Friday, August 31, 2018

না বলা কথা

আজ ৩১ শে অগাস্ট, আজ থেকে এক বছর আগে তোর সাথে আমার পরিচয়। আজ দিনটা ভুলতে পারছিনা একটুও। আজ সকাল থেকেই তোর তোর ফেসবুক প্রোফাইলটা খুলে খুলে দেখছি। গত বছর এইদিনটায়ে অফিস থেকে ফিরে দেখেছিলাম তুই আমার রিকোয়েস্টটা একসেপ্ট করেছিলি। সেই রাত থেকেই তোকে ভালবেসেছিলাম। আজও বুঝে উঠতে পারলিনা।

আচ্ছা তোর মনে আছে ? নভেম্বরে সেই রাতটা খুব কষ্ট হয়েছিল না তোর ? আমার জন্য তুই স্টেশনে ১.৫ ঘন্টা দাড়িয়েছিলি । আমি দূর থেকে তোকে দেখেছিলাম হলুদ সালোয়ার পরে এসেছিলি, উফফফ কি সুন্দরী না তোকে লাগছিলো । লজ্জায় আমার দিকে তাকাচ্ছিলিই না। তুই গঙ্গার ধারে ওই শিব মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে জানিস আমি কি চেয়েছিলাম ? শুধু তোর খুশি। সেদিন আমি যেন সব পেয়েছির দেশে চলে গেছিলাম। তোর আর আমার তোলা সেদিনের ছবিটা এখানও মামনির মোবাইলে আছে জানিস।

ছুটি শেষ, বেঙ্গালরে ফিরতে হবে। লাস্ট সেদিন কি কান্না কেঁদেছিলি, জানিস রানী, আজও তোর মুখটা ভেসে আসছে। খিমছে ধরে রেখেছিলি আমার হাতটা, চোখ বন্ধ করে রেখে কাঁদছিলিস। আমার কান্নাটা বোধ হয়ে দেখতে পাসনি সেদিন।

ভিডিও কলের জন্য রোজ জালাতিস। আর ঘুমনোর আগে কি একটা মন্ত্র ফুকে দিতিস, আজও জানালিনা। আজও সেদিন কিভাবে বালিশ ছিরেছিলি বলিসনি কিন্তু। ভুলতে পারছিনা জানিস রানী। রোজ ভাবি -ভাবব না তোর কথা, কিন্তু কেন জানিনা এই স্মৃতিগুলো লোহার শেকলের মতন আটকে রেখেছে আমাকে। মনে হয়ে রোজ কেউ হৃদয়টার মধ্যে পাথর দিয়ে মারছে সাথে ওই তীক্ষ্ণ নখর গুলো দিয়ে আসতে আসতে সেই পাথর বার করে দিছে।  দিন দিন এই স্মৃতিগুলো তাড়া করে বেরায়, শুধুমাত্র মামনি বাবার জন্য বেচে আছি, নাহলে ইছা করে ওই স্মৃতির মধ্যে মিসে যাই। একটুও সুখে নেই আমি জানিস। কেন আসিস রোজ তিলে তিলে আমাকে মারতে? কি চাই? যা ছিল সবই তো নিয়ে গেছিস, একটা আধমরা প্রান ফেলে রেখে দিয়ে। 

আবার, আবার আসছে ওই ভাবনা গুলো। কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়ে গেছে মনের ভিতরে সব। যেদিন তোর সাথে দেখা হয়েছিল, লাফিয়ে উঠে জরিয়ে ধরেছিলিলিস সবার সামনে। মনে আছে তোর? বলেছিলি আমাকে জরিয়ে যেন আমি আর কোনদিন তোকে ছেঁড়ে না যাই। সাধে কি বলতাম পাগলী ছিলিস। তা না হলে সারাদিন বাজার করে নিজে না খেয়ে আমার জন্য খাবার রেঁধে নিয়ে আসতিস? সেদিন মনে মনে তোকে নিজের জীবন সঙ্গিনী ভেবেছিলাম। মামনি ছাড়া ওইভাবে আমাকে কেউ ভাত বেড়ে খাওয়াএনি।

কি এমন তাড়া ছিল রে তোর? যে আমার আসার জন্য ৬ টা মাষও অপেক্ষা করতে পারলি না? আমাকে বাড়ি ফেরার, আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা সুযোগ দিতে পারতিস। তুই জানিস আমার জীবন কিভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে। নিজে বুঝতে পারিনা আমি কোণটা ভালো কোণটা খারাপ। সবাই বলে কেমন যেন আমি বদলে গেছি, আগের মতন খুস মেজাজি ভাবটা নেই। শুধুমাত্র বেচে আছি, নিজেই বুঝতে পারছিনা আমাকে কি করতে হবে না করতে হবে।

মানছি আমি তোর কাছে ছিলাম না, আমার খারাপ সময়ে চলছিল, তোর বন্ধুদের নিয়ে আমার অসুবিধা ছিল, আমার অনেক ভুল ছিল, তোর আর তোর স্বাধীনতার মাঝে আমি দেওাল ছিলাম, মানছি আমি ওত তোকে বুঝতে পারতাম না, কথায়ে কথায়ে ছেঁড়ে চলে যেতাম, খুব চিৎকার করতাম তোর উপর, অনেক কাঁদাতাম তোকে কিন্তু রানী জানিস তোর দিব্যি বলছি- শুধুমাত্র তোকে ভালবেসেছিলাম ।আজ আমি কলকাতার বুকে বসে আছি। চাইলেও তোকে দেখতে পারছিনা। আজ চাইলেও তোর বকাবকি শুনতে পাইনা জানিস।

১৫ দিনের মধ্যে আমাকে ভুলে গেলি বল? ১৫ দিনের মধ্যে আমাদের দেখা সব স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে খুন করে দিলি। ২দিনে আমাকে ভুলে গেলি। তোর মধ্যে কি মনুষ্যত্ব নেই? নারে ঠিকই হয়েছে, আমার সেদিন থেকেই দূরে চলে আসা উছিত ছিল যেদিন থেকে তোকে ভালবাসতে শুরু করেছিলাম, কারন তুই না আমার চাওয়াতে আমার জীবনে এসেছিলিস, না আমার ইছেতে তুই চলে গেছিস। আজ অবধি জানিস তোর ছবি ডিলিট করতে পারিনি; রোজ একবার করে তোর প্রোফাইল খুলে ঢেকে আসি। ভিডিও কলেও কাঁদতিস আমাকে দেখার পর। হ্যাঁ সেবার রেগে বলেছিলাম যে আমাকে আর ফোন করবিনা। কিন্তু তাই বলে এটা বুঝিনি তুই আর ফিরবিনা। কোনদিনও ফিরবি না।

"পাশে থাকাটা জরুরী নয়, সাথে থাকাটা জরুরী"- তোর বলা এই কথাটা বিরক্তিকর লেগেছিল সেদিন যেদিন দেখেছি এই কথাটা  আমি অন্যের জন্য তোকে বলতে।

খুব সুখে আছিস না? অনেক অবলা কথা থেকে গেছে জানিস মনে। আজ তুই সামনে থাকেলে বলতাম-

তোর চোখে চোখ রাখলেই
ধংস অভিযান,
তুই মানেই প্রেমের সুরে
হারিয়ে যাওয়া গান।।
তোর সাথে মাতাল হবো
করব আমরা জরাজরি,
হটাত করেই পাবে প্রেম
লোকে বলবে বারাবারি।।
মধ্য রাতে ফের বেজেছে
বালিশ পাশের ফোনটা,
ওমনি কেমন করছে দেখ
ব্রেইন নামক সেল টা,
ফের বেজেছে
ফের জেগেছে
মধ্য রাতের প্রেমটা।।

Monday, August 27, 2018

অপরাধবোধ

অমিত-নিলেশ-রমিত হোল ৩ বন্ধু। আনন্দগ্রামের বসবাসকারী একদম বাল্যকালের বন্ধু, লোকে ওদের থ্রি মাস্কেটিয়ার্স বলে। ব্যাস্ত জীবনে রোজের খাটাখাটনির পরেও রবিবার বিকালে লালুদার দোকানে চায়ের আড্ডা ওদের কোনদিনও বন্ধ হয়েনা। ওদের কথা বলার জন্য কোন বিষয়ে ভাবতে হয়েনা, ওরা একসাথে ৩জন মিললেই ৪-৫ ঘণ্টা এমনই কেটে যায়ে।

এমনই এক রবিবারের বিকালে ওরা ৩জন বসে গল্প করছে। রমিতের মুখের ভাবমূর্তিতে কেমন এক অসহায়ের ছোপ দেখা গেলো। জিজ্ঞাসা করাতে বলল-ভাই, কদিন ধরে কেমন একটা নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে জানিস।

-কেন রে? আবার কেউ ব্লক করে দিল নাকি?- মজার মেজাজে বসে থাকা নিলেশ বলে উঠল।

-আরে নারে।শোন দাড়া। এইবলে রমিত কিছুটা স্তব্ধ হয়ে আবার বলতে শুরু করল।

সেদিন অফিস থেকে ফিরছিলাম। জানিসই তো বিকাল ৬ টায়ে ওই রাস্তায়ে পিঁপড়ের মাথার মতন মানুষ গিজগিজ করে। ভাগ্য করে ৮৬ নাম্বার বাস টাও পেয়ে গেলাম। ভিড় ঠাসা বাস; কিন্তু উঠে দাঁড়াবার জায়গা কোথায়ে। কিন্তু কার ঘাড়ে কটা মাথা যে কন্ডাক্টরকে বলবে। কন্ডাক্টরের চোখে তো বাস পুরো ফাঁকা। ল্যাপটপের ওজনে পিঠের ব্যাগটা আমাকে পীঠ ধরে যেন নিচে ফেলে দায়ে। সহ্য করতে না পেরে ব্যাগটা সামনে নিলাম ওই ব্যাগের দুই হাতল পিছনে করে বুকের সামনে বোঝার মতন করে। পিছনে লোকজনের ঠেলা খেতে খেতে বাসের বাঁ দিকের লেডিস সিটের দিকে তৃতীয় সিটের সামনে দুই হাত দিয়ে সিট দুটো আঁকড়েধরে দাড়িয়ে থাকলাম। নিশ্চিন্ত এবার ঠেলাঠেলিতে পরে যাবার ভয়টা রইল না। মিনিট সাতেক পর কন্ডাক্টর এসে যথারীতি বাস ভাড়াটা নিয়ে গেলো। নিশ্চিন্ত হয়ে খুচরো পয়সাগুলো পকেটে রাখলাম। খেয়াল করলাম আমার সামনে দুটি মেয়ে আমারই বয়সই হবে, কানে হেডফোন নিয়ে বসে গান শুনছে আর জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। আমার ঠিক সামনের মেয়েটি পরনে ধুসর রঙের কুর্তি, তাতে ছোট জড়ির পার লাগানো, সুশোভিত গোছালো চুল- আলগা বেনুনি করা আর সেই ঘন চুলের গোছাটা ঘাড়ের পাশ দিয়ে সামনে করে রাখা, টিকালো নাখ, শুভ্র দেহ, ওড়না ছাড়া থাকায়ে আমি ওর ঘাড়ের ছোট ছোট চুল গুলোয় ললুপ্ত হয়েগেছিলাম, মেয়েটির সুদৃঢ় সুডোল তনু, ডান হাতে মোবাইল যার সাথে হেড ফোনের তাঁরটা লাগানো আর বাঁ হাতটা এমনই উরুর উপর রাখা। আমি অতি নির্লজ্জের মতন মেয়টিকে দেখে যাচ্ছি। ল্যাপটপের ওজনের ব্যাথার কথাটা যেন আমি ভুলেই গেলাম। শকুনের চোখ দিয়ে আমি ওই মেয়েটির শরীর গ্রাস করছি। নিজের মধ্যে দোষী হবার কোন ভাবনা আমার মধ্যে নেই। ওর শরীরের প্রতিটি ক্ষেত্র যেন আমি অতি সুক্ষতার সাথে দেখে চলছি, আমার এতটুকু চক্ষু লজ্জা নেই।
এইভাবে কিছুদুর বাস এগিয়ে গেলো। সামনে করুন্ময়ি বাস স্টপ, এখানে বাস বেশ কিছুক্ষণ দারাবে। আচমকা মেয়েটি ফোনটা নিয়ে কি যেন দেখল। আনমনা মেয়টি হটাতই অনুধাবন করল আমি মেয়টির পাশে অনেকখন দাড়িয়ে আছি। মেয়েটি আমার দিকে তাকাল। আমি অবাক দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। ওর চিকন গাল, মায়াবী চোখ, ছোট্ট কিন্তু পুরু বিলাসী ঠোঁট, অথচ আমি ওর মুখে এক হাসি দেখতে পাই। সেই মনোহর মুখে চেয়ে আমাকে বলল- "আপনি আপনার ব্যাগটা আমাকে দিতে পারেন। আমি ধরছি।"
কামনতা আমার চোখটা তখন লজ্জায়ে নিচু হয়েযায়ে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি যেন ওই মেয়েটির কথার দাস হয়ে যাই। কিছু না ভেবেই হাত থেকে ব্যাগটা খুলে মেয়টির হাতে দিয়েদি। কৃতার্থবোধের অবকাশ টুকু আমার মনে এলো এর পর, আমিও বললাম- "আপনার অসুবধা হবে না তো?"
মেয়েটি মুগ্ধকারী হাসিতে বলল- "না না" তারপর আবার হেড ফোনের গানে মননিবেশ করল।
আমার মনটা তখন কেমন এক উদাস হয়ে পরল। পুরুষসমাজই দেশে মেয়টি কেমন করে আমকে "নারীপুরুষ অভিন্ন" মানসিকতাটাকে দৃঢ় করে দিল। সমস্থ রাস্তা আমি নিজেকে ধিক্কার জানালাম নিজের পাপ চিন্তাধারার জন্য। "ধন্যবাদ" বলে অতি লজ্জিত চোখে মেয়টির থেকে ব্যাগ নিয়ে গন্তব্য স্থলে নেমে গেলাম।

সেদিন থেকেই জানিস ভাই আমার নিজেকে কেমন একটা অপরাধী লাগছে।

-এতো চিন্তা করিস না। মুচকি হেসে বলল নিলেশ। আরও বলল- তুই যে নিজের অপরাধটা বুঝতে পারলি, এটাই যথেষ্ট। প্রতিদিন ট্রেন বাসে কত মেয়ের এইভাবেই সতীত্বনাশ হয়ে। কখনও পুরুষের চোখ দিয়ে, কখনও ক্ষিপ্ত হাত দিয়ে, কখনওবা ব্যঙ্গ ভাষায়ে কটূক্তি করা। ওই মানুষগুলোর সেই অপরাধবোধটা আজও এলো না।

এই বলে তিনজনেই চায়ে মুখ দিল।

Friday, August 24, 2018

প্রশ্ন

"দাদা, সেই সকাল থেকে কিছুই খেতে দিসনি। খিদে পেয়েছে রে। কিছু খাবার এনে দেনা।"- রাস্তার ধারে ওই আস্তাকুড়োর পাশে খিদেয় কাতর হয়ে পেট চেপে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকা একটা বাচ্চা মেয়ে বলে উঠল। ঝাঁকরা চুল, ছেলেদের ময়লা জামা পরা, হাঁটু ভাঁজ করে বসে লাল চোখটা দিয়ে মেয়েটি চারপাশ দেখছে। নতুন নতুন রঙবেরঙের জামা-কাপর পরে সব মানুষজন হেটে বেরাছে। সামনে একটা খাবার স্টলও আছে, তাতে কি জানো খাবার বানাচ্ছে আর বিক্রিও করছে। মেয়েটি র দেখছে, ওর মতন বয়সী একটা ফুটফুটে মেয়ে হাতে বেলুন নিয়ে কি জানো একটা খেতে খেতে ওরই দিকে তাকিয়ে ছিল, তারপর ওর বেলুন ধরা হাতটা টেনে নিয়ে চলে গেলো একটা বড় মেয়ে। ও আবার খাবারের স্টলটার দিকে তাকাল- সাদা জামা পরা একটা ছোট্ট মেয়েকে মমতার আদরে আপ্লুত হতে। পেটের খিদেটা আবার চারা দিতেই চিৎকার করে উঠল- "এই দাদা, খেতে দিবি?"- এবারের আওয়াজটা আরও জোরে এবং যথেষ্ট গম্ভীর।

সবকিছু জানা, সবকিছু দেখতে পাওয়া ছেলেটা বোনের কাছে আগিয়ে গেলো রাস্তার এপার থেকে। ছিপছিপে চেহারা, খালি গা, খালি পা, পরনে একটা হাঁফ প্যান্ট তাও দড়ি দিয়ে আটকানো। চোখে মুখে অজানার ভান করে বলল
-"কি হয়েছে?এত জালাস কেন? জল খা"
-"সারা দুপুর জলই খেয়েছি। দে না খেতে কিছু"
-"দেখছি। এইখানেই বসে থাকবি, কথাও জাবি না"
এই বলে অজানা এক আশা দিয়ে ছেলেটি আবার রাস্তার এপারে এসে খাবার দোকানটার পাশে দারিয়ে রইল। রাস্তায়ে প্রচুর লোকজন। দুর্গাপূজা বলে কথা, বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ পুজা, তাও নবমী। সারা বছর অপেক্ষারত মানুষগুলো এই পুজার ৪টে দিন খুশির ভাণ্ডারের শেষ বিন্দু অবধি রস আছাধন করতে ব্যাস্ত। তাও ছেলেটা আশা করে দারিয়ে রইল ছোট্ট হাতটা পেটে, কিছু পয়সার আশায়ে।

দূর থেকে গল্পরত ৩টে ছেলে আর ২ জন মেয়ের দল এসে দাঁড়ালো খাবার দোকানটার পাশে। ওদের ফরমাইশে কিছু খাবার তৈরিতে বাস্ত দোকানদার। ছেলেটি ওই গল্পরত দলের মাঝে এসে হাত পাতল। একটি ছেলে সহৃদয়ে জিজ্ঞাসা করল-
-"কিছু খাবি?"
হটাত আশা খুজে পাওয়া ছেলেটা ঘাড় নাড়িয়ে ওর সম্মতি জানাল আর একটা খুশি খুশি মুখ করে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর ওর হাতে কিছু খাবার পেতেই এক হাত দিয়ে সেলাম জানিএ রাস্তার ওপারে চলে এলো।

ছোট্ট বোনের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম ওই ছেলেটি খাবার গুলো ৪ টে ভাগে ভাগ করল। নিজের ভাগের খাবারটা মুখে দিতেই ছেলেটি বোনের মুখের দিকে তাকাল। খাবার খেতে ব্যাস্ত মুখটা কিন্তু ভীষণ খুশি। একটা হাসি দিয়ে ছেলেটিও ওর খাবার মুখে দিল।

নিজের খাবার খেয়ে পরে থাকা দুটি ভাগে হাত দিতে যাওয়া মেয়টির হাত ধরল ওর দাদা। বলল- "ওই দুটি, কালকের বোন। জল খেয়েনে এবার"
দাদার কথা মতন জল খেতে যাবার সময়ে প্রশ্ন করল বোনটি- "হাঁরে দাদা, ওরা কাল আবার আসবে তো?"

Saturday, August 18, 2018

বাড়ির খাবার

"নাহ! তারাতারি স্নান করেনি, বিকালে ফল কিনতে যেতে হবে"- আনমনে নিজেই বিড়বিড় করে বলে স্নান ঘরের দিকে চলে গেলো অনিমেষ।

বেঙ্গালরে আইটি সেক্টরে কাজ করে অনিমেষ, ৪ বছরের অভিজ্ঞতায়ে ৯ জনের টিমের টিম-লিড সে এখন। কলকাতার বিমাগঞ্জে বাড়ি। ব্যাবসাদার বাবা আর ছেলের বাড়ি ফেরার আশায়ে বসে থাকা মামনি; এই হল অনিমেষের বাড়ির কথা। ছোট বেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র, খুবই কষ্ট করে, বাঙ্কের কাছে লোণ নিয়ে ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানায় মনোময় বাবু, অনিমেষের বাবা। নিমন্ত্রন বাড়ি খেতে গেলে, খাবার শেষে আইস-ক্রিমটা নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আসত মনোময় বাবু, নিজে না খেয়ে ছেলেকে খাওয়াবে বলে। কিন্তু কপাল! কলকাতার চাকরিটা বেশিদিন করতে পারলনা অনিমেষ, এই ছোট্ট সুখের সংসারটাকে খাঁখাঁ করে দিয়ে চলে আসে বাঙ্গালরে।

বামুন ছেলের মতন অনিমেষ পইতাটাকে মুছে, জামা-কাপর পরে স্টিলের থালাটা নিয়ে বাড়ির নিচে চলে গেলো। ও এখানে পেয়িং গেস্টে থাকে। সারাদিনের ব্যাস্ততার মাঝে নিজের জন্য সময়ে কম, তিনবেলা খাবার পায়ে বলে নিশ্চিন্তে থাকার আশায় অনিমেষ পেয়িং গেস্টে থাকে। নীচ থেকে খাবার নিয়ে আবার ৪তলায়ে উঠে এসে খাবারটা একটা পেপারের উপর রাখল। সবুজ প্লাস্টিকের বাটিতে একটু চানাচুর আর ভুজিয়া নিলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াটা খুলল, হটাৎ ২ বছর আগের শেয়ার করা পোস্ট দেখছে ও। হ্যাঁ! ৭ই অক্টোবর আজ, ২৮ বছরে পা দিল আজ অনিমেষ।

২ বছর আগের ওই পোস্ট গুলো ওকে সেই পুরানো দিনগুলোতে নিয়ে গেলো। এই জন্মদিনের দিন অনিমেষ হল বাড়ির রাজা। ওর পছন্দের রান্না হবে, ওর পছন্দের ইংলিশ গানে বাড়ি কাঁপবে। পোস্টের ওই ছবিটাতে ওর ২ বছর আগের জন্মদিনের দুপুরের খাবারের পিকচার। তাতে রয়ছে  - বাসমতী চালের ফ্রাইড রাইস, ৫ রকমের ভাজাতে সাজানো থালা, আর থালাকে ঘিরে আছে বিভিন্ন সুস্বদু তরিতরকারি; বা দিক দিয়ে শুরু করলে ঢাকা যাচ্ছে: সুক্ত, পটল চিংড়ি, দই ইলিশ, কষা মুরগি, চাটনি, মিষ্টি দই, ৪ রকমের মিষ্টি ভরা ছোট্ট বাটি আর পায়েস। অনিমেষের মামনি একা হাতে প্রতি জন্মদিনে এমন করে সাজিয়ে খাওয়ায়ে।

মোবাইলটা বন্ধ করে পি.জির খাবারের দিকে তাকাল অনিমেষ, মোটা চালের ভাত আর রসম। ভাতটা মুখে দিতেই বাঁ চোখটা দিয়ে জল গড়িয়ে পরল। আজ সত্যি ওর খুব মনে পড়ছে মায়ের হাতের বাড়ির খাবারের কথা। পুরানো কথা ভাবতে ভাবতে চানাচুর দিয়ে খাবার খাবার খাছে অনিমেষ। মায়ার টান; মামনি ফোন করল, চোখের জলটা মুছে ও ফোনটা তুলল-"হ্যাঁ, মামনি বল"।
-"কি করছিস মনা?"
-"এইতো খেতে বসেছি, মামনি। তুমি কি করছ?"
-"কিছুই নারে, কাজ সেরে টি.ভি টা খুললাম, ভাবলাম মনাকে ফোন করি, কি করছে জন্মদিনের দিন ছেলেটা"
-"সকালে বললাম তো। আজ সারাদিন কোন কাজ নেই।"
-"কি খাছিস রে?"
২ সেকেন্ডের জন্য চুপ, "এইতো মামনি, ভাত, ডাল, তরকারী, আর তোমাকে বলি না যে চানাচুর দিয়ে খাই, দারুন টেস্ট লাগে"
-"কি তরকারী রে?"
-"বাঁধা কপির তরকারী, আলু দিয়ে, পুর তোমার হাতের রান্নার মতন। তুমি চিন্তা করনা মামনি, এখানে তো মণ্ডা মিঠাই পাব না, তবে বিকালে গিয়ে মিষ্টি কিনে খেয়ে নেব"
-"আছা! তুই খাঁ, বিকালে ফোন করব"
-"হ্যাঁ মামনি"।
কাঁদতে কাঁদতে ফোন রাখল দুজনেই।

নাম্বার ডিলিট

কার্ত্তিক মাসের (নভেম্বর মাস) কোনও এক ব্যাস্ত মঙ্গলবার(টুয়েসডে) রোদ্দুর ভরা সকালে অনু কালো চুড়িদার পরে তড়িঘড়ি করে যাচ্ছে বিকালপুর স্টেশনের ট্রেন টিকেট কাটার জন্য। ওহ হ্যাঁ, পরিচয় করিয়ে দি, আনুর ভালো নাম আনুমিতা দে; বাড়ি বিকালপুর , বয়স ২৬,  শ্যামবর্ণা, ৫'৪" উচ্চতা, বেশ সাস্থকর , কোঁকড়ানো চুল, হাসিবিহীন দুটি গাল আর দাম্ভির্য ভরা চোখ। আনু ওকালতি পরে বা বলা যেতে পারে ল প্রাকটিস করতে যায়ে কলকাতা কোর্টে, সপ্তাহে তিনদিন। ৩ বছর বড় দাদাও আছে ওর, কিন্তু ও যা ঠোঁটকাটা , কেই বা সাহস করে ওঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে? ওর মা তো বলা বন্ধ করে দিয়েছে, রেলের কাজ থেকে অবসরপ্রাপ্ত বাবা অসুস্থতার কারণের অনুকে বেশি ঘাটায় না। হয়তো ওকালতি যারা করে তারা এমন স্পষ্টবাদী হতে হয়ে। কিন্তু অনু তো ছোটবেলা থেকেই এমন, হয়তো ছোটবেলা থেকেই ওর উকিল হবার ইছা।

সেদিন ট্রেন খুব লেটে চলছিল। ট্রেনের সময়সীমা অনুযায়ী অনু তড়িঘড়ি করে টিকেটটা কেটে নিলো। ৪ নং প্ল্যাটফর্মের পিছনের ওভার ব্রিজের দিকে এগিয়ে গেলো । বাস্ততার মধ্যে একবার ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বার করে নোটিফিকেশান চেক করতে করতে ব্রিজ দিয়ে হেটে ২ নং প্ল্যাটফর্মের দিকে নেমে চলছে। ওর খুব অদ্ভুত স্বভাব আছে, যে কোন মোবাইল নোটিফিকেশান আসলেই আগে চেক করা, তা সে প্রত্যুত্তর এক সপ্তাহ পরে দিক না কেন।

আনমনা অনু নেমে এলো প্লাটফর্মে, ব্রিজের সিরিটার পাশেই ও দারিয়ে। আনমনা মনে অপেক্ষারত চোখ নিয়ে বাঁ দিকে ট্রেনের সিগনালের দিকে তাকাল, তখনও লাল দেখাছে। ডান দিকে ঘুরে মোবাইলটা সাইডের বাগে ঢোকাতে যাবে এমন সময়ে ওর চোখে পরল সেই জায়গাটা...

৫ বছর আগের কথা... ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট শুভর সাথে অনুর পরিচয়। শুভাদিত্ত রয়চৌধুরী ওরফে শুভ, এক সোশাল মিডিয়াতে অনুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়ে। এক দুর্গা পুজার মহাষ্টমীতে ওদের প্রথম কথা বলা শুরু। সেখান থেকে বন্ধুত্ব বাড়তে থাকে। কোন দিনক্ষণ নেই, এমনই আসতে আসতে দুজন দুজনের খুব ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে। রোজ রাতে গল্প, খুনসুটি, ঝগড়া, নিজের নিজের অহং বোধ , রাগ করে চুপি চুপি কাদা, কথা না বলার পর দুজন দুজনের সোশাল মিডিয়াতে লাস্ট সিন চেক করা আর কথায়ে কথায়ে ব্রেকাপ-- এই ছিল ওদের নিত্ত সঙ্গী। কিন্তু সেবারে অনু খুব কেঁদেছিল যখন জানতে পারল শুভকে ওর চাকরিসুত্রে বেঙ্গালরে চলে যেতে হবে। যাবার আগে ওরা শেষ বাড়ের মতন বিকালপুর স্টেশনে দেখা করে, শুভকে জরিয়ে সেই কি কান্না অনুর। অনেক প্রতিশ্রুতির মাঝে বিদায় দেয়ে অনু শুভকে।

আজ অনুর সেই দিনটার কথা মনে পরে গেলো। ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত চোখ দুটো হটাৎ কেন যেন লাল ভারাক্রন্ত হয়ে উঠল। অনু আর মোবাইলটা ব্যাগে ভরলনা, কন্টাক্ট লিস্টটা খুলে সার্চ করল - "শুভ" বলে। শুভর নীল রঙের শার্ট পরা ছবিটা ভেসে উঠল মোবাইলএ, আর জলে ভরে গেলো অনুর দুচোখ। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিলো অনু। বাঁ হাত দিয়ে আরাল করে চোখের জলটা মুছেনিল। ঠিক এইভাবেই ৫দিন কান্নাকাটি করার পর অনু নিজেকে সামলে নিয়েছিল যখন শুনেছিল রাস্তার মাঝে শুভকে একটা লরি... শেষদিনেও অনু দেখতে যায়নি। আজও চোখ ছলছল আর বুকফাটা অবস্থায় অসহায় অনু "শুভ"র নাম্বার ডিলিট করে দিল।

Wednesday, August 15, 2018

স্বাধীনতা



প্রণমি তোমায়

পেয়েছি? হ্যাঁ, পেয়েছি। শহিদেরা জীবন দিয়ে এনে দিয়েছে ভারতের স্বাধীনতা। আজও ভারতের জাতীয় পতাকায়ে গেরুয়া, সাদা , সবুজ, নীল রঙের সাথে শহীদের রক্তের লাল রঙ দেখা যায়। ব্রিটিশদের অমানবিক অত্যাচার থেকে আজ ভারতীয়রা মুক্ত। কিন্তু আজ? এতদিনের পর যদি আবার ইতিহাসের দিকে তাকাই আমার মনে আবার প্রশ্ন জাগে আমরা কি সত্যি সেই স্বাধীনতা পেয়েছি, আন্তর্জাতিক আধিপত্য ছাড়া?

রাজনৈতিক দলীয় অত্যাচার থেকে স্বাধিনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে স্বাধীনতা, বহু পুরানো কুসংস্কার চিন্তাধারা থেকে স্বাধীনতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধ্যে সোচ্ছার হবার স্বাধীনতা, পারিপার্শ্বিক চাপ থেকে মুক্ত ছিন্তাধারার স্বাধীনতা, নারী অত্যাচার থেকে স্বাধীনতা, সর্বোপরি অশিক্ষা- অরাজকতা- অন্যায়- অত্যাচার- অবিচার- নাশকতা থেকে স্বাধীনতা। বেশিই বলে ফেললাম।  বাস্তবতা দেখলে একটা দেশ স্বাধীন হবার কয়েক বছরের মধ্যেই এত উন্নত হয়না, কিন্তু আমরা হয়েছি, এটা আমার দেশ; ভারত। খুব আশা করি একশবত্ত্রিশ কোটি ভারতিয়বাসিরা যদি প্রতিদিন একটু একটু করে চেষ্টা করে তাহলে আমরা একদিন এই পুণ্যভূমিকে ঠিক পারবো হাজার হাজার বীর শহিদদের স্বপ্নের মতন করে তুলতে।

কিন্তু এখন স্বাধীনতা দিবস বলতে আমরা এখান আমরা যেটা বুঝি তা হলঃ ব্যাস্ত কর্মরত জীবন থেকে একদিনের মুক্তি, দেরী করে ঘুম থেকে উঠে সোশ্যাল মিডিয়াতে স্বাধীনতা দিবসদের একটা পাবলিক পোস্ট , অথবা দায়বদ্ধ হয়ে একটা স্তম্ভে তিরঙ্গা টানিয়ে -সোচ্ছার করে "বান্দেমাতারাম" আর "জয় হিন্দ" বলার পর চারটে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত চালানো - তা সেটা পাড়ার ক্লাব অথবা বাড়ির ছাদ, ব্যাস। সেই দেশভক্তিটা কেন জানো পরেরদিন সকালবেলা থেকে আর খুজে পাওয়া জায়না। মাটিতে লুটিয়ে পরা সেই তিরঙ্গটা সহ্য করে তার সন্তানের দাওয়া অমর্যাদা আর অশ্রদ্ধা। না, খুব নেতিবাচক চিন্তাধারা নয় আমার। প্রেরচিত হই, বহু বহু মানুষের সৎবুদ্ধি, সৎচিন্তা, সৎকর্মের দাড়া। আমি এটা বুঝিনা ওই মানুষগুলোর ভিডিও আর ছবি দেখার পর একটা লাইক বা শেয়ার ছাড়া জেড করে নিজেও কিছু করার কথা কেন ভাবিনা। এই মা কি শুধু তাদের একার? এই মায়ের দুধের একফোঁটা ঋণ কি আমরা শোধ করার চেষ্টা করতে অক্ষম? নই। তাইতো আগেই বললাম একটু চেষ্টা করলেই পারবো। কারন এটা আমাদেরই দায়িত্ব, ওই কাঠফাটা রোদ্দুর এ ঘাম ঝরিয়ে আমরা যেমন চাই আমাদের সন্তানেরা একটু সুখের মুখ দেখুক, ঠিক তেমনি একটু একটু করে ভালোবেসে একটু করে পা বাড়ানো মানে ভারত মাতাকে বলে যাওয়া- মা, তোমার আসন্ন "সন্তানেরা যেন থাকে দুধে-ভাতে"।

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে ...