রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম- " এখন ২ টো বাজে, ৬ টা নাগাদ গঙ্গার ঘাঁটে দেখা কর", সম্মতি জানিয়ে ফোন রেখেদিল শেখর।
সপ্তাহ শেষে বা ছুটির দিনে দেখা হয়েই থাকে এভাবে আমাদের সাথে। বিয়ে ভেঙ্গে যাবার পরে বন্ধুত্বের আসল মর্ম বুঝতে পারি আমি। বাবা মায়ের সম্পর্কের পরে ভগবান এই একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক বানিয়েছে যেটিতে কোন স্বার্থ জরিয়ে থাকে না। পরে আমি ভুল বুঝতে পারি- অর্ধাঙ্গিনীর সম্পর্কের থেকেও পবিত্র এই বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এরা ভালো খারাপ সব সময়ে নিঃস্বার্থ ভাবে পাশে থাকে। তাই ছুটির দিনে শীতের বিকালে গাঁ গরম করা লেপের থেকে আলস্য কাটিয়ে বেরিয়ে ৪ কিলোমিটার দূরে কনকনে ঠাণ্ডাতে দু-কাপ চা আর সিগারেট খেতে চলে যাই। রিলসের সময়ে ওদের গালাগালও যেন ডোপামিনের কাজ করে।
যথারীতি বেরিয়ে পড়লাম শেখরের সাথে দেখা করতে। গঙ্গার ঘাঁটে পৌঁছে একটু বসতেই চোখ টানল এক মায়ের আর তার বাচ্চার সাথে ছুটোছুটির দিকে। ঘাঁটে ছোট ছোট দলে ভাগ করা মানুষ জনের অনেকের এই নির্মল সুন্দর দৃশ্য নজর কেরেছিল। মিনিট পাঁচেক পর দেখি দুহাতে দুটো চায়ের কাপ নিয়ে এক গাল হাঁসি মুখে ঘাঁটের সিঁড়ি নেমে বাঁয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। বললাম- "তুই আমার জন্য চা আনলি কেন, আমাকেও ডেকে নিতিস"। "মেলা ফ্যাছ ফ্যাছ না করে চা মুখে দে, জমিয়ে ঠাণ্ডা পড়েছে" - বলে শেখর বাঁ হাতের হেলমেট মাটিতে রেখে চা মুখে দিল।
আমিও হেঁসে চা মুখে দিয়ে বললাম -"আজ কি ছিল? বিরিয়ানি নাকি কষা ঝোল?"
দ্বিতীয় চুমুকটা শেষ করে একটু থেমেই শেখর বলল- " আজ বাবার বার্ষিকী ছিল, তাই নিরামিষ..."
দুজনের মুখে অভাবের ছায়া ঘনিয়ে এল। দুজনের আড্ডার আগ্রহ নীরবতায় পরিণত হোল। সিগারেট ধরিয়ে শেখর আড্ডার ছলে বলল-" তোর কি খবর? কবে মুক্তি পাবি?"
-"দেখি কোর্ট কবে মুক্তি দায় এই বিষাক্ত সম্পর্কের বাঁধন থেকে"- শেখরের নীরবতাকে কাটানোর প্রচেষ্টাকে স্বাগাত জানিয়ে গপ্ল শুরু করলাম- " তোর ফ্লাটের ই.এম.আই শেষ কবে?"
- " আগামী ২ বছরে শেষ করে দেব"
-"ভালো! কাকিমনির শরীর কেমন আছে? ঘুরতে যাচ্ছিস কথাও"?
-"হ্যাঁ! এই প্রথমবার মাকে নিয়ে ভাইজাগ ঘুরতে যাবার ইচ্ছা"
- ভ্রু কুচকে আমি বললাম-" প্রথম বার?"
-"ওহ তুই জানিস না তাহলে" এই বলে শেখর আটসাঁট হয়ে বসে বলল- আমরা আগে শ্রীরামপুর থাকতাম, বাবা যখন আর্মীতে ছিল।সংসারে আমরা ৪ জন, খুবই টেনেটুনে দিন চলত। সরকারী স্কুল ছিল বলে আমার পড়ার খরচা কম ছিল কিন্তু ভাইয়ের ইংলিশ মিডিয়ামের পড়ার খরচা একটু ছিল। এইভাবে দিন চলতে চলতে আমি কলেজের বয়সে এলাম আর ভাই তখন ক্লাস ৮ এ পড়ে। বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে রেলের কাজ শুরু করে। এক্স-আর্মিদের সরকার অবসরের পরে অন্য কাজে ঢুকিয়ে দায়। পেনশনের টাকা, রেলের কাজের টাকা দিয়ে তখন সংসার চলত। কিছুটা আয় বেড়ে যাওয়ায় বাবা এক বন্ধুকে প্রতি মাসে সঞ্চয় বাবদ টাকা দিয়ে দিত। বাবার আশা ছিল ওই বন্ধু আর বাবা মিলে একটা ব্যাবসা করে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে। ভবিষ্যত পরিকল্পনা ছিল বাবার খুব। এক সময়ে মাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে, আমাদেরকে নিজের তৈরি বাড়ীতে রাখবে... এরকম স্বপ্ন দেখা মানুষটা শুধু ভবিষ্যত নিয়েই তখন ভাবত। নিজের,মায়ের, কারোরই বর্তমান সুখ নিয়ে ভাবেননি। স্ত্রী-পুত্রকে ভালোভাবে রাখার পরিকল্পনা সব বাবারাই করে থাকে। এইসব দেখে আমরাও নিজেদের শখ আল্ল্হাদ কখনও গুরুত্ব দিনি। মা পূজার সময়ে আর বিবাহ বার্ষিকীতে যা শাড়ী কিনত তাই দিয়ে সাড়া বছর কাটিয়ে দিত। আমি ৬ টাকা অটো ভাঁড়া বাঁচাতে হেঁটে কলেজে জেতাম। ৩ টাকার একটা পার্লেজি বিস্কুট কেনার পয়সা মাঝে মাঝে থাকতো না। কলেজে এমন অনেক দুপুরে জল খেয়ে কাটিয়ে দিতাম। বাবা,মা,ভাইও হয়ত এমন অনেক ত্যাগ করেছে কিন্তু আমাদের বাড়ীর সবাই একসাথে হলে হাঁসি মুখে থাকতাম। তারপর আমি কলেজের সাথে সাথে কল সেন্টারে কাজ করে আমার পড়ার খরচা চালাতাম। বাবা তখনও আশা করে যায় যে- বাবার বন্ধুটি পাশে থাকবে জারা জীবন, আর সেই বন্ধুটি বাবার থেকে প্রতি মাসে টাকা নিয়ে ব্যাবসার বন্ধবস্ত করছে। এই সময়ে আমরা ভাঁড়া চলে আসি গঙ্গা পার হয়ে ব্যারাকপুরে। আমার সহেলীর সাথে আলাপ হোল। আমি কলেজ শেষ করে আর্মির পরীক্ষা দিয়ে লোয়ার পজিশনে চাকরি পাই, কিন্তু আমার আশা অনেক বড় ছিল- যদি অফিসার না হতে পারি, আর্মিতে যোগ দেবনা। সেই মুহূর্তে বাবার সাত্থে মতের মিল হলনা। আমি আইটিতে প্রাইভেট যব শুরু করলাম। চেন্নাই চলে গেলাম। বাবা সম্পূর্ণ বসে গেল আর ফোনে শুনতাম খুব চিন্তায়ে থাকতো। ৪ বছর চাকরি করে কবিডে পরে গেলাম। ওয়ার্ক ফ্রম হোম দিল কোম্পানি। বাবার মনে কি চলত কখনও আমাদেরকে বলেননি। কিন্তু মানুষটাকে আস্তে আস্তে মন থেকে ভেঙ্গে পরতে দেখছিলাম। আগের সময়ের তুলনায় আর্থিক সাছন্দ এলেও অভাব অনাটন চলতোই। সম্পূর্ণ সংসার তখনও আমি চালাই, বাবার পেনশনের টাকা মাকে দিত না। এক অদ্ভুত রহস্যের মধ্যে থাকতাম আমরা। বাবার বাইপাস অপেরাশন হল, বাবা আরও শারীরিক ভেঙ্গে পরল, মানসিক ভাবেতো অনেক আগে থেকেই। তারপর বিয়ে হল, সহেলী ভাঁড়া বাড়িতেই বউ হয়ে এল। ধীরে ধীরে সুখের দিন আসতেই বাবার হার্ট এটাক হল। বাবার পেনশনের কাগজ মায়ের নামে করাতে গিয়ে আসল রহস্যের উদ্ঘাটন হল। বাবা থাকতে আমরা কোনদিনও অতিরিক্ত টাকা চাইনি কিন্তু বাবা প্রতি মাসে টাকা তার বন্ধুকে দিয়ে দিত। বাবার ফোনে আমাদের তিন জনের নুম্বের,কিছু অফিসের লোকের আর তরুন দা বলে একজনের নাম্বার সেভ ছিল। বাবা মারা যাবার পর দুমাস ওই নাম্বার থেকে কল আসে, বাবার ব্যাপারে জানার থেকে টাকার খোঁজ করত। আমি দু-একবার খোঁজ নিয়ে ওই তরুন দার বাড়ী যাই, উনি নিউ টাউনে এক রেস্তরা লাগোয়া দোতলা বাড়ীতে থাকেন। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম বাবা আমাদের ভবিষ্যৎ ভেবে যেখানে টাকা জমাত, সে নিজের আঁখের গুছিয়ে খুব ভালই আছে। এসব দেখে আমরা সবাই হতাশ হই আর বাবার মানসিক অশান্তির কারণটাও বুঝতে পারি।
আর এখন কিছু করতে পারব না। টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা যায় না কারণ বাবার আর তরুন বাবুর টাকার লেনদেনের কোন প্রমান নেই।
যাইহোক, এসবের মধ্যে মায়ের জীবনের কোন শখ আর পূরণ হয়েনি। তাই আমি আর সহেলী ঠিক করেছি- মাকে প্রতি বছর একটা ঘুরতে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করতেই হবে। মা-বাবার আশীর্বাদে বাবার পেনশন, ভাই,আমার,সহেলীর রোজগারে মাসে ৩ লাখ টাকা আসে। সেই ভরসাতেই ভাঁড়া বাড়ী থেকে ফ্ল্যাট কেনা। সবটা মায়ের খুশির জন্য বরাদ্দ। উনি খুশি হলেই আমরা খুশি।
কথাগুলো শেষ করে, বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে সিগারেট ধরালো শেখর। আমিও তার সাথে সিগারেট খাওয়া শেষ করে দুজন বাড়ী ফিরে এলাম
বাড়ী ফিরে এলাম কিন্তু মন আমার তখনও শেখরের কথা গুলতে আঁটকে আছে। কত সহজে কয়েকটা লাইন দিয়ে জীবন যুদ্ধের সংক্ষিপ্তসার বলে দিল। জীবনে কতটা সংগ্রাম করে আজ ও এই স্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে, সব সময়ে এক গাল ভরা দাঁড়ি নিয়ে মুখে এক রাশ হাঁসি। মনে নতুন করে অনুপ্রেরণা জাগল। সামান্য একটা ভাঙ্গা বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে এতটা ভেঙ্গে পড়া আমি কখনও শেখরের মত ছেলেদের জীবনের প্রতি দিনের সংগ্রামের অভিজ্ঞতার সাথে সড়গড় হইনি। নতুন করে জিওনের প্রেরণা পেলাম। বছর ২০২৩এর শেষ আর অন্যতম শিক্ষা পেলাম - অভুক্ত থেকে জীবনকে সন্মান করলে জীবন তার ফল স্বারুপ তিন টাকাকে তিন লাখ টাকায় পরিনত করে দেয়। শুধু "হাল ছেঁড়ও না বন্ধু..."






