ঢাক ঢোল এর আওয়াজটা আসতে আসতে কানে বাজতে লাগল। ঘুমটাও একটু পরে ভেঙে গেল। দেরী না করে উঠে পড়লাম। মাকে বললাম- " চলো, মাকে বরণ করে আসি"। এই বলে মায়ের জন্য আর আমার জন্য লালপেড়ে শাড়ী বার করলাম। তারপর মা-মেয়ে মিলে দুর্গা মাকে বরণ করতে বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যে ৭টা বাড়ি ফিরলাম। একটু জিরিয়ে নিয়ে বাবাকে-মাকে বিজয়ার প্রনাম করে একটু মিষ্টি মুখ করলাম সবাই মিলে।
খুব সুন্দর সাজানো সংসার আমার। সবটা যেন খাপে খাপে বসানো। দেখে মনে হয়ে যেন হাঁসির সমাপ্তিতে বাঁধা কাঁচা হাতে লেখা কোন এক লেখকের গল্পের মতন...
রাত সাড়ে ৯টা... অলি এসে ডেকে নিয়ে গেল আমাকে, ভাসানে নাচতে। আমি পছন্দ করিনা এসব নাচা-নাচি, মানুষের দলে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারিনা। তাও, বন্ধু; ওরা কোনদিনও 'না' শুনবেনা। বরণ করে আসা ওই জামা কাপর পরেই বেরিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি, মাকে লড়ীতে তুলে নিয়েছে। কান ঝালাপালা করে দাওয়া হিন্দি গান আর মদ- সিগারেটের গন্ধে মত্ত পাড়ার ছেলে-মেয়েরা।
অলি কানের সামনে এসে বলল- "মন্দিরের পিছনে চল, তোকে একটা জিনিষ দেখানোর আছে"। টানতে টানতে নিয়ে গেল আমকে সেখানে। গিয়ে দেখি রিমা, পায়েল, অরিজিৎ সবাই আছে গোল করে বসে আর সেখানে ২-৩টে মদের বোতল। অনেক ঝগড়া, না-মানার পরে আমাকেও ওদের দলে নিয়ে নিল।
রাত ১১টা বাজে... ভীষণভাবে মত্ত আমি। মন্দিরের চাতালে আমি বসেছিলাম। ভীষণ গরম লাগছিল, তাই আঁচলটা দিয়ে নিজের মুখ আর কপালটা মুছলাম। হাতে আঁচলটা নিতেই নিজের সব হুঁশ হারিয়ে ফেললাম। ৫টা বছর একটা নিঃস্বতা নিয়ে চলার পরে আমি যেন চিৎকার করার সুযোগ পেলাম। বুকের ভীতরে পাথর চাপা দাওয়া হুংকারটা বেরিয়ে আসল। অঝরে চোখের জল যেন বানভাসির মতন বেরিয়ে এলো। ঘামের কপালে সিঁদুরের দাগটা আমার আঁচল আজ মোছেনি। ৫ বছর আগে এই মদ আমার সিঁদুর মুছিয়ে দিয়েছিল। হাঁ, আজকের দিনেই আমি বিধবা হয়েছিলাম। তাই চোখের জলটা না আটকাতে পেরে বেরিয়ে এলো। ভুলে যেতে চাইলেও ভুলতে না পারা অভাগিনী আমি চোখের জল মুছে ফেললাম, যাতে কেউ দেখতে না পারে। উঠে দাড়িয়ে আমিও উন্মত্ত হয়ে হিন্দি গানে নাচতে থাকলাম। পেটে নেশার বুঁদ, বুকে বেঁধে রাখা শক্ত পাথর, হিন্দি গানের তালে নাচা পা, সিঁদুরের মতন লাল করে রাখা চোখ নিয়ে মাকে বললাম- "আবার ফিরে এসো... মা"
No comments:
Post a Comment