Saturday, May 11, 2019

আমি পুরুষ

হ্যাঁ... আমি পুরুষ। ছেলে, ছোকরা, পোলা-- এসব আমার ডাক নাম। গালাগাল দিয়েও আমাকে ডাকা হয়ে অনেকভাবে। কিন্তু জানেন, আমি প্রতিবাদ করিনা; আমি মাথা গরম করি কিন্তু ক্ষমাপ্রার্থী থাকি; আমি ভালবাসি কিন্তু প্রকাশ করতে পারিনা; আমি মূল্য দিতে জানি কিন্তু মূল্য পাইনা; আমি কষ্টে টুকরো হতে পারি কিন্তু চোখের জল ফেলতে পারিনা।

অদ্ভুত বৈষম্য করে বানিয়েছে ভগবান আমাকে। প্রতি ৪৮ ঘণ্টায় আমি ৩০ কোটি পরিপূর্ণ শুক্রাণু তৈরি করি বলে আমার মূল্যটা অনেক কম। আমাকে জন্ম নিতে দৌড়ে যেতে হয়ে ডিম্বাণুর দিকে নাহলে সে ৬৭২ ঘণ্টা পর আবার পূর্ণতা পাবে। তারপর আমি আসি পৃথিবীতে অসংখ্য প্রত্যাশার দায়িত্ব নিতে। আমার ছোটবেলাটা খুব ভালই কাটে। কিন্তু জানেন ছোট থেকে দেখি বড়রা গায়ে হাত আমার উপরেই তোলে, নির্দ্বিধায়। আমাকে শেখানো হয়ে এমন এক শিক্ষা যেখানে আমি যেন দায়িত্ব সহকারে পরিবারের উন্নতি করতে পারি। শিক্ষার উপর দাড়িয়ে আমাকে যাচাই করা হয়ে- হয়ে "ভালো ছেলে" নতুবা "বখাটে"।

যৌনতা আসলে আমকে "কিশোর" থেকে "যুবক" হবার সম্মতি দাওয়া হয়ে। শেখানো হয়ে "দায়িত্ব" নামক বোঝা টানার কৌশল। ধিরে ধিরে আমকে একটা টাকা রোজগারের মেশিন তৈরির প্রস্তুতি চলে। সমাজ প্রথমে সেই প্রস্তুতির নাম দায় "শিক্ষা", আমার পছন্দ অপছন্দ পরয়া না করে আমি কিভাবে রোজগার করতে পারবো সেই দিকে ঠেলে দাওয়া হয়ে, মাধ্যম হয়ে সেই "শিক্ষা"। আর সেই শিক্ষিত হয়েও রোজগার না করতে পারলে "বেকার জুবকের" মূল্য কমতে থাকে, কারন সে পিছিয়ে পরেছে। এইবার আসি যৌনতায়। আমি ভালবাসতে শুরু করি এই যুবক অবস্থায়। বলাই বহুল্ল, আমি "নাড়ী"র মন রাখতে ৯৯.৯৯% সাফল্য পাই। কিন্তু সেই ভালবাসার ঠোটের আলগা চুম্বন পালিয়ে যায় আমার বেকার বেকার জীবন থেকে, বেরিয়ে যায় আমার ব্যার্থও জীবন থেকে। আমি তাও প্রচেষ্টা করি- কখনো প্রলভন দেখিয়ে, কখনো মিথ্যা প্রত্যাশা দিয়ে, কখনো হুমকি দেখিয়ে, কখনো অত্যাচার করে।

মধ্যবয়স্কে এসে ওই জুবকেরা পরিপূর্ণতা পায় টাকা রোজগারের মেশিনে। এরা শেখে নিজের আবেগকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিভাবে সে দায়িত্বকে বুকে জরিয়ে রাখবে। বলাই বাহুল্য অনেক পুরানো প্রেম, নতুন প্রেমের অবগত হতে পারে এই সময়ে- যারা এই পুরুষটিকে বেকার জীবনে চিনত না। নতুবা বাড়ীর ইচ্ছা পুরনার্থে আমার জীবনে "নাড়ী"র আগমন ঘটে বিবাহ রূপে। শুধু রোজগার, সংসারে তখন আমি আবদ্ধ নই, আমাকে তখন আরও একজন মানুষ আর তাঁর পরিবারকে আগলে রাখতে দায়বদ্ধ হতে হয়। এতটুকু ভুল করতে সে পারবে না এই বয়সে। ভুল মাত্রই সে মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষে পরিনত হতে হবে।
পুরুষের এই পর্যায় , ভালবাসার কোলে সে এই সময়ে "বাবা" ডাকের সাথে অবগত হয়। সুখী সেই প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষটি বাবা হবার আরও একটি বোঝা কাঁধে তুলে নায়।

জানেন- এতো দায়িত্ব কাঁধে নেবার শক্তি কোথায়ে সে পায়? --উত্তরঃ পরিবার। মুখ বুজে ঝর- বৃষ্টি- রোদে পুড়ে সে যেন  খাবার তুলে দিতে পারে তাঁর পরিবারে মানুষের মুখে। শেষ পাতের শেষ আইসক্রিমটা নিজের নয়, সন্তানের মুখে তুলে দিলে সে সন্তুষ্ট, টিফিনের পইসা বাঁচিয়ে স্ত্রীকে গোলাপ দিয়ে সে খুশি। নিজের ব্যাপারে বলতে গর্ব হয়, এই জাতিটার চাওয়া পাওয়া টাই অন্যরকমের। কার্যভারে পরিপূর্ণ আমার জীবনটা কেটে যায় সন্তানকে বড় করে তাঁর সংসার তৈরি করে দিতে দিতে। সুখের আশায় বিবাহিত জীবনটাও কেটে যায়।

কিন্তু সেই যে প্রকিতীর খেলা। ওই শক্ত কাঁধটাও একসময়ে বার্ধককের ভারে দুর্বল হয়ে পরে। যে ভাত- কাপড়ের দায় দায়িত্ব বহন করে এসেছি এতদিন আমি, বুড়ো হয়ে সে শুধু অবহেলিত হয়। আমি সেই ভালোবাসা পাইনা যেটার আমার প্রাপ্য। আমার মুখে অসুধ তুলে দিতে আমারই সন্তানের ঘৃণা হয়। আমি চাইনা জীবনের শেষ কটা দিন বৃদ্ধাশ্রমের দেওালের মধ্যে কাটাতে। আর তারপর... একসময়ে সেই "পুরুষের" শরীরটা থেকে আমার আত্মাটাও বেরিয়ে চলে যায়, আর মলিন হয়ে যায় আমার স্মৃতি।

এই ভাবেই আমি প্রতিটি পুরুষের মধ্যে সময়ের সাথে সাথে একটা জীবনচক্রের মতন করে বড় হতে থাকি। আমি থাকি তোমাদের সাথেই- ভাই, দাদা, বন্ধু, বাবা, কাকা, জেঠা, দাদুর রূপে। সোশ্যাল মিডিয়াতে "Men's Day"-এর Celebration-এর সাথে একটু পারলে ভালবেসো আমাকে। আমার চাওয়া পাওয়ার পরিমাণটা খুবই কম...

Friday, March 15, 2019

অবমাননা

তুলি বলেছে আমাকে জীবনের কষ্টটা লিখে প্রকাশ করলে নাকি মন হালকা হয়ে যায়ে। জানিনা কতটা সত্যি। তাও আজ জীবনের সব থেকে বড় কষ্ট আর ভুলের স্বীকারোক্তি করব এই কাগজে। তারপর সেটা আমি পুরিয়ে দেব।

সেদিন দুপুরে বৃষ্টি হয়েছিল। বিকালে আকাশটা লাল হয়ে থম ধরে ছিল। ফোন নিয়ে ঘাটতে ঘাটতে একটা নোটিফিকেশান এলো- "You have a friend request"। নির্মল দেবনাথ। প্রোফাইলটা ঘুরে দেখে ভালই লেগেছিল। confirm বাটনটা টিপেই দিলাম।

একটা মেসেজ এলো। "ধন্যবাদ রোশনি"। কিছুক্ষণ দেখলাম,তারপর একটা smiley দিয়ে ছেঁড়ে দিলাম। সব ছেলে গুলই ওই প্রথমে ভালো কথা বলে তারপর ওদের আসল রুপ বেরিয়ে আসে। দুএকটা আরও প্রশ্ন এলো- "কেমন আছো?","বাড়ির সবাই কেমন আছে?""স্টুডেন্ট না এমপ্লয়ী?"-- দায় সাড়া ভাবে উত্তর দিয়ে ছেঁড়ে দিলাম। এমনই করে চলল কটা দিন। বেশ মিষ্টি কথা বলে। আমি আর নির্মল বন্ধু হয়ে যাই। ভালো পটানোর অভিজ্ঞতা আছে ছেলেটার। না, আর পাঁচটা ছেলের মতন শারীরিক খিদে আর time-pass-এর জন্য মেসেজ করত না। ঘুমতে যাবার আগে হাসিয়েই তবে কথা শেষ করাতো। আর ঘুম থেকে উঠে দেখতাম- একটা গোলাপ দিয়ে "সুপ্রভাত" মেসেজ পরেই থাকত রোজ ইনবক্সে। আমি উত্তর দিলাম না, তাও ওর ভুল হতো না। ভালো টান অনুভব করা শুরু করেছিলাম। নিজের কথা মনে পরে, বাস্তবটা ভাবি আর তারপরেরই কথা বলা বন্ধ করেদিএছিলাম।

২০১৭ তে, আবার মেসেজ আসে ছেলেটার। প্রায় ৩ বছর আগের পুরানো কথা মনে করিয়ে দিল ছেলেটা। আবার সেই কথা, গল্প, রোজ গোলাপ, সায়েরি। জানিনা কেন ও আমাকে নিয়ে এতো কিছু ভাবে। কোনদিনও আমাদের মধ্যে কিছু হতে পারবে না। আমিও নিজেকে সামলাতে পারিনি। দেখাও করি ৩-৪ দিন। প্রতিবার ও হাতে করে গোপাল নিয়ে আসে- কিন্তু কোনদিন কিছু বলেনি। আকর্ষণটা দুদিক দিয়েই ছিল সেটা মনে হয়ে দুজনেই টের পেতাম।

সময়ে কেটেছে অনেকদিন। আমার জীবনের সাথে ওর সাথে সম্পর্কটা যেন সমান্তরালভাবে চলেছিল। আজ ৩ মাস ওর সাথে কথা বলিনি। কাল আমার নিকা হবে ইয়উসুফের সাথে।

সারাজীবন এই কষ্টটা বয়ে চলতে পারবোনা আমি। আজ এই চিঠিতে আমি বলতে চাই- "তোমাকে ভালবেসেছিলাম নির্মল। ধর্মের নামে দোষ দেব না, কিন্তু আমার সাহস হয়েনি আব্বু-আম্মিকে বলার কথা তোমাকে। অনেক অবমাননা করেছি। পারলে ক্ষমা করে দিও"

তোমার দাওয়া অনেক সায়েরির মধ্যে একটা-

"Zaroori nehi ki jeene ka koyi sahara ho,
Zaroori nehi ki jiska hum ho, wo bhi tumhara ho,
Kuch kashtiyan doob jaya karti hain
Zaroori nehi ke har kashti ke naseeb main kinara ho"

Thursday, December 27, 2018

কলঙ্কিনী রাঁধা

আজ সকাল থেকেই দিদিভাই খুব সেজে গুজে ছিল। ও এতো সকালে সেজে গুজে অফিসে যায় না। জানিনা কেন। যাইহোক, আমি রোজকারের মতন সকালে উঠে ঘরের কাজ গুলো করে, খাবার খেয়ে পরতে বসে গেছিলাম। দিদিভাই আর বাবা খেয়ে বেরিয়ে গেছে। এবার ঘর একলা, শান্তি। আমি নিশ্চিন্তে পরতে বসে গেলাম। আমার আবার সামনেই পরিক্ষা। তার উপর আজ বিকালের পড়াটা বাতিল করতে হল। বিকালে জানিনা ভুলভাল কে সব আসবে। জানিনা বাবা! কিসব শুরু করেছে বাড়িতে, আমি এমনই ছোট্ট; সবে বি.এ ২য় বর্ষ।

ভুলভাল বলে কথাটা উড়িয়ে দিলেও আজ আমার জীবনে একটা বড় পরিক্ষা- মা এই কথাটা কেন যে মাথায়ে ঢুকিয়েছিল। আজ আমাকে দেখতে আসবে। তাই সারাটা দিন মাথার মধ্যে একটা গুমোট চিন্তা বাসা বেঁধে পরে ছিল। বিকালের শাড়ীটা দিদিভাই পছন্দ করে বিছানার উপর রেখে গেছিল, আর ওই শাড়ীটার দিকে চোখ গেলেই আরও চিন্তা গুলো নড়ে চড়ে বসে। নীলাভ সবুজ শাড়ীটা, উপরে কালচে বেগুনী রঙের জড়ির কাজ করা, পড়লে এতো মখমলে আর মলায়ম যে অন্যান্য জামদানী শাড়ীর মতন চলা ফেরা করতে অসুবিধা হয়ে না। তাই এই শাড়ীটা ওর খুব পছন্দের।

সকাল থেকে ২০-২৫ বার ফোন করে আমার খোঁজ নাওয়া হয়েগেছে ওর। এইতো দুপুরে খাবার পর ফোনে মাকে বলছে- টুলু যেন খেয়ে না ঘুমিয়ে পরে। স্নেহ, মমতায়, ভালোবাসা, আদর, শাসনে দিদিভাই আমার দ্বিতীয় মা।

ঘড়ীর কাঁটায়ে ৪.৩০ তখন, মা বলল তৈরি হতে। ছেলে বাড়ি থেকে নাকি ৬ টার দিকে আসবে। বাবা, ছেলে বাড়ির লোকজনকে ফোনে বাড়ির পথের দিকগুল বলছে মনে হয়ে। মা কি যেন করছে রান্না ঘরে। আমি একগুচ্ছ উত্তেজনা আর উদ্দেক নিয়ে নিজেকে আয়ানায় সাঁজাতে ব্যাস্ত। এমনই সময়ে শাঁখের কড়াত! আজই টি.ভি সারানোর মেকানিকটা এসেছে। শাড়ীতে সেফটি পিনটা লাগাতে যাব আর ওইদিকে ছেলে আর ছেলে বাড়ির লোকজন এসেগেল। কি আর হবে! বাবা ওদেরকে আমার ঘরেই বসাল। কারন দস্যু মেকানিকটা ওই ঘরে টি.ভি নিয়ে বসেছেন।

হলুদ টি- শার্ট, একটা জ্যাকেট আর জিন্‌স পরে চলে এসেছে দিব্যি ছেলেটা, ভুল! যুবকটা। আমি মনে মনে যতটা বুড়ো আর খারাপ ভাবছিলাম, ততটাও খারাপ নয়। শাড়ী ঠিক করার নাম করে ৩ বার দেখেও নিএছি। অগত্যা পাথরের মতন চেয়ারে বসতে হল। কিন্তু যতটা উদাসিন হবো ভেবে বসেছিলাম, ততটা হইনি। ছেলে আর ছেলে বাড়ির লোকজন খুব অমায়িক আর সরলপ্রাণ। খুব অল্প সময়েই একটা স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশের শুরু হয়েগেছিল। সেটা বেশিক্ষণ থাকল না। তীরের বানের মতন একটা প্রশ্ন এলো ওদের তরফ থেকে- " আচ্ছা! বড় মেয়ের বিয়ের বাপ্যারে ভাবেননি? "

২ সেকেন্ডের জন্য সবাই চুপ। মায়ের হাসিটাও হারিয়ে গিয়ে একটা কৃত্রিম হাসি বেরিয়ে এলো। তারপর একটা স্থব্ধতার মধ্যে মা কিছু কথা ওদেরকে বলছিল যেই কথা গুলো আমি মনে করতে চাইনা কোনদিনও।

মা বলল- তখন ২০১৬ সাল, তুকাই, আমার বড় মেয়ের খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল। ওর ভালো নাম শ্রেয়সী। সে কি মজা। আমাদের বাড়ির প্রথম বিয়ে। খুব হুল্লোড়। ছেলের বাড়ি থেকে জানেন ৩ তোলার একটা হার আমার মেয়েকে দিয়েছিল। খুব আনন্দ হয়েছিল বিয়ের দিন। কত্ত বাজি পোরানো হয়েছিল। খুব আনন্দের সাথে দিনটা কেটেছিল। ওর বাবা, মানে আমার হাসব্যান্ড একটা বড় চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। বিয়ের দিন রাতে ওনার হাসি মুখটা আজও মনে পরে আমার।
বউ ভাতের দিন আমরা আবার মজা করে গাড়ি নিয়ে ওদের বাড়ি যাই। গিয়ে দেখি তুকাইের চোখ লাল। প্রথমে ভাবলাম আমাকে দেখে কাঁদছে হয়েতো, কোনদিন আমাকে ছেঁড়ে থাকেনি। কিন্তু না। মেয়ে জানাল আমাকে- মা! কালরাত্রিতে, ছেলে আমাকে আলাদা করে ডেকে বলল- একটা কথা বলি, দয়া করে কাওকে জানিও না। তোমার যত খুশি শপিং করার করো, সোনায় মুরিয়ে রাখব তোমাকে, কিন্তু দয়া করে কোনদিন কাওকে জানিও না যে আমি যৌনসঙ্গমে শক্তিহীন।
কি আর বলি দুঃখের কথা, মেয়ের কান্না আর ওই কথা শুনে রক্ত হিম হয়ে যায়ে আমার, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। সাথে সাথে ওর বাবার হার্ট এটাক।
দেড় বছর লাগে। কোর্টের মামলার রায় বেরোয়। তুকাইের বিয়েটা নাকচ করা হয়। এটা কোর্টের ভাষায় নালিফায় বিয়ে, ডিভোর্স নয়। কারন ও ছেলের বাড়িতে ৩দিন থেকেছিল। সম্পর্ক তো দূর, কাঁদতে কাঁদতে মেয়টার জীবন শেষ হয়ে গেছিল।
সব সেরে উঠতে ২ বছর লাগে। তুকাই তাই বলে- টুলুর বিয়েটা আমি সামনে দাড়িয়ে দেব।

২ বছরের অবসাদটা মা কয়েকটা লাইনে ওদেরকে জানিও দিল। মিষ্টি খাওয়া দাওয়া আর কিছু প্রশ্ন উত্তরের বৈঠক শেষ করে ছেলে আর ছেলে বাড়ির লোকজন চলে গেল।

রাত ১০.৩০। দিদিভাই,মা আর আমি আমার ঘরেই বসেছিলাম। দিদিভাইকে সব বলছিলাম। চুলে ঢাকা মাথা নিচু করে রাখা দিদিভাইয়ের মুখটা দেখতে পাছহিলাম না। মুখ তুলতেই সেই বউ ভাতের দিনের মতন চোখ লাল করে মায়ের দিকে তাকিয়ে দিদিভাই বলল- মা, আবার বলছি , টুলুর বিয়েটা আমি সামনে দাড়িয়ে দেব। ওর মুখের হাসি দেখলেই আমি সুখি হবো। ১ টা বাচ্ছা বা ২ টো বাচ্ছার বাবাকে আমি বিয়ে করতে পারবো না মা। আমি ডিভোর্সি মেয়ে নই, ৩ দিনের সিঁদুরের বিয়ে আমি মানি না। আমি কলঙ্কিনী রাঁধা। আমাকে বিয়ের জন্য জোর করো না মা।

বাইরে চলে আসি। মাকে জরিয়ে দিদিভাইকে কাঁদতে দেখতে পারছিলাম না আমি।
৩ দিনের সিঁদুরের বিয়ে আমি মানি না মা

Wednesday, December 5, 2018

দশ টাকা

"দাদুভাইইইইইইইইই!!!!" ভারী পরিনত অথচ তীব্র গলার আওয়াজ শুনলাম।

দাদুবাড়িতে আমার সব থেকে প্রিয় ডাক। আগে "মুন" বলে দিদুন ডাকত। দিদুন চলে যাবার পর ওই বাড়িতে আমার ঘুরতে যাবার জন্য যে সব থেকে বড় অপেক্ষা করে সে হল আমার দাদুভাই।

আমি হলাম মডার্ন নাতি। সকালের গরম দুধ চা আর খবরের কাগজে সকাল হয়ে না আমার, ফেসবুকের নোটিফিকেশান চেক করেই আমার সকাল হয়ে। সেই দিনটার শুরুটাও অন্যথা হয়েনি। তাই দাদুভাইের ডাকটা রীতিমত অবজ্ঞা করে দিলাম। মোবাইলের ৬ ইঞ্চির স্ক্রিনটা আমার সমস্ত ধ্যান, ভাব, বিবেচনা, একাগ্রতাকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে একটা কাল্পনিক জগতের মধ্যে, যেখানে থেকে আমি বাস্তবিক স্নেহ, আদর, ভালবাসাকে অনুভব করতে পারিনা।

"দাদুভাই, চল ঘিএর পরোটা খেয়ে আসি" আমার কোন সাড়া না পেয়ে দোতলা থেকে দাদুভাই আবার আমাকে বলল।

শিবু ময়রার দোকানের ঘিএর পরোটা,সাথে ছোলার ডাল; শালপাতা থেকে পরোটা একটা টুকরো নিয়ে ছোলার ডালে ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে মুখে দিলে প্রথম যে নিঃশ্বাসটা নাক দিয়ে বেরোয়, সেটা ঘিএর; তারপর ময়দা ভাঁজাটা ডালের সাথে মেখে যখন মুখের চারপাশে দাঁত দিয়ে পেষা হয়ে- আমি স্বর্গ সুখ পাই। তাই পেটুক বলে জিভের লালসাটাকে অবহেলা করতে পারলাম না। সাড়া দিলাম- "চলো, যাচ্ছি দাদুভাই"

ফোনটা রেখে জামাকাপড় পরে দোতলা চলে গেলাম। দেখি দাদুভাই আগে থেকেই তৈরি হয়ে বসে আছে, ধবধবে সাদা পায়েজামা আর সিফন ধুতি, সাথে এক গাল হাসি আর বলল- " এইযে দাদুভাই, কই ছিলে? আমি কখন থেকে ডাকছি। শোন আর দেরী করও না, চলো বেরোই। ওই কোনা থেকে আমার লাঠিটা দাওতো"

আমি আমার কোম্পানিতে টিম লিড, তাও দাদুভাইএর কাছে আমি ছোট নাতির মতন প্রবৃত্তিটা রেখে দিয়েছি।
দরজার পাশ থেকে লাঠিটা এনে দিয়ে দুজনে বেরিয়ে পরলাম আসতে আসতে। ঠিক যেমনটা বছর ২০ আগে আমার ছোট্ট হাতটা ধরে দাদুভাই ঘুরতে নিয়ে যেত।

মিনিট আটেকের রাস্তা আমরা ১৬ মিনিটে পৌঁছালাম। শিবু ময়রা এখন আর বেঁচে নেই তবু তার নামের দোকানটা ওনার ছেলে বাবার মতনই চালিয়ে যাছে। দাদুভাই আস্তে আস্তে দোকানের ভিতরে ঢুকে বলল- "কই হে! দুটো করে পরোটা দুই জায়গায় দাও হে দেখি।" আমি সুবোধ বালকের মতন বসে রইলাম।

মিনিট দুয়েক পর পরোটা এসে গেল, দাদুভাই একগাল হাসি দিয়ে বলল-" এই নাও দাদুভাই! গরম গরম খেয়ে নাও"। তারপর দুজনেই পরোটা খেতে মনোনিবেশ করলাম। আমি যেন সেই ছোট্ট বেলার দিনের সুখ ফিরে পাচ্ছিলাম। পরিনত বয়স বলে স্বভাবতই দাদুভাইএর খেতে সময়ে লেগেছিল, তাও আমি খাবার পর হাত ধুয়ে এসে বসলাম। দাদুভাই হাত ধুয়ে কোচল থেকে ৪০ টাকা আর কিছু খুচরো পয়সা নিয়ে দোকানদারকে দিল। আমি ওয়ালেট বার করে ১০০ টাকা বারিয়ে দিতেই ভ্রু কুচকে দাদুভাই তীব্র স্বারে বলল- "পইসা সরা। আমি দিছি তো"

তুমি থেকে তুইতে দাদুভাইের কথা শূনতেই আমি একটু ভয়ে পেয়ে যাই, ছোট্ট বেলা থেকেই ভালবাসা আর ভয়ের অন্যতম স্থান হল দাদুবাড়িতে, দাদুভাইএর উপর। আমি চুপ করে গেলাম। অথচ উৎসুক মন দেখছে  দাদুভাই কিছু একটা খুজছে কোচলে, কিছুক্ষণ পর টের পেলাম যে ৫০ টাকা দিতে পেরেছে, আরও ১০ টাকা বাকি, সেটাই কোচলে হাত বারিয়ে খুঁজছে।

ওয়ালেট পকেটে ঢোকাবোই কি এই দৃশ্য দেখে ১০ টাকা বার করে আমি চুপিসারে দোকানদারকে দিয়ে দিলাম। রৌদ্রের আলোয়ে চিন্তিত দাদুভাইকে ডেকে দোকানদার বলল- "কাকামশাই, হয়েগেছে, আর তো টাকা লাগবে না"

৩২ বছর ব্যাবসাদারের ১০ টাকার হিসেব ভুল হতে পারে না। জিজ্ঞাসা করল ঘুরে- "কেন হে! ৪টা পরোটা ১৫ টাকা করে ৬০ টাকা হয়ে, ৫০ টাকা আমি দিলুম যে!"
"ও লাগবে না কাকামশাই!"- দোকানদার একটু হেসেই বলল।
"ও আচ্ছা"- মনে অনেক প্রশ্ন রেখেই একটা সম্মতিজনক উত্তর দিল দাদুভাই।

দুজনেই বাড়ি ফিরে এলাম। আমার শুধু দিনটাই মনে থেকে গেল। অনেক প্রশ্ন নিরুত্তর থেকে গেল। "কেন দাদুভাই দোকানদারের মিথ্যে কথাটা ধরতে পারল না?", "সবটা জেনে শুনেই কি দাদুভাই চুপ থেকে গেল?", "নাকি বয়সের ভারে ওত হিসেবের খুঁটিনাটি দাদুভাই বুঝতে পারেনি?", "আমি টাকাটা দিয়ে দাদুভাইকে ছোট করলাম না তো?"

কোন উত্তর নেই আমার কাছে। তবুও এখন মনে হয়ে, স্বর্গসুখটা মনে হয়ে পরোটা খাওয়াতে নয়, স্বর্গসুখ হল জীবনে প্রথম আর শেষবার দাদুভাইকে ১০ টা টাকা দিয়ে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছিলাম।

হাসি মুখী শরীরটা জ্বরা জীর্ণ হয়ে কাঁধে উঠলেই শোনে হরিনাম
জানিনা কোথায় আছো? ভালো থেকো, লহো শত সহস্র প্রণাম ।।

Saturday, October 13, 2018

ভয়

"বিকাল ৫টা বেজে গেল, তানিয়াটা এখনও এসে পৌঁছাতে পারল না"- দূর্বা ঘাসের পাতাগুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিজের মনেই বিড়বিড় করছিল রিশভ। "আজ ওর একদিন কি আমার একদিন, সপ্তাহে একদিন দেখা করার সুযোগ মেলে, তাও সময়ে আসতে ওর কি যে হয়ে কে জানে"

এইভাবে বিড়বিড় করতে করতেই ডানদিকের পার্কের গেঁটের দিকে তাকাল রিশভ, মনে একটা শান্তি আর চোখে মুখে রাগের ছাপ ফেলে দেখতে পেল তানিয়াকে। আসতে না আসতেই জোর গলা করে বলে উঠল রিশভ-

"এতো কিসের কাজ তোমার বাড়িতে যে একটা দিন সময় করে দেখা করতে আসতে তোমার এতো অসুবিধা হয়?"

তানিয়া কিছু বলল না, শুধু এক গাল হাসি দিয়ে বলল- "দুপুরে কি খেয়েছো?" বলতে বলতে কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে ব্যাগ থেকে একটা টিফিনবাটি বার করে রিশভকে দিয়ে বলল- "পায়েসটা খেয়ে নাও"

কিন্তু রিশভকে দেখে মনেনা হচ্ছে তানিয়ার দেরী করে আসাটার কথা এখানও মন থেকে ক্ষমা করে দেবার মনভাব নিয়ে বসে আছে। পায়েসের বাটিটা হাতে নিয়ে, আবার বলে উঠল-

"কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলাম কিন্তু।" আজ উত্তর জানতেই হবে,মিষ্টি হাসি আজ মায়ার কাজ করলনা রিশভের উপর, ভ্রু কুচকে সহস্র প্রশ্নের হাড়িওয়ালা চোখ নিয়ে তাকিয়ে- "না সত্যিটা বলত আজ, তোমার এতো কিসের অসুবিধা দেখা করতে আসার?"
"কোথায়ে অসুবিধা? এইতো এসেছি, একটু দেরী হয়েগেছে।"- আবারও হেসে বলল তানিয়া।

"একদিন হলে মানতাম, রোজরোজ মানা যায় না, তানিয়া। তোমাদের মেয়দেরই দেখি এতো আসুবিধা। দেখা করতে আসতে অসুবিধা, ফোনে কথা বলতে অসুবিধা, ঘুরতে যেতে অসুবিধা।"

নিজের উপর কথাগুলো সহ্য করতে পারছিল তানিয়া, কিন্তু রিশভের মেয়দের নিয়ে বলাটা সহ্য করতে পারলনা, নিজের মধ্যে একটা অহংবোধ চারা দিয়ে উঠল। মিষ্টি হাসির পিছনের শত সহস্র  প্রতিবাদে জিতে আসা মনটা থেকে শ্রান্ত হাসিটাও মিলিয়ে গেল তানিয়ার। বলল-

"কথায় কথায় না জেনে মেয়েদের নিয়ে কেন মন্তব্য কর? কতটুকু জানো তুমি মেয়েদের জীবন নিয়ে?"

"সব জানি আমি, তোমরা শুধু অজুহাত খোজ আর ভয় পাও, হা, কথা বলতে ভয় পাও, ঘুরতে যেতে ভয় পাও, শুধু ভয় পাও"

"তাই না?"বিনত হাসি দিয়ে তানিয়া মুখ নিচু করে বলল-"হ্যাঁ, আমরা মেয়েরা ভয় পাই।
ঠিক বলেছ, শুধু ভয় পাই। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ভীত থাকে নারীদের মন।" একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে চোখ মেলে তানিয়া আবারও বলে উঠল-"হ্যাঁ ভয় পাই। আমরা ভয় পাই এটা ভেবে যে মায়ের পেটে ৯ মাষ থাকার পর মেয়ে হয়ে জন্মে নর্দমায় মরে যেতে হয়ে। আমরা ভয় পাই শ্যামলা হয়ে জন্মানোর পর থেকেই। ভয় পাই মেয়ে হয়ে জন্মানোর পর ছেলেদের সাথে খেলতে যেতে। স্কুলে প্রথম পিরিয়ডের লাল দাগ দেখে উত্ত্যক্ত করা ছেলে বন্ধুদের সাথে দিতিয়বার কথা বলতে ভয় পাই। বয়ঃসন্ধি কালের পর মায়ের মানা না শুনে দৌড়াদৌড়ি করতে ভয় পাই। ভয় পাই পুরুষ আত্মীয়সজনের চোখে চোখ রাখতে। গরমকালে ছোট প্যান্ট পরতে ভয় পাই। সালওারের সাইডে বেশি কাটতে, বড় পিঠের ব্লাউজ পরতে ভয় পাই। এমনকি ছেলেদের সাথে উঁচু গলা করে কথা বলতে, একটু ভালভাবে মিশতে ভয় পাই। ভালোবেসে বারে বারে কষ্ট পেটে ভয় পাই। বাড়ি ফেরার সময়ে গণ্ডির বাইরে একটু মজা করতে  ভয় পাই। নাইট ডিউটি করে বাড়ি ফিরতে ভয় পাই, এমনকি দিনের বেলায়ে ৫ টা ছেলে এক জায়গায়ে থাকলে সেখান দিয়ে যেতে ভয় পাই। শ্যামলা হওয়াতে সম্মন্ধ আসলে প্রত্যাখ্যাত হতে ভয় পাই। মায়ের আদর, বাবার ভালবাসা ছেঁড়ে স্বামীর নতুন ঘরে যেতে ভয় পাই। স্বামীর পছন্দকে নিজের করে নিয়েও আমার পছন্দগুলোকে অগ্রাহ্য করতে ভয় পাই। বিবাহিত বলে প্রতি রাতে স্বামীর ব্যবহার হতে ভয় লাগে। ৯ মাষ পেটে রাখার পর নিজের অংশকে পৃথিবীতে আনতেও মেয়েরা ভয় পায়। সংসার সামলে, চাকরি সামলে, অফিসের ইভ টিজিং দূরে রেখে, স্বামিকে সামলে সন্তান বড় করতে ভয় পাই। স্বামীর ঘরকে নিজের করে বানিয়ে, সন্তানের অব্বগ্যা শুনে সেই ঘর ছেঁড়ে বৃদ্ধাশ্রমে মরতে নারীজাতি ভয় পায়।
হ্যাঁ রিশভ, তুমি ঠিকই বলেছ, আমরা মেয়েরা ভয় পাই"

Thursday, September 13, 2018

নিস্তব্ধতা

"আজ বিকালটা যেন কাটতেই চাইছে না। কলেজের ল্যাবটাও আজ তারাতারি শেষ হয়ে গেল।"- বিড়বিড় করে এই কথাটা বলে বিছানাটা ছেঁড়ে উঠে পড়ল সুদীপ। বিছানা ছেঁড়ে ৪-৫ হাত দূরে ড্রেসিং টেবিল পর্যন্ত পায়চারি করছিল, হটাত কি মনে হোল ; বিছানার নীচে সিগারেট আর দেশলাইয়ের বক্সটা বার করে নিয়ে বিছানার পাশের বাল্কনির দরজাটা খুলে বাইরে এলো।

আশ্বিনের বিকাল। সূর্যটা তখনও পুরোপুরি ডোবেনি। আকাশের এক কোনে যেন কে এক ছড়াক আবীরের লাল রঙটাকে ছড়িয়ে দিয়েছে। সুদীপ একটা সিগারেট বার করে জ্বালিয়ে বাল্কনিতে দাড়িয়ে আছে ওই লাল রঙের আকাশটাকে স্থির চোখে তাকিয়ে। আনমনা মনে হটাতই ওর চোখ পড়ল সামনের বাড়ির জানলাটার উপর। রিমা যে জানলার ধারে বসেই ছিল, সুদীপ সেটা বুঝতেই পারেনি।

রিমা, সুদীপের কলেজেই পরে। সেই ছোট্ট বেলা থেকে ওরা দুজন দুজনকে চেনে। একসাথে বড় হওয়া, একসাথে খেলাধুলো, একসাথে বন্ধুত্ব, একই সাথে একই সাবজেক্ট নিয়ে কলেজে প্রবেশ। এক সাথে বড় হওয়া বন্ধু গুলোর মতন ওদের মধ্যে কোন রেষারেষি ছিলনা কোনোদিনই। কলেজটা যত শেষের দিকে এগিয়ে আসছে, সুদিপ-রিমার সম্পর্কের সেঁকলটা ততো ওদের আস্টেপিস্টে বেঁধে ফেলেছে। বলাই বাহুল্য, সুদীপ আর ওর নিজের জীবনটাকে রিমা ছাড়া ভাবা শুরু করেনি। ওর ভাবনা- যেমনটা করে ওদের জীবনের ২৪ টা বছর কেটে গেছে, বাকি জীবনটাও সেভাবেই বন্ধুত্ত-স্নেহ-খুনসুটিতে কেটে যাবে।
কিন্তু এমনটা হয়েতো ওদের বাবা-মা ভাবেনি। গত পরশু কানা-খুসোতে সুদীপ জানতে পারে, রিমার বাড়িরতে ছেলে দেখাশুনো চলছে। যাচাই করতে কাল সুদীপ, রিমাকে জিজ্ঞাসা করেছে, কিন্তু কোন লাভ হয়েনি। ব্যাপারটা রিমাও প্রথম শুনেছে সুদীপের মুখ থেকে, রিমাও তাই আশ্চর্য হয়ে যায়ে। এই নিয়ে ওরা আর আলোচনা করেনি নিজেদের মধ্যে। ওরা দুজন এখনও বিচ্ছেদের ব্যাথা অনুভব করেনি।

আজ হয়েতো সেই কথাগুলই সুদীপকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। জানলাতে চোখ পরতেই সুদীপ তাই সেই পরিচিত চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ছিল। কি যেন একটা বই পরছিল রিমা। হটাত একটা দমকা হওয়া দিল। হরিণী ওই চোখ দুটো থেকে রেশমি চুলটা সরাতে রিমাও দেখল ওর সাথীকে, বাঙ্কলিতে দাড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে। কত কি বলা বাকি থেকে গেল , সুদীপের চাওনিতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাছে। হয়েতো একটু ভুল বলা হোল, রিমার চোখে আজ সেই প্রফুল্লতা কেমন মলিন হয়েগেছে সুদীপকে দেখে। এক দৃষ্টিতে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে, একটা শূন্যটা দুজনকে ভিতর থেকে খেয়ে ফেলছে। দুজনে জীবনের বইটা লেখা শুরু তো করেছিল, কিন্তু শেষটা লিখতে পারবে কিনা সেটার কোন সম্ভাবনা ওরা খুজে পেল না। একে অপরের চিন্তায়ে হারিয়ে ফেলা  মনে সুদীপ নিজেকে খুজে পেল যখন বুঝতে পারল ওর হাতের সিগারেটটা জ্বলে ওর আঙুলে সেঁকা দিল। হাত নাড়িয়ে সিগারেটটা ফেলে দিতেই সুদীপ এক চেনা হাসির আওয়াজ শুনতে পেল, দেখতে পেল সুদীপের বাড়ির বাল্কনির উল্টো দিকে থাকা মেয়েটির অপরিম্লান হাসিটা এখানও একই রকম আছে।

Tuesday, September 4, 2018

খুশির দিন

আজ সকাল থেকেই অজানা খুশিতে মিনু ঘরের কাজ করে যাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে বাসি কাজ সেরে মিনু সকালের জল খাবার তৈরির প্রস্তুতি করছে আর গুন গুন করে কি যেন একটা গান ধরেছে। "আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রান সুরের বাঁধনে---" বোধ করি এই গানটাই গুন গুন করে গাইছে। হটাতই গান বন্ধ করে দিয়ে তারস্বরে চিৎকার করল- "অঅঅঅঅমিমিমিতততত!!!!!"
-"উউঠছি"- ভিতরের ঘর থেকে বালিশে চাপা মুখ থেকে খীণ স্বরে ভেসে এলো আওয়াজটা।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার কাজে মন দিল মিনু। ঠিক যেন হটাত বিস্ফোরণের পরের স্থির পরিবেশের মতন।

অমিত,২৯ বছর বয়সই একটা প্রোডাক্ট কোম্পানির ব্যাস্ত ম্যানেজার। বাড়িতে এসে রাতের খাবার খাওয়া, রাতের ঘুম আর ভোরবেলা স্নান সেরে আবার অফিস যাওয়া- বাড়ির সাথে তার এইটুকুই সম্পর্ক। এমনকি রবিবারও সে বাড়িতে ল্যাপটপে কাজের রাশি নিয়ে বসে থাকে। সহজ সরল জীবন জাপনের থেকে মুখ সরিয়ে ধকলমূলক ব্যাস্ত কাজে অমিত নিজের খুশি খুজে পায়ে।

অপরদিকে- মিনু ওরফে মানসী, ২৭ বছরের প্রাপ্তবয়স্কা শুভ্র, শান্ত, সুশ্রী, স্রান্ত একটি মেয়ে, যে বাঁধনছাড়া জীবন থেকে বেরিয়ে এসে সে প্রনয়ে বাঁধা পরেছে। সে ব্যাস্ত, নিজের সংসারকে স্বপ্নের সংসারে পরিনত করতে,সে ব্যাস্ত, স্বামীর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে, উড়িয়ে দাওয়া খুশির ডানা গুলোকে লাগাম দিয়ে নিজেকে কারো মনের মতন করে তুলতে ব্যাস্ত, সর্বোপরি ওর ওই লাল সিঁদুর-শাঁখা-পলাকে জিয়িয়ে রাখতে সে ব্যাস্ত।

-"কি করছ মিনু?"- ঘরের ভিতর থেকে গম্ভীর গলায়ে জিজ্জাসা করল আমিত।
-"চা বসালাম, রুটি তরকারী করব এরপর, তুমি তারাতারি তৈরি হয়ে নাও" অনুরাগী মন, নিজ মনে হেসে মিনু আবারও বলল- "আজ জানো তোমার প্রিয় বাটার পনিরটা করব ভাবছি"

কথাটা শেষ হতে না হতেই ঘর থেকে কি যেন খছ খছ আওয়াজ এলো। সন্দেহের মতন করে একবার ভেবে মিনু আন্দাজ করলো অমিত হয়তো নতুন টুথ ব্রাশ খুঁজছে। আনমনা হয়ে গুন গুন করতে করতে আবার নিজের কাজে মন দিল সে।

রান্নাঘরে হটাত বজ্র বিদ্যুতের মতন আবির্ভাব ঘটল আমিতের। কাজে ব্যাস্ত মিনু সবজি হাতেই ঘুরে দাঁড়ালো।এ যেন এক হাসকর রূপে! মিনুর এক হাতের পনিরের এক টুকরো, তাই নিয়ে ও ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আমিতের দিকে; কালকে রাতের বাসী নমনীয় কাপড় পরা, চুল এলমেল, ঘুম ভরা চোখ আর হাত দুটো পিছনে করে রাখা। আকস্মাত উদয়নে বিস্মিত মিনু বলল "কি হয়েছে?"

২ সেকেন্ড সব স্তব্ধ। আমিত একটা মলিন হাসি হাসল।

এ যেন সেই ব্যাস্ত মিনুর জীবনের এক বিরল দিন। না! ব্যাস্ততায়ে সদ্য বিবাহিত সম্পর্ক ভুলে যাবার ছেলে আমিত নয়। এর আগেও অনেকবার কাটা সবজি থেকে গাজর তুলে খেয়ে নাওয়া, এঁটো বাসন রান্নাঘরে এসে রেখে দাওয়া, ব্যাস্ত কাজে বিরক্ত করতে এসে পিছন থেকে মিনুকে আদরের আলিঙ্গন- এসবে মিনু ওয়য়াকিবহল। কিন্তু আজ যেন সেসব ইঙ্গিতের কোন লক্ষন পেল না মিনু আমিতের আকস্মাত উদয়নে।

হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল আমিত। অপ্রত্যাশিত মিনুর মন তখন, চখ দুটো বড় হয়ে গেলো, হাত থেকে পনিরের টুকরোটা পরে গেলো। আমিত পিছনে রাখা হাতটা  সামনে আনল। বিস্মিত মিনুর চোখ তখন আমিতের হাতের দিকে। 

একটা লাল গোলাপ আর একটা চকোলেটের প্যাকেট মিনুর দিকে বাড়িয়ে অমিত বললো -

তুমি চাইলে মেঘ হবো ,এনে দেবো বৃষ্টি ।।
তুমি চাইলে আকাশ,হবো ,হবো হাসির মিষ্টি ।।
তুমি না চাইলেও জনম জনম ,,
বাসবো তোমায় ভালো ।।
তুমি চাঁদ নও, তবে চাঁদের আলো।
তুমি ফুল নও, তবে ফুলের সৌরভ।
তুমি নদী নও, তবে নদীর ঢেউ।
তুমি অচেনা নও, তুমি আমার চেনা কেউ॥
““শুভ জন্মদিন সোনাই!!””

Friday, August 31, 2018

না বলা কথা

আজ ৩১ শে অগাস্ট, আজ থেকে এক বছর আগে তোর সাথে আমার পরিচয়। আজ দিনটা ভুলতে পারছিনা একটুও। আজ সকাল থেকেই তোর তোর ফেসবুক প্রোফাইলটা খুলে খুলে দেখছি। গত বছর এইদিনটায়ে অফিস থেকে ফিরে দেখেছিলাম তুই আমার রিকোয়েস্টটা একসেপ্ট করেছিলি। সেই রাত থেকেই তোকে ভালবেসেছিলাম। আজও বুঝে উঠতে পারলিনা।

আচ্ছা তোর মনে আছে ? নভেম্বরে সেই রাতটা খুব কষ্ট হয়েছিল না তোর ? আমার জন্য তুই স্টেশনে ১.৫ ঘন্টা দাড়িয়েছিলি । আমি দূর থেকে তোকে দেখেছিলাম হলুদ সালোয়ার পরে এসেছিলি, উফফফ কি সুন্দরী না তোকে লাগছিলো । লজ্জায় আমার দিকে তাকাচ্ছিলিই না। তুই গঙ্গার ধারে ওই শিব মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে জানিস আমি কি চেয়েছিলাম ? শুধু তোর খুশি। সেদিন আমি যেন সব পেয়েছির দেশে চলে গেছিলাম। তোর আর আমার তোলা সেদিনের ছবিটা এখানও মামনির মোবাইলে আছে জানিস।

ছুটি শেষ, বেঙ্গালরে ফিরতে হবে। লাস্ট সেদিন কি কান্না কেঁদেছিলি, জানিস রানী, আজও তোর মুখটা ভেসে আসছে। খিমছে ধরে রেখেছিলি আমার হাতটা, চোখ বন্ধ করে রেখে কাঁদছিলিস। আমার কান্নাটা বোধ হয়ে দেখতে পাসনি সেদিন।

ভিডিও কলের জন্য রোজ জালাতিস। আর ঘুমনোর আগে কি একটা মন্ত্র ফুকে দিতিস, আজও জানালিনা। আজও সেদিন কিভাবে বালিশ ছিরেছিলি বলিসনি কিন্তু। ভুলতে পারছিনা জানিস রানী। রোজ ভাবি -ভাবব না তোর কথা, কিন্তু কেন জানিনা এই স্মৃতিগুলো লোহার শেকলের মতন আটকে রেখেছে আমাকে। মনে হয়ে রোজ কেউ হৃদয়টার মধ্যে পাথর দিয়ে মারছে সাথে ওই তীক্ষ্ণ নখর গুলো দিয়ে আসতে আসতে সেই পাথর বার করে দিছে।  দিন দিন এই স্মৃতিগুলো তাড়া করে বেরায়, শুধুমাত্র মামনি বাবার জন্য বেচে আছি, নাহলে ইছা করে ওই স্মৃতির মধ্যে মিসে যাই। একটুও সুখে নেই আমি জানিস। কেন আসিস রোজ তিলে তিলে আমাকে মারতে? কি চাই? যা ছিল সবই তো নিয়ে গেছিস, একটা আধমরা প্রান ফেলে রেখে দিয়ে। 

আবার, আবার আসছে ওই ভাবনা গুলো। কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়ে গেছে মনের ভিতরে সব। যেদিন তোর সাথে দেখা হয়েছিল, লাফিয়ে উঠে জরিয়ে ধরেছিলিলিস সবার সামনে। মনে আছে তোর? বলেছিলি আমাকে জরিয়ে যেন আমি আর কোনদিন তোকে ছেঁড়ে না যাই। সাধে কি বলতাম পাগলী ছিলিস। তা না হলে সারাদিন বাজার করে নিজে না খেয়ে আমার জন্য খাবার রেঁধে নিয়ে আসতিস? সেদিন মনে মনে তোকে নিজের জীবন সঙ্গিনী ভেবেছিলাম। মামনি ছাড়া ওইভাবে আমাকে কেউ ভাত বেড়ে খাওয়াএনি।

কি এমন তাড়া ছিল রে তোর? যে আমার আসার জন্য ৬ টা মাষও অপেক্ষা করতে পারলি না? আমাকে বাড়ি ফেরার, আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা সুযোগ দিতে পারতিস। তুই জানিস আমার জীবন কিভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে। নিজে বুঝতে পারিনা আমি কোণটা ভালো কোণটা খারাপ। সবাই বলে কেমন যেন আমি বদলে গেছি, আগের মতন খুস মেজাজি ভাবটা নেই। শুধুমাত্র বেচে আছি, নিজেই বুঝতে পারছিনা আমাকে কি করতে হবে না করতে হবে।

মানছি আমি তোর কাছে ছিলাম না, আমার খারাপ সময়ে চলছিল, তোর বন্ধুদের নিয়ে আমার অসুবিধা ছিল, আমার অনেক ভুল ছিল, তোর আর তোর স্বাধীনতার মাঝে আমি দেওাল ছিলাম, মানছি আমি ওত তোকে বুঝতে পারতাম না, কথায়ে কথায়ে ছেঁড়ে চলে যেতাম, খুব চিৎকার করতাম তোর উপর, অনেক কাঁদাতাম তোকে কিন্তু রানী জানিস তোর দিব্যি বলছি- শুধুমাত্র তোকে ভালবেসেছিলাম ।আজ আমি কলকাতার বুকে বসে আছি। চাইলেও তোকে দেখতে পারছিনা। আজ চাইলেও তোর বকাবকি শুনতে পাইনা জানিস।

১৫ দিনের মধ্যে আমাকে ভুলে গেলি বল? ১৫ দিনের মধ্যে আমাদের দেখা সব স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে খুন করে দিলি। ২দিনে আমাকে ভুলে গেলি। তোর মধ্যে কি মনুষ্যত্ব নেই? নারে ঠিকই হয়েছে, আমার সেদিন থেকেই দূরে চলে আসা উছিত ছিল যেদিন থেকে তোকে ভালবাসতে শুরু করেছিলাম, কারন তুই না আমার চাওয়াতে আমার জীবনে এসেছিলিস, না আমার ইছেতে তুই চলে গেছিস। আজ অবধি জানিস তোর ছবি ডিলিট করতে পারিনি; রোজ একবার করে তোর প্রোফাইল খুলে ঢেকে আসি। ভিডিও কলেও কাঁদতিস আমাকে দেখার পর। হ্যাঁ সেবার রেগে বলেছিলাম যে আমাকে আর ফোন করবিনা। কিন্তু তাই বলে এটা বুঝিনি তুই আর ফিরবিনা। কোনদিনও ফিরবি না।

"পাশে থাকাটা জরুরী নয়, সাথে থাকাটা জরুরী"- তোর বলা এই কথাটা বিরক্তিকর লেগেছিল সেদিন যেদিন দেখেছি এই কথাটা  আমি অন্যের জন্য তোকে বলতে।

খুব সুখে আছিস না? অনেক অবলা কথা থেকে গেছে জানিস মনে। আজ তুই সামনে থাকেলে বলতাম-

তোর চোখে চোখ রাখলেই
ধংস অভিযান,
তুই মানেই প্রেমের সুরে
হারিয়ে যাওয়া গান।।
তোর সাথে মাতাল হবো
করব আমরা জরাজরি,
হটাত করেই পাবে প্রেম
লোকে বলবে বারাবারি।।
মধ্য রাতে ফের বেজেছে
বালিশ পাশের ফোনটা,
ওমনি কেমন করছে দেখ
ব্রেইন নামক সেল টা,
ফের বেজেছে
ফের জেগেছে
মধ্য রাতের প্রেমটা।।

Monday, August 27, 2018

অপরাধবোধ

অমিত-নিলেশ-রমিত হোল ৩ বন্ধু। আনন্দগ্রামের বসবাসকারী একদম বাল্যকালের বন্ধু, লোকে ওদের থ্রি মাস্কেটিয়ার্স বলে। ব্যাস্ত জীবনে রোজের খাটাখাটনির পরেও রবিবার বিকালে লালুদার দোকানে চায়ের আড্ডা ওদের কোনদিনও বন্ধ হয়েনা। ওদের কথা বলার জন্য কোন বিষয়ে ভাবতে হয়েনা, ওরা একসাথে ৩জন মিললেই ৪-৫ ঘণ্টা এমনই কেটে যায়ে।

এমনই এক রবিবারের বিকালে ওরা ৩জন বসে গল্প করছে। রমিতের মুখের ভাবমূর্তিতে কেমন এক অসহায়ের ছোপ দেখা গেলো। জিজ্ঞাসা করাতে বলল-ভাই, কদিন ধরে কেমন একটা নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে জানিস।

-কেন রে? আবার কেউ ব্লক করে দিল নাকি?- মজার মেজাজে বসে থাকা নিলেশ বলে উঠল।

-আরে নারে।শোন দাড়া। এইবলে রমিত কিছুটা স্তব্ধ হয়ে আবার বলতে শুরু করল।

সেদিন অফিস থেকে ফিরছিলাম। জানিসই তো বিকাল ৬ টায়ে ওই রাস্তায়ে পিঁপড়ের মাথার মতন মানুষ গিজগিজ করে। ভাগ্য করে ৮৬ নাম্বার বাস টাও পেয়ে গেলাম। ভিড় ঠাসা বাস; কিন্তু উঠে দাঁড়াবার জায়গা কোথায়ে। কিন্তু কার ঘাড়ে কটা মাথা যে কন্ডাক্টরকে বলবে। কন্ডাক্টরের চোখে তো বাস পুরো ফাঁকা। ল্যাপটপের ওজনে পিঠের ব্যাগটা আমাকে পীঠ ধরে যেন নিচে ফেলে দায়ে। সহ্য করতে না পেরে ব্যাগটা সামনে নিলাম ওই ব্যাগের দুই হাতল পিছনে করে বুকের সামনে বোঝার মতন করে। পিছনে লোকজনের ঠেলা খেতে খেতে বাসের বাঁ দিকের লেডিস সিটের দিকে তৃতীয় সিটের সামনে দুই হাত দিয়ে সিট দুটো আঁকড়েধরে দাড়িয়ে থাকলাম। নিশ্চিন্ত এবার ঠেলাঠেলিতে পরে যাবার ভয়টা রইল না। মিনিট সাতেক পর কন্ডাক্টর এসে যথারীতি বাস ভাড়াটা নিয়ে গেলো। নিশ্চিন্ত হয়ে খুচরো পয়সাগুলো পকেটে রাখলাম। খেয়াল করলাম আমার সামনে দুটি মেয়ে আমারই বয়সই হবে, কানে হেডফোন নিয়ে বসে গান শুনছে আর জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। আমার ঠিক সামনের মেয়েটি পরনে ধুসর রঙের কুর্তি, তাতে ছোট জড়ির পার লাগানো, সুশোভিত গোছালো চুল- আলগা বেনুনি করা আর সেই ঘন চুলের গোছাটা ঘাড়ের পাশ দিয়ে সামনে করে রাখা, টিকালো নাখ, শুভ্র দেহ, ওড়না ছাড়া থাকায়ে আমি ওর ঘাড়ের ছোট ছোট চুল গুলোয় ললুপ্ত হয়েগেছিলাম, মেয়েটির সুদৃঢ় সুডোল তনু, ডান হাতে মোবাইল যার সাথে হেড ফোনের তাঁরটা লাগানো আর বাঁ হাতটা এমনই উরুর উপর রাখা। আমি অতি নির্লজ্জের মতন মেয়টিকে দেখে যাচ্ছি। ল্যাপটপের ওজনের ব্যাথার কথাটা যেন আমি ভুলেই গেলাম। শকুনের চোখ দিয়ে আমি ওই মেয়েটির শরীর গ্রাস করছি। নিজের মধ্যে দোষী হবার কোন ভাবনা আমার মধ্যে নেই। ওর শরীরের প্রতিটি ক্ষেত্র যেন আমি অতি সুক্ষতার সাথে দেখে চলছি, আমার এতটুকু চক্ষু লজ্জা নেই।
এইভাবে কিছুদুর বাস এগিয়ে গেলো। সামনে করুন্ময়ি বাস স্টপ, এখানে বাস বেশ কিছুক্ষণ দারাবে। আচমকা মেয়েটি ফোনটা নিয়ে কি যেন দেখল। আনমনা মেয়টি হটাতই অনুধাবন করল আমি মেয়টির পাশে অনেকখন দাড়িয়ে আছি। মেয়েটি আমার দিকে তাকাল। আমি অবাক দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। ওর চিকন গাল, মায়াবী চোখ, ছোট্ট কিন্তু পুরু বিলাসী ঠোঁট, অথচ আমি ওর মুখে এক হাসি দেখতে পাই। সেই মনোহর মুখে চেয়ে আমাকে বলল- "আপনি আপনার ব্যাগটা আমাকে দিতে পারেন। আমি ধরছি।"
কামনতা আমার চোখটা তখন লজ্জায়ে নিচু হয়েযায়ে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি যেন ওই মেয়েটির কথার দাস হয়ে যাই। কিছু না ভেবেই হাত থেকে ব্যাগটা খুলে মেয়টির হাতে দিয়েদি। কৃতার্থবোধের অবকাশ টুকু আমার মনে এলো এর পর, আমিও বললাম- "আপনার অসুবধা হবে না তো?"
মেয়েটি মুগ্ধকারী হাসিতে বলল- "না না" তারপর আবার হেড ফোনের গানে মননিবেশ করল।
আমার মনটা তখন কেমন এক উদাস হয়ে পরল। পুরুষসমাজই দেশে মেয়টি কেমন করে আমকে "নারীপুরুষ অভিন্ন" মানসিকতাটাকে দৃঢ় করে দিল। সমস্থ রাস্তা আমি নিজেকে ধিক্কার জানালাম নিজের পাপ চিন্তাধারার জন্য। "ধন্যবাদ" বলে অতি লজ্জিত চোখে মেয়টির থেকে ব্যাগ নিয়ে গন্তব্য স্থলে নেমে গেলাম।

সেদিন থেকেই জানিস ভাই আমার নিজেকে কেমন একটা অপরাধী লাগছে।

-এতো চিন্তা করিস না। মুচকি হেসে বলল নিলেশ। আরও বলল- তুই যে নিজের অপরাধটা বুঝতে পারলি, এটাই যথেষ্ট। প্রতিদিন ট্রেন বাসে কত মেয়ের এইভাবেই সতীত্বনাশ হয়ে। কখনও পুরুষের চোখ দিয়ে, কখনও ক্ষিপ্ত হাত দিয়ে, কখনওবা ব্যঙ্গ ভাষায়ে কটূক্তি করা। ওই মানুষগুলোর সেই অপরাধবোধটা আজও এলো না।

এই বলে তিনজনেই চায়ে মুখ দিল।

Friday, August 24, 2018

প্রশ্ন

"দাদা, সেই সকাল থেকে কিছুই খেতে দিসনি। খিদে পেয়েছে রে। কিছু খাবার এনে দেনা।"- রাস্তার ধারে ওই আস্তাকুড়োর পাশে খিদেয় কাতর হয়ে পেট চেপে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকা একটা বাচ্চা মেয়ে বলে উঠল। ঝাঁকরা চুল, ছেলেদের ময়লা জামা পরা, হাঁটু ভাঁজ করে বসে লাল চোখটা দিয়ে মেয়েটি চারপাশ দেখছে। নতুন নতুন রঙবেরঙের জামা-কাপর পরে সব মানুষজন হেটে বেরাছে। সামনে একটা খাবার স্টলও আছে, তাতে কি জানো খাবার বানাচ্ছে আর বিক্রিও করছে। মেয়েটি র দেখছে, ওর মতন বয়সী একটা ফুটফুটে মেয়ে হাতে বেলুন নিয়ে কি জানো একটা খেতে খেতে ওরই দিকে তাকিয়ে ছিল, তারপর ওর বেলুন ধরা হাতটা টেনে নিয়ে চলে গেলো একটা বড় মেয়ে। ও আবার খাবারের স্টলটার দিকে তাকাল- সাদা জামা পরা একটা ছোট্ট মেয়েকে মমতার আদরে আপ্লুত হতে। পেটের খিদেটা আবার চারা দিতেই চিৎকার করে উঠল- "এই দাদা, খেতে দিবি?"- এবারের আওয়াজটা আরও জোরে এবং যথেষ্ট গম্ভীর।

সবকিছু জানা, সবকিছু দেখতে পাওয়া ছেলেটা বোনের কাছে আগিয়ে গেলো রাস্তার এপার থেকে। ছিপছিপে চেহারা, খালি গা, খালি পা, পরনে একটা হাঁফ প্যান্ট তাও দড়ি দিয়ে আটকানো। চোখে মুখে অজানার ভান করে বলল
-"কি হয়েছে?এত জালাস কেন? জল খা"
-"সারা দুপুর জলই খেয়েছি। দে না খেতে কিছু"
-"দেখছি। এইখানেই বসে থাকবি, কথাও জাবি না"
এই বলে অজানা এক আশা দিয়ে ছেলেটি আবার রাস্তার এপারে এসে খাবার দোকানটার পাশে দারিয়ে রইল। রাস্তায়ে প্রচুর লোকজন। দুর্গাপূজা বলে কথা, বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ পুজা, তাও নবমী। সারা বছর অপেক্ষারত মানুষগুলো এই পুজার ৪টে দিন খুশির ভাণ্ডারের শেষ বিন্দু অবধি রস আছাধন করতে ব্যাস্ত। তাও ছেলেটা আশা করে দারিয়ে রইল ছোট্ট হাতটা পেটে, কিছু পয়সার আশায়ে।

দূর থেকে গল্পরত ৩টে ছেলে আর ২ জন মেয়ের দল এসে দাঁড়ালো খাবার দোকানটার পাশে। ওদের ফরমাইশে কিছু খাবার তৈরিতে বাস্ত দোকানদার। ছেলেটি ওই গল্পরত দলের মাঝে এসে হাত পাতল। একটি ছেলে সহৃদয়ে জিজ্ঞাসা করল-
-"কিছু খাবি?"
হটাত আশা খুজে পাওয়া ছেলেটা ঘাড় নাড়িয়ে ওর সম্মতি জানাল আর একটা খুশি খুশি মুখ করে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর ওর হাতে কিছু খাবার পেতেই এক হাত দিয়ে সেলাম জানিএ রাস্তার ওপারে চলে এলো।

ছোট্ট বোনের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম ওই ছেলেটি খাবার গুলো ৪ টে ভাগে ভাগ করল। নিজের ভাগের খাবারটা মুখে দিতেই ছেলেটি বোনের মুখের দিকে তাকাল। খাবার খেতে ব্যাস্ত মুখটা কিন্তু ভীষণ খুশি। একটা হাসি দিয়ে ছেলেটিও ওর খাবার মুখে দিল।

নিজের খাবার খেয়ে পরে থাকা দুটি ভাগে হাত দিতে যাওয়া মেয়টির হাত ধরল ওর দাদা। বলল- "ওই দুটি, কালকের বোন। জল খেয়েনে এবার"
দাদার কথা মতন জল খেতে যাবার সময়ে প্রশ্ন করল বোনটি- "হাঁরে দাদা, ওরা কাল আবার আসবে তো?"

Saturday, August 18, 2018

বাড়ির খাবার

"নাহ! তারাতারি স্নান করেনি, বিকালে ফল কিনতে যেতে হবে"- আনমনে নিজেই বিড়বিড় করে বলে স্নান ঘরের দিকে চলে গেলো অনিমেষ।

বেঙ্গালরে আইটি সেক্টরে কাজ করে অনিমেষ, ৪ বছরের অভিজ্ঞতায়ে ৯ জনের টিমের টিম-লিড সে এখন। কলকাতার বিমাগঞ্জে বাড়ি। ব্যাবসাদার বাবা আর ছেলের বাড়ি ফেরার আশায়ে বসে থাকা মামনি; এই হল অনিমেষের বাড়ির কথা। ছোট বেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র, খুবই কষ্ট করে, বাঙ্কের কাছে লোণ নিয়ে ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানায় মনোময় বাবু, অনিমেষের বাবা। নিমন্ত্রন বাড়ি খেতে গেলে, খাবার শেষে আইস-ক্রিমটা নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আসত মনোময় বাবু, নিজে না খেয়ে ছেলেকে খাওয়াবে বলে। কিন্তু কপাল! কলকাতার চাকরিটা বেশিদিন করতে পারলনা অনিমেষ, এই ছোট্ট সুখের সংসারটাকে খাঁখাঁ করে দিয়ে চলে আসে বাঙ্গালরে।

বামুন ছেলের মতন অনিমেষ পইতাটাকে মুছে, জামা-কাপর পরে স্টিলের থালাটা নিয়ে বাড়ির নিচে চলে গেলো। ও এখানে পেয়িং গেস্টে থাকে। সারাদিনের ব্যাস্ততার মাঝে নিজের জন্য সময়ে কম, তিনবেলা খাবার পায়ে বলে নিশ্চিন্তে থাকার আশায় অনিমেষ পেয়িং গেস্টে থাকে। নীচ থেকে খাবার নিয়ে আবার ৪তলায়ে উঠে এসে খাবারটা একটা পেপারের উপর রাখল। সবুজ প্লাস্টিকের বাটিতে একটু চানাচুর আর ভুজিয়া নিলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াটা খুলল, হটাৎ ২ বছর আগের শেয়ার করা পোস্ট দেখছে ও। হ্যাঁ! ৭ই অক্টোবর আজ, ২৮ বছরে পা দিল আজ অনিমেষ।

২ বছর আগের ওই পোস্ট গুলো ওকে সেই পুরানো দিনগুলোতে নিয়ে গেলো। এই জন্মদিনের দিন অনিমেষ হল বাড়ির রাজা। ওর পছন্দের রান্না হবে, ওর পছন্দের ইংলিশ গানে বাড়ি কাঁপবে। পোস্টের ওই ছবিটাতে ওর ২ বছর আগের জন্মদিনের দুপুরের খাবারের পিকচার। তাতে রয়ছে  - বাসমতী চালের ফ্রাইড রাইস, ৫ রকমের ভাজাতে সাজানো থালা, আর থালাকে ঘিরে আছে বিভিন্ন সুস্বদু তরিতরকারি; বা দিক দিয়ে শুরু করলে ঢাকা যাচ্ছে: সুক্ত, পটল চিংড়ি, দই ইলিশ, কষা মুরগি, চাটনি, মিষ্টি দই, ৪ রকমের মিষ্টি ভরা ছোট্ট বাটি আর পায়েস। অনিমেষের মামনি একা হাতে প্রতি জন্মদিনে এমন করে সাজিয়ে খাওয়ায়ে।

মোবাইলটা বন্ধ করে পি.জির খাবারের দিকে তাকাল অনিমেষ, মোটা চালের ভাত আর রসম। ভাতটা মুখে দিতেই বাঁ চোখটা দিয়ে জল গড়িয়ে পরল। আজ সত্যি ওর খুব মনে পড়ছে মায়ের হাতের বাড়ির খাবারের কথা। পুরানো কথা ভাবতে ভাবতে চানাচুর দিয়ে খাবার খাবার খাছে অনিমেষ। মায়ার টান; মামনি ফোন করল, চোখের জলটা মুছে ও ফোনটা তুলল-"হ্যাঁ, মামনি বল"।
-"কি করছিস মনা?"
-"এইতো খেতে বসেছি, মামনি। তুমি কি করছ?"
-"কিছুই নারে, কাজ সেরে টি.ভি টা খুললাম, ভাবলাম মনাকে ফোন করি, কি করছে জন্মদিনের দিন ছেলেটা"
-"সকালে বললাম তো। আজ সারাদিন কোন কাজ নেই।"
-"কি খাছিস রে?"
২ সেকেন্ডের জন্য চুপ, "এইতো মামনি, ভাত, ডাল, তরকারী, আর তোমাকে বলি না যে চানাচুর দিয়ে খাই, দারুন টেস্ট লাগে"
-"কি তরকারী রে?"
-"বাঁধা কপির তরকারী, আলু দিয়ে, পুর তোমার হাতের রান্নার মতন। তুমি চিন্তা করনা মামনি, এখানে তো মণ্ডা মিঠাই পাব না, তবে বিকালে গিয়ে মিষ্টি কিনে খেয়ে নেব"
-"আছা! তুই খাঁ, বিকালে ফোন করব"
-"হ্যাঁ মামনি"।
কাঁদতে কাঁদতে ফোন রাখল দুজনেই।

নাম্বার ডিলিট

কার্ত্তিক মাসের (নভেম্বর মাস) কোনও এক ব্যাস্ত মঙ্গলবার(টুয়েসডে) রোদ্দুর ভরা সকালে অনু কালো চুড়িদার পরে তড়িঘড়ি করে যাচ্ছে বিকালপুর স্টেশনের ট্রেন টিকেট কাটার জন্য। ওহ হ্যাঁ, পরিচয় করিয়ে দি, আনুর ভালো নাম আনুমিতা দে; বাড়ি বিকালপুর , বয়স ২৬,  শ্যামবর্ণা, ৫'৪" উচ্চতা, বেশ সাস্থকর , কোঁকড়ানো চুল, হাসিবিহীন দুটি গাল আর দাম্ভির্য ভরা চোখ। আনু ওকালতি পরে বা বলা যেতে পারে ল প্রাকটিস করতে যায়ে কলকাতা কোর্টে, সপ্তাহে তিনদিন। ৩ বছর বড় দাদাও আছে ওর, কিন্তু ও যা ঠোঁটকাটা , কেই বা সাহস করে ওঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে? ওর মা তো বলা বন্ধ করে দিয়েছে, রেলের কাজ থেকে অবসরপ্রাপ্ত বাবা অসুস্থতার কারণের অনুকে বেশি ঘাটায় না। হয়তো ওকালতি যারা করে তারা এমন স্পষ্টবাদী হতে হয়ে। কিন্তু অনু তো ছোটবেলা থেকেই এমন, হয়তো ছোটবেলা থেকেই ওর উকিল হবার ইছা।

সেদিন ট্রেন খুব লেটে চলছিল। ট্রেনের সময়সীমা অনুযায়ী অনু তড়িঘড়ি করে টিকেটটা কেটে নিলো। ৪ নং প্ল্যাটফর্মের পিছনের ওভার ব্রিজের দিকে এগিয়ে গেলো । বাস্ততার মধ্যে একবার ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বার করে নোটিফিকেশান চেক করতে করতে ব্রিজ দিয়ে হেটে ২ নং প্ল্যাটফর্মের দিকে নেমে চলছে। ওর খুব অদ্ভুত স্বভাব আছে, যে কোন মোবাইল নোটিফিকেশান আসলেই আগে চেক করা, তা সে প্রত্যুত্তর এক সপ্তাহ পরে দিক না কেন।

আনমনা অনু নেমে এলো প্লাটফর্মে, ব্রিজের সিরিটার পাশেই ও দারিয়ে। আনমনা মনে অপেক্ষারত চোখ নিয়ে বাঁ দিকে ট্রেনের সিগনালের দিকে তাকাল, তখনও লাল দেখাছে। ডান দিকে ঘুরে মোবাইলটা সাইডের বাগে ঢোকাতে যাবে এমন সময়ে ওর চোখে পরল সেই জায়গাটা...

৫ বছর আগের কথা... ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট শুভর সাথে অনুর পরিচয়। শুভাদিত্ত রয়চৌধুরী ওরফে শুভ, এক সোশাল মিডিয়াতে অনুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়ে। এক দুর্গা পুজার মহাষ্টমীতে ওদের প্রথম কথা বলা শুরু। সেখান থেকে বন্ধুত্ব বাড়তে থাকে। কোন দিনক্ষণ নেই, এমনই আসতে আসতে দুজন দুজনের খুব ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে। রোজ রাতে গল্প, খুনসুটি, ঝগড়া, নিজের নিজের অহং বোধ , রাগ করে চুপি চুপি কাদা, কথা না বলার পর দুজন দুজনের সোশাল মিডিয়াতে লাস্ট সিন চেক করা আর কথায়ে কথায়ে ব্রেকাপ-- এই ছিল ওদের নিত্ত সঙ্গী। কিন্তু সেবারে অনু খুব কেঁদেছিল যখন জানতে পারল শুভকে ওর চাকরিসুত্রে বেঙ্গালরে চলে যেতে হবে। যাবার আগে ওরা শেষ বাড়ের মতন বিকালপুর স্টেশনে দেখা করে, শুভকে জরিয়ে সেই কি কান্না অনুর। অনেক প্রতিশ্রুতির মাঝে বিদায় দেয়ে অনু শুভকে।

আজ অনুর সেই দিনটার কথা মনে পরে গেলো। ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত চোখ দুটো হটাৎ কেন যেন লাল ভারাক্রন্ত হয়ে উঠল। অনু আর মোবাইলটা ব্যাগে ভরলনা, কন্টাক্ট লিস্টটা খুলে সার্চ করল - "শুভ" বলে। শুভর নীল রঙের শার্ট পরা ছবিটা ভেসে উঠল মোবাইলএ, আর জলে ভরে গেলো অনুর দুচোখ। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিলো অনু। বাঁ হাত দিয়ে আরাল করে চোখের জলটা মুছেনিল। ঠিক এইভাবেই ৫দিন কান্নাকাটি করার পর অনু নিজেকে সামলে নিয়েছিল যখন শুনেছিল রাস্তার মাঝে শুভকে একটা লরি... শেষদিনেও অনু দেখতে যায়নি। আজও চোখ ছলছল আর বুকফাটা অবস্থায় অসহায় অনু "শুভ"র নাম্বার ডিলিট করে দিল।

Wednesday, August 15, 2018

স্বাধীনতা



প্রণমি তোমায়

পেয়েছি? হ্যাঁ, পেয়েছি। শহিদেরা জীবন দিয়ে এনে দিয়েছে ভারতের স্বাধীনতা। আজও ভারতের জাতীয় পতাকায়ে গেরুয়া, সাদা , সবুজ, নীল রঙের সাথে শহীদের রক্তের লাল রঙ দেখা যায়। ব্রিটিশদের অমানবিক অত্যাচার থেকে আজ ভারতীয়রা মুক্ত। কিন্তু আজ? এতদিনের পর যদি আবার ইতিহাসের দিকে তাকাই আমার মনে আবার প্রশ্ন জাগে আমরা কি সত্যি সেই স্বাধীনতা পেয়েছি, আন্তর্জাতিক আধিপত্য ছাড়া?

রাজনৈতিক দলীয় অত্যাচার থেকে স্বাধিনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে স্বাধীনতা, বহু পুরানো কুসংস্কার চিন্তাধারা থেকে স্বাধীনতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধ্যে সোচ্ছার হবার স্বাধীনতা, পারিপার্শ্বিক চাপ থেকে মুক্ত ছিন্তাধারার স্বাধীনতা, নারী অত্যাচার থেকে স্বাধীনতা, সর্বোপরি অশিক্ষা- অরাজকতা- অন্যায়- অত্যাচার- অবিচার- নাশকতা থেকে স্বাধীনতা। বেশিই বলে ফেললাম।  বাস্তবতা দেখলে একটা দেশ স্বাধীন হবার কয়েক বছরের মধ্যেই এত উন্নত হয়না, কিন্তু আমরা হয়েছি, এটা আমার দেশ; ভারত। খুব আশা করি একশবত্ত্রিশ কোটি ভারতিয়বাসিরা যদি প্রতিদিন একটু একটু করে চেষ্টা করে তাহলে আমরা একদিন এই পুণ্যভূমিকে ঠিক পারবো হাজার হাজার বীর শহিদদের স্বপ্নের মতন করে তুলতে।

কিন্তু এখন স্বাধীনতা দিবস বলতে আমরা এখান আমরা যেটা বুঝি তা হলঃ ব্যাস্ত কর্মরত জীবন থেকে একদিনের মুক্তি, দেরী করে ঘুম থেকে উঠে সোশ্যাল মিডিয়াতে স্বাধীনতা দিবসদের একটা পাবলিক পোস্ট , অথবা দায়বদ্ধ হয়ে একটা স্তম্ভে তিরঙ্গা টানিয়ে -সোচ্ছার করে "বান্দেমাতারাম" আর "জয় হিন্দ" বলার পর চারটে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত চালানো - তা সেটা পাড়ার ক্লাব অথবা বাড়ির ছাদ, ব্যাস। সেই দেশভক্তিটা কেন জানো পরেরদিন সকালবেলা থেকে আর খুজে পাওয়া জায়না। মাটিতে লুটিয়ে পরা সেই তিরঙ্গটা সহ্য করে তার সন্তানের দাওয়া অমর্যাদা আর অশ্রদ্ধা। না, খুব নেতিবাচক চিন্তাধারা নয় আমার। প্রেরচিত হই, বহু বহু মানুষের সৎবুদ্ধি, সৎচিন্তা, সৎকর্মের দাড়া। আমি এটা বুঝিনা ওই মানুষগুলোর ভিডিও আর ছবি দেখার পর একটা লাইক বা শেয়ার ছাড়া জেড করে নিজেও কিছু করার কথা কেন ভাবিনা। এই মা কি শুধু তাদের একার? এই মায়ের দুধের একফোঁটা ঋণ কি আমরা শোধ করার চেষ্টা করতে অক্ষম? নই। তাইতো আগেই বললাম একটু চেষ্টা করলেই পারবো। কারন এটা আমাদেরই দায়িত্ব, ওই কাঠফাটা রোদ্দুর এ ঘাম ঝরিয়ে আমরা যেমন চাই আমাদের সন্তানেরা একটু সুখের মুখ দেখুক, ঠিক তেমনি একটু একটু করে ভালোবেসে একটু করে পা বাড়ানো মানে ভারত মাতাকে বলে যাওয়া- মা, তোমার আসন্ন "সন্তানেরা যেন থাকে দুধে-ভাতে"।

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে ...