভের অংশ?...


আমি বুঝলাম এই লোভ আর অত্যাচার থামার নয়। কিন্তু কি করব আমি? বাড়ি ফিরে গেলে এরা দমবে না। অভিযোগ জানালে বাবার অসুস্থতা বাড়বে। কিন্তু আমি তো চেষ্টা করলাম। বাপের বাড়ি যাই, অষ্টমঙ্গলাতে, কিন্তু সেখানেও মাকে বলতে পারিনি। ফিরে আসার পর ওই নির্যাতন আরও বাড়তে থাকে। একদিন তো আমাকে খেতে অবধি দাওয়া হয়না। রান্নাঘরের থেকে আটা গুলে সেটা দিয়েই আমি খিদের জ্বালা মেটাই।


নাহ!!!! অত্যাচার মেনে নিতে মা-বাবা শেখাইনি। ঠিক করলামা আমি এই বন্ধি নির্যাতিত  হয়ে সংসার ধর্ম পালন করতে পারবনা। 


২২শে অগাস্ট। স্যেনেটারি প্যাড কেনার নাম করে ওই বন্ধি ঘর থেকে বেরিয়ে পরলাম। মানুষ যে উড়তে জানে সেটা সেদিন বুঝলাম আমি। ২ ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি ফিরি। অনেক ঝর ঝাপটা যায়, আমি ওদের নামে থানায় নাম লিখাই, শাস্তি হয়ে ওদের। বিচ্ছেদের পর আমি বাড়িতেই চলে আসি। 


দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। আজ সেই ৫ম অগাস্ট। দুপুরে পায়েস, খাওয়া দাওয়া, বেলুন দিয়ে ঘর সাজানো, কেক কাটা হল। দিনটা বেশ মজাতেই কেটে গেল। জানলা খুলে এক ফালি চাঁদটার দিকে তাকিয়ে আছি। কালো মেঘ আসছে, ঢাকছে, আবারও সেটা কেটে যাছে। আমার ওই দিন গুলো এই কালো মেঘের মতন ছিল যেটা আমি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। কিন্তু... ওই বিষাক্ত সাপের ছোবলটা কপালে রয়ে গেল। সিঁদুরের লাল রঙটা হয়েতো নেই, কিন্তু ছোবলের দাগটা আজও আছে ডিভোর্সির নামে। 

No comments:

Post a Comment

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে ...