"যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে" -শ্রী শ্রী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ১৯০৫ সনের সেই স্বদেশী গানের অনেক অনেক অভ্যন্তরীন অর্থ আমরা কালে কালে বুঝতে পেরেছি। দেশ স্বাধীন হবার পরে হয়তো আমরা গানের অভিহিত মূল্যকেই বেশী প্রাধান্য দিয়েছি। ওই গানের লাইনের "একলা শব্দকে আমরা তাই 'নিঃসঙ্গতা' মনে করে বসি, 'একাকীত্ব' নয়। বা শুধু আমিই এমনটা ভুল ভাবি...
ছুটির একটা দিন খুঁজে বেরিয়ে পরেছি আজ আমি। দিনটা ৮ই এপ্রিল,২৩। বেলা ১২.৩০এর দমদম মেট্রো করে পৌঁছে গেলাম 'ময়দান'-এ। সেখান থেকে বেরোতেই একটা ৪-৫ বছরের বাচ্চা মেয়ে আমার জিন্সটা ধরে টান মারল। কারন- তার কাছ থেকে গোলাপ কিনতে, একটু চোখটা চারপাশ করতেই দেখি একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা অনেক গোলাপের ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে, আর এই বাচ্চাটি হয়তো ওনারই। আশেপাশে কোন দোকান খুঁজে পেলামনা, আবার মেরুন জামা পরা বাচ্চা মেয়েটাকে ফিরিয়েও দিতে পারছিলাম না। তাই বললামঃ
- কত করে গোলাপ?
-১০ টাকা বাবু?
-"বাবু"? দাদা বলে ডাক আর আমাকে দুটো গোপাল দে...
- আচ্ছা, দাদা।
টাকার ব্যাগটা থেকে ২০ টাকা দিলাম আর বললাম- এই গোলাপ দুটো আর বিক্রি করবি না, এই গোপাল দুটো তোর নিজের। আর টাকাটা মাকে দিয়ে দিস,কেমন!
জানিনা শুনবে কিনা। বাড়তি প্রশ্ন মাথায় আনতে চাইছিলাম না, তাই আমি আর পিছন ঘুরে তাকালাম না। আমি রাস্তার পার ধরে হাঁটতে থাকলাম। দেখলাম, একপাশে ব্যস্ত শহর কলকাতার বড় বড় বাড়ী, ক্ষিপ্তগামী গাড়ী , আর একপাশে পরিত্যক্ত জমির মাঝখানে আমি একলা হেঁটে চলেছি।
তখন দুপুর ১.৩০, ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গেলাম 'নন্দন'এ। আগেও বহুবার এসেছি কিন্তু এবারের আসাটা একটু অন্যরকম। এবারে আমার কথা শোনার মানুষ একটাই, এবারে কথাপ্রসঙ্গে বিভিন্ন সাড়া দেবার উপায় নেই, এবারে সিগারেট ভাগ করে খাবার মতন কেউ নেই। যাইহোক, সোজা চলেগেলাম সিনেমা দেখার জন্য টিকিট কাটতে। আসেপাশের মানুষের চোখ দেখে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন ঃ
- কি দরকার ছিল একা আসার, তুই একমাত্র মানুষ যে একা সিনেমা দেখতে এসেছে।
- তোর এত ভাবার কি আছে? সিনেমা দেখবি, বাড়ী চলে যাবি। (নিজেই নিজেকে বোঝালাম)
আমি তাই করলাম। টিকিট আর জলের বোতল নিয়ে ঢুকলাম আর অপূর্ব একটা সিনেমা দেখে বেরিয়ে এলাম। বাইরে বেরিয়ে এসে খাবার দোকান খুঁজলাম। ভাবলাম ধোসা খাব। ব্যঙ্গালোর থেকে ফেরত আসার পর ধোসা আর জোটেনি কপালে। বা, এইভাবে বলতে পারি, একটা চলে যাওয়া মানুষের ইচ্ছাতেই নিজের খুশি খুঁজে পেতাম। নিজের থেকে তাকে বেশী অধিকার দিলে যা হয়। যাইহোক, দোকান খুঁজতে শুরু করলাম। হাতে অনেক সময়। প্রথম ধোসার দোকানে দাম শুনলাম ১৫০ টাকা। মাথায় খুন চেপে বসল, এত দাম!!!! আমি মেট্রো স্টেশন থেকে ক্রমশ যত দূর যেতে শুরু করলাম, ধোসার দাম ততঃ কমতে থাকল। পেটের ইঁদুরটা বেশী দৌড়াতে দিলনা। অন্য একটা দোকান থেকে একটা মশলা ধোসা, দুটো মেধু বড়া খেয়ে, একগ্লাস আঁখের রস খেয়ে স্বস্তিতে ধীরে ধীরে আবার নন্দনে ফিরে এলাম। ফুড কোর্টের পাশে শিবেদার দোকান থেকে একটা সিগারেট নিয়ে গাছতলায় বসে পরলাম। রোদটা এখনও বেশ আছে। পরশু রাতের বৃষ্টি এখনও এপ্রিলের গরমকে হার মানিয়ে রেখেছে। সিগারেটে টান দিতেই কিছু পুরানো স্মৃতি মনে এসে গেল। ২ মিনিট মাথা নিচু করে বসেই ছিলাম কি আমার বাঁ পাশে একজন বয়স্ক মহিলা এসে বসলেন। সিগারেটটা হাত থেকে পরে গেল। দেখলাম...
ওনারা স্বামী-স্ত্রী দুজন এসেছে নন্দনে। সাদা জামা কালো প্যান্ট মাথায় ধূসর ফ্ল্যাট ক্যাপ বাঁ কাঁধে স্ত্রীর ব্যাগ আর হাতে একটা স্মার্ট ফোন নিয়ে ৭০এর কাটায়ে পরা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাক্তিটি ওনার স্ত্রীকে বলছেন কিভাবে বসলে স্মার্ট ফোনে ছবি ভালো আসবে। আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। দেখলাম আসমানি শাড়িতে বসা ওই বয়স্ক মহিলাও স্বামীর কথা মতন বিভিন্নভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে। "নড়বে না একদম" দুহাতে আগলে ধরে থাকা স্মার্ট ফোন নিয়ে স্বামী একটু জোর গলায় বলল। একটু দূরে দাঁড়ানো এই মানুষ দুটোকে একটা ফ্রেমের দুটো দিক ধরলে তার মাঝখান দিয়ে আমি পাশের গাছতলায় বসে থাকা একটা মধ্য বয়সী মেয়েকে দেখতে পেলাম। লাল-কালো শাড়ী পরা মেয়েটি চোখটা যেন কিছু বলছে। ডান হাতের কাগজ গুলো একটার পর একটা পরছে,তারপর ছিঁড়ে ফেলে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখছে। আমার পাশের স্বামী-স্ত্রীর জায়গা এবার বদলের পালা। স্ত্রী দাঁড়িয়ে বলছে স্বামীকে রীতিমতন নির্দেশ দিচ্ছে কিভাবে বসতে হবে। আমি নিজের খামখেয়ালীতে একটু হেসেই দেখলাম ওই লাল-কালো শাড়ী পরা মেয়েটি একটা সিগারেট ধরাল। ওর ছলছলে চোখে সিগারেটের ধোঁয়ার মাঝখান দিয়ে দেখতে পেলাম এক মানুষকে; সে হাফ প্যান্ট পড়া, গায়ে কালো টিশার্টের উপর দিয়ে জামা জরানো, বুকের উপর দিয়ে একটা উঁচু করা ব্যাগ যেন তার বুকটা ঢাকা থাকে, ডান হাতে অনেক ব্রেসলেট, বাঁ হাতে ফোনে নিজের ছবি তুলছে...
১...২...৩... চলচিত্রের পরিচালকের মতন তিন সেকেন্ডের পর "কাট" হল। নিজেদের তোলা ছবি দেখতে দেখতে ওই বয়স্ক স্বামী-স্ত্রী আমার সামনে থেকে হেঁটে চলে গেলেন। লাল-কালো শাড়ী পরা মেয়েটি তার এক বান্ধবীকে খুঁজে পেয়ে কি যেন কথা বলতে শুরু করে দিল। আর... হাফ প্যান্ট পড়া রূপান্তরিত নারীকে খুঁজে পেলামনা। ঘাড় ঘুরিয়ে ডান পাশে আসা চা-দাদার থেকে এক কাপ লেবু চা নিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে কতরকম মানুষের দেখা পেয়ে গেলাম। সবাই নিজে নিজের জীবনে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে নিয়েছে। জীবনের এই রঙ্গমঞ্চে আমরা হলাম এক একটি আজব প্রাণী। চিড়িয়াখানার সাথে যে মিলটি নেই সেটি হল আমরা একে ওপরের সাথে থাকি কম, একা একাই নিজের মতন চলতে থাকি, আমরা দেখতে সবাই এক রকম কিন্তু প্রতিটা প্রাণীর গল্প আলাদা, প্রতিটা মানুষের চাওয়া-পাওয়া আলাদা, প্রত্যেকের চিন্তাভাবনা আলাদা, সুখের মাপকাঠি আলাদা, দুঃখ আলাদা।
উঠে পড়লাম গাছতলা থেকে। ভাবলাম বাড়ী চলে যাই। হাঁটতে থাকলাম গেটের দিকে। আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম ... সামনের মাঠের মধ্যে ৩টে ছেলে আমার এক পছন্দের গান গাইছিল, বসে পড়লাম ওদের পাশে। মনটা ভরে গেল। আরও কিছুক্ষণ আমি, আমার পছন্দের গান একসাথে সময়ে কাটালাম। তারপর বাড়ীর দিকে পা বাড়ালাম। ফিরতে ফিরতে একটাই কথা মাথায় এলো- 'নিঃসঙ্গতা'কে কাটিয়ে উঠে 'একাকীত্ব'র প্রেমে পড়েছি আমি।
No comments:
Post a Comment