Friday, December 29, 2023

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম- " এখন ২ টো বাজে, ৬ টা নাগাদ গঙ্গার ঘাঁটে দেখা কর", সম্মতি জানিয়ে ফোন রেখেদিল শেখর। 

সপ্তাহ শেষে বা ছুটির দিনে দেখা হয়েই থাকে এভাবে আমাদের সাথে। বিয়ে ভেঙ্গে যাবার পরে বন্ধুত্বের আসল মর্ম বুঝতে পারি আমি। বাবা মায়ের সম্পর্কের পরে ভগবান এই একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক বানিয়েছে যেটিতে কোন স্বার্থ জরিয়ে থাকে না। পরে আমি ভুল বুঝতে পারি- অর্ধাঙ্গিনীর সম্পর্কের থেকেও পবিত্র এই বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এরা ভালো খারাপ সব সময়ে নিঃস্বার্থ ভাবে পাশে থাকে। তাই ছুটির দিনে শীতের বিকালে গাঁ গরম করা লেপের থেকে আলস্য কাটিয়ে বেরিয়ে ৪ কিলোমিটার দূরে কনকনে ঠাণ্ডাতে দু-কাপ চা আর সিগারেট খেতে চলে যাই। রিলসের সময়ে ওদের গালাগালও যেন ডোপামিনের কাজ করে।

যথারীতি বেরিয়ে পড়লাম শেখরের সাথে দেখা করতে। গঙ্গার ঘাঁটে পৌঁছে একটু বসতেই চোখ টানল এক মায়ের আর তার বাচ্চার সাথে ছুটোছুটির দিকে। ঘাঁটে ছোট ছোট দলে ভাগ করা মানুষ জনের অনেকের এই নির্মল সুন্দর দৃশ্য নজর কেরেছিল। মিনিট পাঁচেক পর দেখি দুহাতে দুটো চায়ের কাপ নিয়ে এক গাল হাঁসি মুখে ঘাঁটের সিঁড়ি নেমে বাঁয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। বললাম- "তুই আমার জন্য চা আনলি কেন, আমাকেও ডেকে নিতিস"। "মেলা ফ্যাছ ফ্যাছ না করে চা মুখে দে, জমিয়ে ঠাণ্ডা পড়েছে" - বলে শেখর বাঁ হাতের হেলমেট মাটিতে রেখে চা মুখে দিল। 

আমিও হেঁসে চা মুখে দিয়ে বললাম -"আজ কি ছিল? বিরিয়ানি নাকি কষা ঝোল?"

দ্বিতীয় চুমুকটা শেষ করে একটু থেমেই শেখর বলল- " আজ বাবার বার্ষিকী ছিল, তাই নিরামিষ..."

দুজনের মুখে অভাবের ছায়া ঘনিয়ে এল। দুজনের আড্ডার আগ্রহ নীরবতায় পরিণত হোল। সিগারেট ধরিয়ে শেখর আড্ডার ছলে বলল-" তোর কি খবর? কবে মুক্তি পাবি?"

-"দেখি কোর্ট কবে মুক্তি দায় এই বিষাক্ত সম্পর্কের বাঁধন থেকে"- শেখরের নীরবতাকে কাটানোর প্রচেষ্টাকে স্বাগাত জানিয়ে গপ্ল শুরু করলাম- " তোর ফ্লাটের ই.এম.আই শেষ কবে?"

- " আগামী ২ বছরে শেষ করে দেব"

-"ভালো! কাকিমনির শরীর কেমন আছে? ঘুরতে যাচ্ছিস কথাও"?

-"হ্যাঁ! এই প্রথমবার মাকে নিয়ে ভাইজাগ ঘুরতে যাবার ইচ্ছা"

- ভ্রু কুচকে আমি বললাম-" প্রথম বার?"

-"ওহ তুই জানিস না তাহলে" এই বলে শেখর আটসাঁট হয়ে বসে বলল- আমরা আগে শ্রীরামপুর থাকতাম, বাবা যখন আর্মীতে ছিল।সংসারে আমরা ৪ জন, খুবই টেনেটুনে দিন চলত। সরকারী স্কুল ছিল বলে আমার পড়ার খরচা কম ছিল কিন্তু ভাইয়ের ইংলিশ মিডিয়ামের পড়ার খরচা একটু ছিল। এইভাবে দিন চলতে চলতে আমি কলেজের বয়সে এলাম আর ভাই তখন ক্লাস ৮ এ পড়ে। বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে রেলের কাজ শুরু করে। এক্স-আর্মিদের সরকার অবসরের পরে অন্য কাজে ঢুকিয়ে দায়। পেনশনের টাকা, রেলের কাজের টাকা দিয়ে তখন সংসার চলত। কিছুটা আয় বেড়ে যাওয়ায় বাবা এক বন্ধুকে প্রতি মাসে সঞ্চয় বাবদ টাকা দিয়ে দিত। বাবার আশা ছিল ওই বন্ধু আর বাবা মিলে একটা ব্যাবসা করে বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে। ভবিষ্যত পরিকল্পনা ছিল বাবার খুব। এক সময়ে মাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে, আমাদেরকে নিজের তৈরি বাড়ীতে রাখবে... এরকম স্বপ্ন দেখা মানুষটা শুধু ভবিষ্যত নিয়েই তখন ভাবত। নিজের,মায়ের, কারোরই বর্তমান সুখ নিয়ে ভাবেননি। স্ত্রী-পুত্রকে ভালোভাবে রাখার পরিকল্পনা সব বাবারাই করে থাকে। এইসব দেখে আমরাও নিজেদের শখ আল্ল্হাদ কখনও গুরুত্ব দিনি। মা পূজার সময়ে আর বিবাহ বার্ষিকীতে যা শাড়ী কিনত তাই দিয়ে সাড়া বছর কাটিয়ে দিত। আমি ৬ টাকা অটো ভাঁড়া বাঁচাতে হেঁটে কলেজে জেতাম। ৩ টাকার একটা পার্লেজি বিস্কুট কেনার পয়সা মাঝে মাঝে থাকতো না। কলেজে এমন অনেক দুপুরে জল খেয়ে কাটিয়ে দিতাম। বাবা,মা,ভাইও হয়ত এমন অনেক ত্যাগ করেছে কিন্তু আমাদের বাড়ীর সবাই একসাথে হলে হাঁসি মুখে থাকতাম। তারপর আমি কলেজের সাথে সাথে কল সেন্টারে কাজ করে আমার পড়ার খরচা চালাতাম। বাবা তখনও আশা করে যায় যে- বাবার বন্ধুটি পাশে থাকবে জারা জীবন, আর সেই বন্ধুটি বাবার থেকে প্রতি মাসে টাকা নিয়ে ব্যাবসার বন্ধবস্ত করছে। এই সময়ে আমরা ভাঁড়া চলে আসি গঙ্গা পার হয়ে ব্যারাকপুরে। আমার সহেলীর সাথে আলাপ হোল। আমি কলেজ শেষ করে আর্মির পরীক্ষা দিয়ে লোয়ার পজিশনে চাকরি পাই, কিন্তু আমার আশা অনেক বড় ছিল- যদি অফিসার না হতে পারি, আর্মিতে যোগ দেবনা। সেই মুহূর্তে বাবার সাত্থে মতের মিল হলনা। আমি আইটিতে প্রাইভেট যব শুরু করলাম। চেন্নাই চলে গেলাম। বাবা সম্পূর্ণ বসে গেল আর ফোনে শুনতাম খুব চিন্তায়ে থাকতো। ৪ বছর চাকরি করে কবিডে পরে গেলাম। ওয়ার্ক ফ্রম হোম দিল কোম্পানি। বাবার মনে কি চলত কখনও আমাদেরকে বলেননি। কিন্তু মানুষটাকে আস্তে আস্তে মন থেকে ভেঙ্গে পরতে দেখছিলাম। আগের সময়ের তুলনায় আর্থিক সাছন্দ এলেও অভাব অনাটন চলতোই। সম্পূর্ণ সংসার তখনও আমি চালাই, বাবার পেনশনের টাকা মাকে দিত না। এক অদ্ভুত রহস্যের মধ্যে থাকতাম আমরা। বাবার বাইপাস অপেরাশন হল, বাবা আরও শারীরিক ভেঙ্গে পরল, মানসিক ভাবেতো অনেক আগে থেকেই। তারপর বিয়ে হল, সহেলী ভাঁড়া বাড়িতেই বউ হয়ে এল। ধীরে ধীরে সুখের দিন আসতেই বাবার হার্ট এটাক হল। বাবার পেনশনের কাগজ মায়ের নামে করাতে গিয়ে আসল রহস্যের উদ্ঘাটন হল। বাবা থাকতে আমরা কোনদিনও অতিরিক্ত টাকা চাইনি কিন্তু বাবা প্রতি মাসে টাকা তার বন্ধুকে দিয়ে দিত। বাবার ফোনে আমাদের তিন জনের নুম্বের,কিছু অফিসের লোকের আর তরুন দা বলে একজনের নাম্বার সেভ ছিল। বাবা মারা যাবার পর দুমাস ওই নাম্বার থেকে কল আসে, বাবার ব্যাপারে জানার থেকে টাকার খোঁজ করত। আমি দু-একবার খোঁজ নিয়ে ওই তরুন দার বাড়ী যাই, উনি নিউ টাউনে এক রেস্তরা লাগোয়া দোতলা বাড়ীতে থাকেন। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম বাবা আমাদের ভবিষ্যৎ ভেবে যেখানে টাকা জমাত, সে নিজের আঁখের গুছিয়ে খুব ভালই আছে। এসব দেখে আমরা সবাই হতাশ হই আর বাবার মানসিক অশান্তির কারণটাও বুঝতে পারি। 

আর এখন কিছু করতে পারব না। টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা যায় না কারণ বাবার আর তরুন বাবুর টাকার লেনদেনের কোন প্রমান নেই।

যাইহোক, এসবের মধ্যে মায়ের জীবনের কোন শখ আর পূরণ হয়েনি। তাই আমি আর সহেলী ঠিক করেছি- মাকে প্রতি বছর একটা ঘুরতে নিয়ে  যাবার পরিকল্পনা করতেই হবে। মা-বাবার আশীর্বাদে বাবার পেনশন, ভাই,আমার,সহেলীর রোজগারে মাসে ৩ লাখ টাকা আসে। সেই ভরসাতেই ভাঁড়া বাড়ী থেকে ফ্ল্যাট কেনা। সবটা মায়ের খুশির জন্য বরাদ্দ। উনি খুশি হলেই আমরা খুশি। 

কথাগুলো শেষ করে, বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে সিগারেট ধরালো শেখর। আমিও তার সাথে সিগারেট খাওয়া শেষ করে দুজন বাড়ী ফিরে এলাম

বাড়ী ফিরে এলাম কিন্তু মন আমার তখনও শেখরের কথা গুলতে আঁটকে আছে। কত সহজে কয়েকটা লাইন দিয়ে জীবন যুদ্ধের সংক্ষিপ্তসার বলে দিল। জীবনে কতটা সংগ্রাম করে আজ ও এই স্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে, সব সময়ে এক গাল ভরা দাঁড়ি নিয়ে মুখে এক রাশ হাঁসি। মনে নতুন করে অনুপ্রেরণা জাগল। সামান্য একটা ভাঙ্গা বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে এতটা ভেঙ্গে পড়া আমি কখনও শেখরের মত ছেলেদের জীবনের প্রতি দিনের সংগ্রামের অভিজ্ঞতার সাথে সড়গড় হইনি। নতুন করে জিওনের প্রেরণা পেলাম। বছর ২০২৩এর শেষ আর অন্যতম শিক্ষা পেলাম - অভুক্ত থেকে জীবনকে সন্মান করলে জীবন তার ফল স্বারুপ তিন টাকাকে তিন লাখ টাকায় পরিনত করে দেয়। শুধু "হাল ছেঁড়ও না বন্ধু..."

Saturday, December 9, 2023

Kankrajhor- দুই দিন প্রকৃতির কোলে

Kankrajhor- দুই দিন প্রকৃতির কোলে 

" সঞ্জয়দা,  তৈরি হয়ে নাও"...এইটুকু শুনতেই হছমছিয়ে উঠে পরলাম। তখন ভোঁর ৬টা বাজে। Back-to-Back meeting-র যেরে ভোরবেলা ওঠা আমি college life-এই ছেঁড়ে এসেছি। তাই দেরী না করে একটু অসম্পূর্ণভাবেই সকালে কোনমতে আগের দিনের গুছিয়ে রাখা জামাপ্যান্ট পরে বেরিয়ে পরলাম প্রকৃতির সাথে দেখা করতে। বাড়ী থেকে হেঁটে একটু এগিয়ে গেলেই main road, অভি বলেছিল আমাকে ওই রাস্তায়ে দাড়িয়ে থাকতে। আমি হেঁটে হেঁটে road-এ উঠতে গিয়ে দেখি আভি- ওর লাল রঙয়ের EcoSport নিয়ে দাড়িয়ে আছে। দৌরে গিয়ে দেখা করেই সেই উল্লাস। বললাম- "তোর ঘুরতে যাবার সময়ে কোন দেরী হয় না, তাইনা?"

-"প্রকৃতির সাথে দেখা করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনা, জানোই তো" - এই বলে অভি একটা cigarette ধরাল। 

একটা বড় লাল রঙয়ের আভা ছড়ান সূর্যটাকে দেখছিলাম উঁকি মারতে আমাদের সমাজের তৈরি socity building-র মাঝখান থেকে। এ যেন আমাদেরই তৈরি barrier... প্রকাশকে আমাদের মাঝে পৌঁছানোর। আমি আর কিছু বললাম না। cigarette- এর ২টো টান দিতেই দেখলাম টয় আর বনি চলে এসেছে।

খুব বেশী দেরী না করে আমাদের luggage গুলো গাড়িতে ভরে দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম, ঘড়িতে দেখলাম- সকাল ৭:৪০। শুরু হোল গাড়ীর ভিতরে বসে হুল্লোড় করা। খুব ভোরে উঠে dicipline করে Gym করা মানুষের মধ্যেও এত স্ফূর্তি দেখা জায়না। IT তে কাজ করা মানুষরা হয়ত তাই হয়ে। সোম থেকে শুক্র দাসত্ব, আর শনি-রবি ত্রাসত্ত। সেই গল্প করতে করতেই পৌঁছে Barrackpore থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে Kolaghat- এ। বনি বলল- এবার Breakfast টা সেরেনি। আমরা লুচি- ঘুগনি আর এক ভাঁড় চা খেয়ে আবার বেরিয়ে পরলাম। 

Google-map এর কথামত Kolaghat থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে আমরা Balihati থেকে turn না নিয়ে কলকাতা-মুম্বাই রোডে চলতে থাকলাম। জীবন্ত মাপ আভি বলল এই High-road- এ ৪০ কিলোমিটার বেশী পরলেও আমরা তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব। আর ঠিক তাই হোল। বেলা ১২ টার মধ্যে আমরা Kharagpur Lodhasuli পৌঁছে যাই। High-road- এর আশেপাশে লাল মাটির ক্ষেত আর মাটির বাড়ীর নজর, উফফ শুধু চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। " লাল মাটির সরানে" শিলাজিতের সেই বিক্ষ্যাত গানটা চালিয়ে শুনতে শুনতে দুপুর ২ টয় ঘাটশিলা পৌঁছে গেলাম। টয় বলল- Burudi Dam দেখে আমরা lunch করব।Ghatshila থেকে একটু দূরে Chengjora মোড় থেকে আমরা একটু এগিয়ে যেতেই প্রথম পাহাড় চোখে পরল। বা-হাতে লাল পাহাড় আর ডান হাতে এক বিশাল বড় হ্রদ( artificial lake you may say)- Burudi Dam। অসাধারন সৌন্দর্য। এটা ডিসেম্বর মাস, তাই অনেক পিকনিক প্রেমী মানুষের আনাগনা হয়েছে দেখলাম। দৃশ্যটা চোখ ফেরানোর মতন নয়। লাল মাটির উপরে একটা স্থির জলে পাশের পাহাড়ের প্রতিছবি... ৩০ মিনিট আমরা সবাই সেটা উপভোগ করে দুপুরের খাবার খেতে বসেগেলাম। 

বিকাল ৪ এর মতন হবে, আমরা আমাদের আগে থেকে বুকিং করে রাখা Dhitang Homestay-এর দিকে এগিয়ে চললাম। রাস্তা ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গলের দিকে এগিয়ে চলছে। গাড়ীর কাঁচটা খুলে বসলাম। আভিকে বললাম একটু দাড় করাও গাড়ীটা, বনের নিস্তব্ধতা একটু অনুভব করতে ইচ্ছে করছে। গাড়ী থেকে নেমে হেঁটে আমরা বনের মধ্যে এগিয়ে চললাম। আমাদের পায়ের আওয়াজ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। যদি দাড়িয়ে পড়ি, শুধু মাছির আওয়াজ ছাড়া বাকি বন সম্পূর্ণ নীরব। এ এক আলাদা অনুভুতি, চারপাশে লম্বা লম্বা শাল গাছ, পরে থাকা শুঁকনো পাতা, আলো কমে আসা লাল মাটির সরু পথে আমরা কিছুক্ষণ বনের নিস্তব্ধতায় দাড়িয়ে থাকলাম। ওরা না থাকলে এই বিকেলের আলোতেও গা ছম ছম করত। আমি কখনও এর আগে এমন নিরবতার সাক্ষী হইনি।

বিকেল ৫ টায়ে আমরা পৌঁছলাম Dhitang Homestay-তে। ঢুকে সেখানে দেখলাম ৪ টে আলাদা আলাদা খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘর আছে- একটার নাম "ধামসা", একটার নাম "মাদল" আরও একটার নাম "ধাসাই" আর কিছু তাঁবু রাখা। আর মাঝখানে বিশাল বড় সাজানো বাগান। কলকাতার ছোট ছোট দামী আর উঁচু উঁচু ফ্ল্যাট দেখতে দেখেতে হটাত করে তাঁবু দেখে মনটা ভরে গেল। বনকে আরও একটু অনুসন্ধান করতে যেতে না যেতেই হটাত শুনতে পেলাম - " ওই দেখো...পিছনে"। ঘাড় ঘোরাতেই আচমকা দেখি ৪ টে ময়ূর বাগানে ঘুরে বেরাছে। চোখটা জুরিয়ে গেল নিল বেগুনি পেখম মেলা একটা ময়ূর আর তার পাশে ঘুরে বেরনো ৩ টে ময়ূরী। 

গাড়ী থেকে ব্যাগ নিয়ে আমরা "মাদল"এ check-in করলাম। মনে মনে একটাই কথা ঘুরছে, ঘরের পিছনের বনটা একটু ঘুরে দেখতে হয়। তাই খুব তাড়াতাড়ি করে ফ্রেশ হয়ে ঘরের পিছনে গেলাম। আকাশের দিকে তাকাতে দেখি সকালে সেই ফ্লাটের মাঝের সূর্যটা এখন পাহাড়ের কোলে নুইয়ে পরেছে। আর পাহাড়ের ছাওয়া ধীরে ধীরে সন্ধ্যের অন্ধকারকে ডেকে আনছে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম অভিও বেরিয়ে এল। এমন সময়ে একজন সাদা শাড়ী পরে হাতে কলসে নিয়ে আমাদের সামনে থেকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলো, হটাতই অভি বলে উঠল- "এই বনে রাস্তা আছে? কোথায়ে যাচ্ছেন  আপনি? "

-"স্নানে যাচ্ছি"... এই বলে মহিলাটি এগিয়ে গিয়ে উধাও হয়ে গেল। টয় আর বনি তখনও রুমের ভিতরে। আমি আর অভি দুজনেই অবাক। বনের মাঝে কোন রাস্তা নেই, একটু মনে সাহস করে এগিয়ে যেতেই দেখি বিশাল নিছু একটা নালা। দুদিক বাধান, নালাটি বনের একপাশ থেকে অন্য পাশে বয়ে গেছে। নালার ওপাশে ঘন কালো অন্ধকার করা বন আর এপাশে বাঁ হাতে বড় বটগাছ আর ডান পাশে ৩ টের মতন বড় কলা গাছ। এই অন্ধকারে মহিলাটি কোথায়ে গেল?গ্রামের মানুষতো চারপাশে নেই,তাহলে? এত বিকালে গ্রামের মানুষ স্নান করে? একরাশ প্রশ্ন নিয়ে আমরা আবার "মাদল"এর রুমে ঢুকলাম। তখন রাত ৮ টা; আগে থেকে বলে রাখা পাতা চিকেন, পোকরা, আর কারাওকে ব্লুটুথ স্পিকার নিয়ে আমরা ৪ জন রাতের নিস্তব্ধতাকে চূর্ণ করে পার্টি আমাজে ভরিয়ে দিলাম। 

কুক্কুরুকুক্কু... করে ডেকে ওঠা মুরগী আর খস খস করে হেঁটে যাওয়া অভির চপল্লের আওয়াজে আসতে আসতে একটা চোখ খুললাম। সেই দেখে হটাতই বনি বলে উঠল- "১১ টা বাজে সঞ্জয়দা..." হছমছিয়ে উঠে বসতেই টয় বলল-" না না... ইয়ার্কি মারছে ওঁ, গুড মর্নিং, ৭ টা বাজে "। "হুম,মর্নিং মর্নিং... তোমরা আমাকে ঘুমোতে দেবেনা..."- চমকে ওঠা চোখটা বুজে আলমরা দিয়ে বলাম আমি। নাহ! আর দেরী করলাম না। রবিবারের সকালটা পুরোটা এক্সপোলার করার চিন্তা নিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি স্নান সেরে তৈরি হয়ে breakfast অর্ডার করলাম। সকাল ৮.২০ বাজে... সকালে খাবারটা এত সুস্বাদু ছিল যে আমি দুটো লুচি আর একটা এক্সট্রা অমলেটও নিয়ে নিয়েছিলাম। টয় আর অভি তখন খাবারের টাকা মেটাছিল আর আমি সেই সময়টাকে নষ্ট না করে এক ভাঁড় চা আর cigarette ধরিয়ে "মাদল"এর সামনে ঝুলিয়ে রাখা দোলনায় চরে বসলাম, বলা চলে একপ্রকার শুয়েই পড়লাম। চারপাশে সবুজ বনের পাতার ফাঁকে আকশটা এপাশ থেকে ওপাশে নরে চলেছে। আকশটা স্থির হতেই আবার করে দোলনাটা পা দিয়ে দুলিয়ে দিলাম। অদ্ভুত মনরম এ সকাল...আনমনা মনটাকে আবার আকর্ষিত করল আভির গাড়ীর হর্ন। সময় হয়ে গেছে বেরিয়ে পরার। 

সকাল ৯.১০, আমরা রওনা হলাম Jhilimili-র দিকে। অভি বলল প্রথমে আমরা Jhilimili-র পাশের Rimil stay-তে বসে আড্ডা মেরে lunch করে আবার একটু বন ভ্রমন করব। তাই আমরা বনের মাঝে tree house-এর খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম Jhilimili-র দিকে। গাড়িতে আমাদের গল্পের বিষয় ছিল- আগের দিন সন্ধ্যে বেলা দেখা ওই সাদা শাড়ী পড়া মহিলার অদৃশ্য হয়ে যাবার রহস্য। দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেল, আমরা Rimil stay-তে পউছেও গেলাম, অথচ আমাদের মধ্যে থেকে যাওয়া রহস্যজনক প্রশ্নের উত্তর আমরা উত্তর পেলাম না। আমার মনে পরে, সেই আলোচনা সকাল ১০.৪০ অবধি চলে, আর তারপরেই আমরা পৌঁছে যাই Rimil stay-তে। ঢুকতেই দেখি বিশাল বিশাল দুটো tree house, ঠিক যেন ৪ টে বড় গাছের মগডালে একটা কুঁড়ে ঘর বানিয়ে রেখেছে। আমরা ৪জন চার দিকে ছড়িয়ে পড়লাম। পূবে টয় গেল tree house দেখতে, পশ্চিমে অভি গেল খাবার অর্ডার করতে, উত্তরের বনের মাঝে বিভিন্ন ফল গাছ নিরীক্ষণ করছিল বনি আর আমি চললাম দখিনে বিশাল বড় Jhilimili-র ঝিলের মাঝে চরে বেরানো White swan দেখতে, বাংলায় আমরা যাকে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর বাহন রাজহাঁস বলে থাকি। এক আর্টিকেলএ পরেছিলাম যে- রাজহাঁস হল জলপাখি পরিবারের বৃহত্তম বর্তমান সদস্য এবং বৃহত্তম উড়ন্ত পাখিদের মধ্যে অন্যতম। আর আমরা যে প্রজাতিটি দেখতে পেলাম সেটা ঠোট হলুদ কালো মিশ্রিত, দেহ সম্পূর্ণ বরফের মতন সাদা আর শান্ত,  খুব সম্ভব এই প্রজাতিকে নিঃশব্দ রাজহাঁস (mute swan) বলে, কারন এরা এদের প্রজাতির মধ্যে সব থেকে শান্ত। গোটা ১৫-১৬ টা রাজহাঁসের সাথে কয়েকটা ছবি তুলে, সবাইকে একজায়গায় ডেকে আমরা আবার চা আর চিকেন পোকরা খেলাম। 

সেই টেবিলে গল্পের টেবিল ছেঁড়ে আমরা  দুপুর ১ টা নাগাদ বেরোলাম গভীর বন দেখতে। আজ আমাদের থাকার জন্য বুকিং আছে Jhinuk Camp-এ। তাই আমাদের আজ দুপুরের খাবার পরেই হবে। রাজহাঁসের গল্প করতে করতে ৩০ কিলোমিটার পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম লোদহাশুলির গভীর অরণ্যে। সরকারী উদ্যোগে ওই বনের মধ্যেও পাকা পিচের রাস্তা ধরে ঘন থেকে ঘনতর হয়ে চলেছে সেই বন। প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার ভেতরে যেতেই আমি মানা করলাম অভিকে-"আর ভিতরে যেও না, আমরা একটু হেঁটে দেখি, তারপর চলে আসব। একটু গাঁ ছম ছম করছে কিন্তু"। "আমারও তাই গো"- পিছন থেকে ভারী গলায় বনিও বলল। সময় এখানে স্থব্ধ। আমাদের চলাচল না করলে কোন শব্দের অস্তিত্ব নেই। এখানে এতটাই নিস্তব্ধ যে আমি আমার নিজের নিঃশ্বাসটাও ফেলা শুনতে পারছি। এত নীরবতায় আমি নিজের জীবনের প্রতিটা মুহূর্তের সাথে নিজের পরিচিতি খুঁজে পাচ্ছিলাম। এইভাবে যদি জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত বাঁচতে পারতাম-একটা ইচ্ছা মনে এল... মিনিট ২০ আমরা সবাই সেই নিস্তব্ধতা উপভোগ করলাম। এবার Jhinuk-এ ফেরার পালা-অপরপক্ষে খোলা আকাশ ছেঁড়ে খোলসে ঢোকার পালা।

প্রায় ৭৮ কিলোমিটার পার করে আমরা পৌঁছলাম Jhinuk Camp-এ।বনি গাড়ী থেকে বেরিয়েই Camp-এর ভেরতের ধাবাতে এক মহিলাকে খাবার বানানোর জন্য বলল। "বিকেল ৫ টা হয়ে গেছে, ভারি খাবার বানাতে না বোলো, অল্প ম্যাগি হলেই ভালো হয়"- টয় গাড়ী থেকে ব্যাগ নামাতে নামাতে বলল। রিসোর্টের ম্যানেজার আসতেই একটা চমকপ্রদ কথা শুনলাম... অভি আমাদের বুকিং কোন রুমে করেনি, করেছে কাম্পে। দুটো চোখ বড় বড় করে আমি আর টয় বললাম-"অসম্ভব!! কোন দরজা জানলা নেই,দেয়াল ছাঁদ নেই, চেন টানা আস্ত বড় একটা ব্যাগ। কাম্পে থাকব কিভাবে?। এই কথা শুনে হেঁসে অভি বলল-"থেকে দেখো, কাল জানিও খারাপ লাগলে।" সন্দেহ হোল অভির বিশ্বস্ত হাঁসি দেখে। জুতো বাইরে খুলে চেন খুলে কাম্পের ভেতরে ঢুকলাম, ভিতরে অনেকটা জায়গা, দুজন শুতে অসুবিধা নেই কিন্তু ব্যক্তিগত কোন জায়গা নেই। অথচ আমার খারাপ লাগাটা যেন আসতে আসতে কমতে শুরু করল। 

সন্ধ্যে ৭ টা, অভি আমাদেরকে একটা tree house-এ নিয়ে যায়। সরু সরু বাঁশ দিয়ে বানানো সিঁড়ি একরকম প্রান হাতে নিয়েই উঠলাম আমি। আহা!!! কি দৃশ্য!!! সামনে অনেকটা খোলা জঙ্গল যা Camp-এর আলোয় কিছুটা সবুজ আর কিছুটা কালো রাতের আঁধারে, তারপরে একটা বিশাল কালো পাহাড়, উপরে ধূসর আকাশের মাঝে জ্বল জ্বল করা একফালি চাঁদ। ছোটবেলায় রাতের ছবি আঁকার সময় আমি এমনি কিছু দৃশ্য তুলির রঙয়ে ভরাতাম। মায়াবী এ দৃশ্য। 

একটা জমজমাটি আড্ডা দিয়ে আমরা tree house থেকে নেমে দেশী মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত খেলাম। রাত ১১ টা, কুয়াশা আর কনকনে ঠাণ্ডা যেন হাড় হিম করে দিছে আমাদেরকে। এই ঠাণ্ডায়ে ওই কাম্পে ঘুমবো কিভাবে? মনে এমন প্রশ্ন আসতেই অভি ওর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে বলল-"ঠাণ্ডা পরেছে, ঠাণ্ডা লাগছে, প্রকৃতিতে এসেছ, প্রকৃতির ঠাণ্ডাকেও বরণ করে নাও..." ৫ সেকেন্ড ধরে বসে থেকে ওর কথাগুলো বুঝে আমি শুয়ে পড়লাম।

আবারও কুক্কুরুকুক্কু...মোবাইলের অ্যালার্মটাও বাজেনি, চোখ খুলে গেল দেশী মোরগের আওয়াজে। উঠে দেখি ৭ টা বাজতে ৫ মিনিট তখনও বাকি। আস্তে আস্তে বুঝলাম এক পরিপূর্ণ ঘুম দিয়ে উঠলাম আমি। শরীরে কেমন যেন উঠেই একটা সক্রিয়তা অনুভব করলাম। কাম্পের চেন খুলে বাইরে আসতেই দেখি সেই রাতের কালো পাহাড়টা সবুজ ঘন বন্য পাহাড়ের আঁকার নিচ্ছে। কর্মরত জীবনে একদিনও পারিনি বলে ওই পাহাড়ের কোলের দিকে টহল দিতে শুরু করে দিলাম। শান্ত সকাল, শিশির ভেজা ঘাস, আঁকা বাঁকা রাস্তা, পাহাড় একে একে সব চোখ দিয়ে দেখে মনের ভিতরে সেই অভিজ্ঞতা বন্দি করতে ইচ্ছা করছিল কারণ আজই আমাদের ঘরে ফেরার পালা। তাই বেশী দেরী না করে ঝটফট তৈরি হয়ে breakfast অর্ডার করলাম। এখানেও ছিল লুচি কিন্তু সাথে ঘুগনি, ডিম সিদ্ধ, সুজির হালুয়া খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বাড়ীর দিকে। 

আজ এক সপ্তাহ হল... ১০ বাই ১০এর বন্দী ঘরে, ল্যাপটপ নামক যন্ত্র নিয়ে বসে আছি ঠিকই কিন্তু ওই দুটো দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আজও মনে পরে, প্রযুক্তি নিয়ে অনেক এগিয়ে চলে এসেছি কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তের অনুভুতি প্রকৃতিই জোগান দেয়। 

Monday, April 10, 2023

চিড়িয়াখানা

 "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে" -শ্রী শ্রী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ১৯০৫ সনের সেই স্বদেশী গানের অনেক অনেক অভ্যন্তরীন অর্থ আমরা কালে কালে বুঝতে পেরেছি। দেশ স্বাধীন হবার পরে হয়তো আমরা গানের অভিহিত মূল্যকেই বেশী প্রাধান্য দিয়েছি। ওই গানের লাইনের "একলা শব্দকে আমরা তাই 'নিঃসঙ্গতা' মনে করে বসি, 'একাকীত্ব' নয়। বা শুধু আমিই এমনটা ভুল ভাবি...

ছুটির একটা দিন খুঁজে বেরিয়ে পরেছি আজ আমি। দিনটা ৮ই এপ্রিল,২৩। বেলা ১২.৩০এর দমদম মেট্রো করে পৌঁছে গেলাম 'ময়দান'-এ। সেখান থেকে বেরোতেই একটা ৪-৫ বছরের বাচ্চা মেয়ে আমার জিন্‌সটা ধরে টান মারল। কারন- তার কাছ থেকে গোলাপ কিনতে, একটু চোখটা চারপাশ করতেই দেখি একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা অনেক গোলাপের ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে, আর এই বাচ্চাটি হয়তো ওনারই। আশেপাশে কোন দোকান খুঁজে পেলামনা, আবার মেরুন জামা পরা বাচ্চা মেয়েটাকে ফিরিয়েও দিতে পারছিলাম না। তাই বললামঃ

- কত করে গোলাপ?

-১০ টাকা বাবু?

-"বাবু"? দাদা বলে ডাক আর আমাকে দুটো গোপাল দে...

- আচ্ছা, দাদা।

টাকার ব্যাগটা থেকে ২০ টাকা দিলাম আর বললাম- এই গোলাপ দুটো আর বিক্রি করবি না, এই গোপাল দুটো তোর নিজের। আর টাকাটা মাকে দিয়ে দিস,কেমন! 


জানিনা শুনবে কিনা। বাড়তি প্রশ্ন মাথায় আনতে চাইছিলাম না, তাই আমি আর পিছন ঘুরে তাকালাম না।  আমি রাস্তার পার ধরে হাঁটতে থাকলাম। দেখলাম, একপাশে ব্যস্ত শহর কলকাতার বড় বড় বাড়ী, ক্ষিপ্তগামী গাড়ী , আর একপাশে পরিত্যক্ত জমির মাঝখানে আমি একলা হেঁটে চলেছি।


তখন দুপুর ১.৩০, ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গেলাম 'নন্দন'এ। আগেও বহুবার এসেছি কিন্তু এবারের আসাটা একটু অন্যরকম। এবারে আমার কথা শোনার মানুষ একটাই, এবারে কথাপ্রসঙ্গে বিভিন্ন সাড়া দেবার উপায় নেই, এবারে সিগারেট ভাগ করে খাবার মতন কেউ নেই। যাইহোক, সোজা চলেগেলাম সিনেমা দেখার জন্য টিকিট কাটতে। আসেপাশের মানুষের চোখ দেখে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন ঃ

- কি দরকার ছিল একা আসার, তুই একমাত্র মানুষ যে একা সিনেমা দেখতে এসেছে।

- তোর এত ভাবার কি আছে? সিনেমা দেখবি, বাড়ী চলে যাবি। (নিজেই নিজেকে বোঝালাম)


আমি তাই করলাম। টিকিট আর জলের বোতল নিয়ে ঢুকলাম আর অপূর্ব একটা সিনেমা দেখে বেরিয়ে এলাম। বাইরে বেরিয়ে এসে খাবার দোকান খুঁজলাম। ভাবলাম ধোসা খাব। ব্যঙ্গালোর থেকে ফেরত আসার পর ধোসা আর জোটেনি কপালে। বা, এইভাবে বলতে পারি, একটা চলে যাওয়া মানুষের ইচ্ছাতেই নিজের খুশি খুঁজে পেতাম। নিজের থেকে তাকে বেশী অধিকার দিলে যা হয়। যাইহোক, দোকান খুঁজতে শুরু করলাম। হাতে অনেক সময়। প্রথম ধোসার দোকানে দাম শুনলাম ১৫০ টাকা। মাথায় খুন চেপে বসল, এত দাম!!!! আমি মেট্রো স্টেশন থেকে ক্রমশ যত দূর যেতে শুরু করলাম, ধোসার দাম ততঃ কমতে থাকল। পেটের ইঁদুরটা বেশী দৌড়াতে দিলনা। অন্য একটা দোকান থেকে একটা মশলা ধোসা, দুটো মেধু বড়া খেয়ে, একগ্লাস আঁখের রস খেয়ে স্বস্তিতে ধীরে ধীরে আবার নন্দনে ফিরে এলাম। ফুড কোর্টের পাশে শিবেদার দোকান থেকে একটা সিগারেট নিয়ে গাছতলায় বসে পরলাম। রোদটা এখনও বেশ আছে। পরশু রাতের বৃষ্টি এখনও এপ্রিলের গরমকে হার মানিয়ে রেখেছে। সিগারেটে টান দিতেই কিছু পুরানো স্মৃতি মনে এসে গেল। ২ মিনিট মাথা নিচু করে বসেই ছিলাম কি আমার বাঁ পাশে একজন বয়স্ক মহিলা এসে বসলেন। সিগারেটটা হাত থেকে পরে গেল। দেখলাম...


ওনারা স্বামী-স্ত্রী দুজন এসেছে নন্দনে। সাদা জামা কালো প্যান্ট মাথায় ধূসর ফ্ল্যাট ক্যাপ বাঁ কাঁধে স্ত্রীর ব্যাগ আর হাতে একটা স্মার্ট ফোন নিয়ে ৭০এর কাটায়ে পরা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাক্তিটি ওনার স্ত্রীকে বলছেন কিভাবে বসলে স্মার্ট ফোনে ছবি ভালো আসবে। আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। দেখলাম আসমানি শাড়িতে বসা ওই বয়স্ক মহিলাও স্বামীর কথা মতন বিভিন্নভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে। "নড়বে না একদম" দুহাতে আগলে ধরে থাকা স্মার্ট ফোন নিয়ে স্বামী একটু জোর গলায় বলল। একটু দূরে দাঁড়ানো এই মানুষ দুটোকে একটা ফ্রেমের দুটো দিক ধরলে তার মাঝখান দিয়ে আমি পাশের গাছতলায় বসে থাকা একটা মধ্য বয়সী মেয়েকে দেখতে পেলাম। লাল-কালো শাড়ী পরা মেয়েটি চোখটা যেন কিছু বলছে। ডান হাতের কাগজ গুলো একটার পর একটা পরছে,তারপর ছিঁড়ে ফেলে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখছে। আমার পাশের স্বামী-স্ত্রীর জায়গা এবার বদলের পালা। স্ত্রী দাঁড়িয়ে বলছে স্বামীকে রীতিমতন নির্দেশ দিচ্ছে কিভাবে বসতে হবে। আমি নিজের খামখেয়ালীতে একটু হেসেই দেখলাম ওই লাল-কালো শাড়ী পরা মেয়েটি একটা সিগারেট ধরাল। ওর ছলছলে চোখে সিগারেটের ধোঁয়ার মাঝখান দিয়ে দেখতে পেলাম এক মানুষকে; সে হাফ প্যান্ট পড়া, গায়ে কালো টিশার্টের উপর দিয়ে জামা জরানো, বুকের উপর দিয়ে একটা উঁচু করা ব্যাগ যেন তার বুকটা ঢাকা থাকে, ডান হাতে অনেক ব্রেসলেট, বাঁ হাতে ফোনে নিজের ছবি তুলছে...


১...২...৩... চলচিত্রের পরিচালকের মতন তিন সেকেন্ডের পর "কাট" হল। নিজেদের তোলা ছবি দেখতে দেখতে ওই বয়স্ক স্বামী-স্ত্রী আমার সামনে থেকে হেঁটে চলে গেলেন। লাল-কালো শাড়ী পরা মেয়েটি তার এক বান্ধবীকে খুঁজে পেয়ে কি যেন কথা বলতে শুরু করে দিল। আর... হাফ প্যান্ট পড়া রূপান্তরিত নারীকে  খুঁজে পেলামনা। ঘাড় ঘুরিয়ে ডান পাশে আসা চা-দাদার থেকে এক কাপ লেবু চা নিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে কতরকম মানুষের দেখা পেয়ে গেলাম। সবাই নিজে নিজের জীবনে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে নিয়েছে। জীবনের এই রঙ্গমঞ্চে আমরা হলাম এক একটি আজব প্রাণী। চিড়িয়াখানার সাথে যে মিলটি নেই সেটি হল আমরা একে ওপরের সাথে থাকি কম, একা একাই নিজের মতন চলতে থাকি, আমরা দেখতে সবাই এক রকম কিন্তু প্রতিটা প্রাণীর গল্প আলাদা, প্রতিটা মানুষের চাওয়া-পাওয়া আলাদা, প্রত্যেকের চিন্তাভাবনা আলাদা, সুখের মাপকাঠি আলাদা, দুঃখ আলাদা।


উঠে পড়লাম গাছতলা থেকে। ভাবলাম বাড়ী চলে যাই। হাঁটতে থাকলাম গেটের দিকে। আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম ... সামনের মাঠের মধ্যে ৩টে ছেলে আমার এক পছন্দের গান গাইছিল, বসে পড়লাম ওদের পাশে। মনটা ভরে গেল। আরও কিছুক্ষণ আমি, আমার পছন্দের গান একসাথে সময়ে কাটালাম। তারপর বাড়ীর দিকে পা বাড়ালাম। ফিরতে ফিরতে একটাই কথা মাথায় এলো- 'নিঃসঙ্গতা'কে কাটিয়ে উঠে 'একাকীত্ব'র প্রেমে পড়েছি আমি।

Monday, October 18, 2021

আবার ফিরে এসো

দিনটা ছিল বিজয়া। মায়ের চলে যাবার দিন। সারাদিন বাড়িতে অনেক কাজ থাকে আমাদের এই দিনে । সকালে মায়ের সাথে লুচি করা, বাবাকে বাজার করতে বলা,  বাজার করা হলে সেটা নিয়ে গোছানো, পূজার সামনে পুঁটি মাছ রাখা (আমরা বাঙাল তাই এদিনে মায়ের ঘটে পূজা হয়ে,  বাড়িতে জোড়া ইলিশ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়ে); এইসব করতে করতে বেলা ১২টা বেজে যায়। এবার চলে আসি মাকে রান্নার সাহায্য করতে। সবটা সেরে,  খেয়ে উঠতে উঠতে আজ দুপুর গড়িয়ে ২ টো বেজে যায়। খেয়ে উঠে মায়ের পাশে একটু শুয়ে পড়ি।  

ঢাক ঢোল এর আওয়াজটা আসতে আসতে কানে বাজতে লাগল। ঘুমটাও একটু পরে ভেঙে গেল। দেরী না করে উঠে পড়লাম। মাকে বললাম- " চলো, মাকে বরণ করে আসি"। এই বলে মায়ের জন্য আর আমার জন্য লালপেড়ে শাড়ী বার করলাম। তারপর মা-মেয়ে মিলে দুর্গা মাকে বরণ করতে বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যে ৭টা বাড়ি ফিরলাম। একটু জিরিয়ে নিয়ে বাবাকে-মাকে বিজয়ার প্রনাম করে একটু মিষ্টি মুখ করলাম সবাই মিলে। 

খুব সুন্দর সাজানো সংসার আমার। সবটা যেন খাপে খাপে বসানো। দেখে মনে হয়ে যেন হাঁসির সমাপ্তিতে বাঁধা কাঁচা হাতে লেখা কোন এক লেখকের গল্পের মতন...

রাত সাড়ে ৯টা... অলি এসে ডেকে নিয়ে গেল আমাকে, ভাসানে নাচতে। আমি পছন্দ করিনা এসব নাচা-নাচি, মানুষের দলে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারিনা। তাও, বন্ধু; ওরা কোনদিনও 'না' শুনবেনা। বরণ করে আসা ওই জামা কাপর পরেই বেরিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি, মাকে লড়ীতে তুলে নিয়েছে। কান ঝালাপালা করে দাওয়া হিন্দি গান আর মদ- সিগারেটের গন্ধে মত্ত পাড়ার ছেলে-মেয়েরা। 

অলি কানের সামনে এসে বলল- "মন্দিরের পিছনে চল, তোকে একটা জিনিষ দেখানোর আছে"। টানতে টানতে নিয়ে গেল আমকে সেখানে। গিয়ে দেখি রিমা, পায়েল, অরিজিৎ সবাই আছে গোল করে বসে আর সেখানে ২-৩টে মদের বোতল। অনেক ঝগড়া, না-মানার পরে আমাকেও ওদের দলে নিয়ে নিল। 

রাত ১১টা বাজে... ভীষণভাবে মত্ত আমি। মন্দিরের চাতালে আমি বসেছিলাম। ভীষণ গরম লাগছিল, তাই আঁচলটা দিয়ে নিজের মুখ আর কপালটা মুছলাম। হাতে আঁচলটা নিতেই নিজের সব হুঁশ হারিয়ে ফেললাম। ৫টা বছর একটা নিঃস্বতা নিয়ে চলার পরে আমি যেন চিৎকার করার সুযোগ পেলাম। বুকের ভীতরে পাথর চাপা দাওয়া হুংকারটা বেরিয়ে  আসল। অঝরে চোখের জল যেন বানভাসির মতন বেরিয়ে এলো। ঘামের কপালে সিঁদুরের দাগটা আমার আঁচল আজ মোছেনি। ৫ বছর আগে এই মদ আমার সিঁদুর মুছিয়ে দিয়েছিল। হাঁ, আজকের দিনেই আমি বিধবা হয়েছিলাম। তাই চোখের জলটা না আটকাতে পেরে বেরিয়ে এলো। ভুলে যেতে চাইলেও ভুলতে না পারা অভাগিনী আমি চোখের জল মুছে ফেললাম, যাতে কেউ দেখতে না পারে। উঠে দাড়িয়ে আমিও উন্মত্ত হয়ে হিন্দি গানে নাচতে থাকলাম। পেটে নেশার বুঁদ, বুকে বেঁধে রাখা শক্ত পাথর, হিন্দি গানের তালে নাচা পা, সিঁদুরের মতন লাল করে রাখা চোখ নিয়ে মাকে বললাম- "আবার ফিরে এসো... মা"






Saturday, June 26, 2021

ছোঁয়া বারণ

বর্ষার পরের বিকালটা খুব মিষ্টি আমার কাছে। জুন মাসের বাতাসটাই খুব মলায়ম। গরমের ছেঁকার পরে প্রিয়জনের মুখের থেকে আসা ঠাণ্ডা ফুঁ-এর মতন। তাই বিকালবেলাটা একটা সিগারেটের সাথেই আমি রাস্তায়ে নিজের সাথে সময় কাটাই। রোজ অবশ্য হয়ে ওঠেনা। আমি ড্রাইভার তো, তাও বাইকে।


ছিলাম না ভালো পড়াশুনাতে। কোনমতে গ্রাজুয়েট করি, অশিক্ষিতের তকমা যাতে প্রতিবেশীরা গায়ে না দিতে পারে। খুব শিগগির বুঝে যাই, বাবু হয়ে মাসিক মায়না পাবার কোন কাজ আমি পারবোনা। বাইক চালাতে পারতাম তাই অ্যাপ এর মাধ্যমে মানুষের সহযাত্রী হয়ে তাদের গন্তব্যে পৌঁছেদি। মাসিক সামান্য বেতন আর যাত্রীদের দাওয়া ভাড়ায় দিন বেশ ভালই কেটে যায়।


সন্ধ্যে ৬.২০ বাজবে হয়তো। শিবু-দার দোকানে রোজের মতন চা আর সিগারেট নিয়ে বসেই ছিলাম। গঙ্গার ধারের হাওয়া আর শিবু-দার দোকানের ভাঁড়ের চা- নিজের জন্য কাটানো এই অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতি যেন রোজ আমি মনের কোনে বাক্সবন্দি করে রাখতে চাই। যেদিন জীবন কোন কঠিন সময়ে ফেলে দ্যায়, আমি সেই বাক্স থেকে ওই অনুভূতিগুলোকে চুমুক দিয়ে রষাস্বাধন করি। 


হটাতই ফোনে নোটিফিকেশান এলো। বলছে- "কাজে লেগে পর"। একজন যাত্রীকে তুলতে যেতে হবে। দেরী না করে, হেলমেট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ১.৭ কি.মি দূরে যেতে হবে ৬ মিনিটে। সঠিক সময়ে পৌঁছে গেলাম। ফোন করে নিশ্চিত করে বললাম যে আমি এসেগেছি।


যাত্রীর হেলমেটটা বার করছিলাম। হটাত একটা চেনা গলা শুনতে পেলাম। বলল... " দাদা, পানপারা যাব। চলো"


খালি ঘরে ঝড়ো হাওয়া যেভাবে দরজাকে সপাটে বন্ধ করে, ঠিক তেমনই বুকের ভীতরে একটা আওয়াজ করল। ঘাড় ঘুরিএ দেখার আগেই আবার বুকের ভীতরে সেই আওয়াজটা করে উঠল। একটা চেনা হাত বাঁ কাঁধে এলো। সেই আঙ্গুল গুলো যত শক্ত করে আমার কাঁধের জামাটা ধরছে, আমার বুকের ভিতরের আওয়াজটাও আরও জোরে জোরে হচ্ছে। ঝড়ো হাওয়াটা আমার সব মনটাকে উথাল পাতাল করে দিচ্ছিলো। বুঝতে পারলাম শাড়ী পরা এক যাত্রী আমার বাইকের পিছনে বসেছে, বসেই কাঁধের হাতটা সরিয়ে নিলো। আমি কিছু বুঝলাম না। বাইক স্টার্ট করে দিলাম। পানপারা -আমি চিনি। তাই মাথায় চেনা রাস্তাটা মনে পরেগেল। মনে একটা কৌতূহল দানা বেঁধে ছিল... "কে ইনি"। ছটফট করা মনটা বলল লুকিং গ্লাসে তাকাতে। চোখটা সেদিকে যেতেই আবার সেই আওয়াজটা সপাটে বেজে উঠল। হেলমেটের ভিতরে থাকলেও ওই চোখ দুটো আমি খুব ভালো চিনি। হাঁ... ও নেহা ছিল। 


মিনিট ২০ আমি নেহার সাথে বাইকে ছিলাম। সেই ২০ মিনিট আমার জীবনের ৭ বছরের সব পুরানো স্মৃতি এক নিমেষে চোখের সামনে দিয়ে চলে গেছিল। ৭ বছরের পুরানো ভালোবাসা আজ আমছলছে।পাশে বসে, আমারই সাথে চলছে কিন্তু মাঝখানে অনেক বারণ। সাইকেলে চরা প্রেমটা আজ এভাবে ফিরে আসবে বুঝিনি। বুকের ভিতরটা থম ধরে আছে। মিনিট ২০ পর পানপারায় আমি নেহাকে নামিয়ে দিলাম। ও ভাড়া দিয়ে চলে গেল। আমি নির্লজ্জের মতন ওর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম ঠিক যেমনটা ওঁকে আগে বাড়ি দিয়ে আসার সময়ে দেখতাম। ... দেখলাম ও পানপারা পার্ক থেকে একটা ফুলের মতন মিষ্টি মেয়ের দিকে ছুটে গেল। দুপাশে ঝুটি করা ওই পুছকি মেয়টা "মা" বলে ডেকে নেহাকে জরিয়ে ধরল। ওরা চলে গেল... 


হেলমেটটা খুললাম। হাতের টাকাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বুকের ভিতরটা আর বন্ধ থাকল না। ৭ বছরের পাথরটা আজ আর ভার রাখতে পারল না। অঝোরে কেঁদে ফেললাম। 


মনের ভীতরে হাওয়া ঝোড়ো;

আজ তুমি অন্য কাঁরও...

Saturday, May 15, 2021

ছাব্বিশে ছোবল

৫ম অগাস্ট আমার জন্মদিন। বাবা ঠিক করেছিল ওইদিনে আমার বিয়ে দেবে। ঠাকুরমশাইয়ের পাঁজিটাও দিনটিকে ভালো বলল। সময়টা ছিল বিশ্ব মহামারি করোনার অন্ধকারে। তাই পুলিশকে বলে ১৫০ জন মানুষের অনুষ্ঠানের আয়জন করতে পারবে বলে অনুমতি নিয়ে এসেছিল। আমি সবারই মতন জীবনে এই শুভ দিনটার অপেক্ষা আর নতুন জীবনের আশায়ে ছিলাম। বাড়ীর আমি একমাত্র সন্তান আর আমার বিয়েটা ছিল বাড়ীর সব থেকে বড় একটা কাজ। নবরাত্রির পরে আমরা বাড়িতে যেমন তৃপ্তি করে আমিষ খাই, আমার বিয়েটা ছিল বাবামায়ের কাছে সেরকম পরিতুষ্ট কাজ ছিল।


হাঁ! আমিও খুব খুশি ছিলাম। ও... আমার কথা জানবেন না?  বললাম বলে ইচ্ছা করল জানতে? বলব তো বটেই। আচ্ছা, একবার ভেবে বলুন তো আপনার জীবনে এমনটা ঘটেছে কিনা.... যে- জীবন থেকে আপনি কখনো কিছু চাইলেন, আর, জীবন আপনাকে ঠিক তার উল্টোটা দিয়েছে। ঘটেছে? আমার কথাই বরং বলি। 


...আমি কলকাতা শহরের এক সাধারণ বাড়ীর একমাত্র মেয়ে। বাবার গয়নার ব্যাবসা। মা হউসওয়িফ। সংস্কৃতি-তে মাস্টার্স করা, দুবেলা ছাত্র পরিয়ে নেল-পালিশ কেনার খরচা চালানো এবং মালদিভে বিয়ের প্রথম সপ্তাহ কাটানোর স্বপ্ন দেখা পাখি আমি। বাবা সরকারি ছেলে দেখে আমাকে পর করে দিল আমার জন্মদিনের দিন। ১২ ভরি গয়না, খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, কাঁসার থালা, বাটি, গ্লাস আর বিয়ের উপহার নিয়ে আমি শ্বশুর বাড়ি পা রাখলাম।


আমার বয়স এখন ছাব্বিশ। এই বছরের জন্মদিনটা বাকি ২৫ বছরের মতন কাটেনি। কোন কেক ছিল না, বেলুন দিয়ে সাজানো ঘর ছিল না, মায়ের পায়েসর বাটি ছিল না, কিন্তু এক চিলতে সিঁদুর ছিল এই বছর আমার কপালে। ওই যে বললাম- যা চাই জীবনে - সেটা হুবাহু দায় না জীবন। বিয়ের প্রথম সপ্তাহে আমার মালদিভে যাওয়া হয়েনি। বরং আমি রোজ করকরে লাল তাঁতের শারি পরে শাশুড়ি মায়ের সাথে হাতে হাতে সাহায্য করতাম। কোন আলাদা অনুভূতি ছিল না আমার জীবনে বাপের বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ীর মধ্যে। কারন ওই সিঁদুর দানের পরে আমি বরের পাশে আর থাকতে পারিনি। জানিনা কেন? ... 


দেখাশোনা করে বিয়ে হয়ে আমার। ছেলে গ্রুপ-বি অফিসার। রাজারহাটে ত্রিপ্পল বেডরুম ফ্লাট। বাবা দেখে একটু সমৃদ্ধ পরিবারে বিয়ে দায়ে। সপ্তম দিনে শাশুড়ি মা আমাকে বলে- দেখো বউমা, বিয়েতে আমরা কিছু চাইনি, নতুন ফ্লাট দেখতেই পাচ্ছ। কিছু ইন্তেরিয়ার ডিজাইনার জন্য লাখ খানেক টাকা লাগবে, তোমার বাবাকে বলবে?


-"উমম...এত গুলো টাকা..."

-"আঁতকে উঠলে! আমরা তো বিয়েতে কিছু চাইনি। একটা মোটর-সাইকেল পর্যন্ত দিলে না"

-(আকাশ থেকে পরলাম আমি, সবটা ভালো করে জানতে চাই এবারে)..."বুঝলাম না। কি বলতে চাইছ?"

-"নেকামো করো না তো। বাবাকে বলে একটা মোটর-সাইকেল আর দেড় লক্ষ টাকার ব্যাবস্থা করো"


জীবন্ত গিরগিটি এই প্রথম দেখলাম প্রথমবার, তাও আবার মানুষরূপী । ধীরে ধীরে জানলাম সবটাই ও বাড়ীর ছক। যত দিন যেতে থাকল, ওদের হুমকার আর আমার উপর অত্যাচার দুতই বাড়তে লাগল। খেতে কম দাওয়া, পাথরের মেঝেতে জল ফেলে রাখা, বাড়িতে ফোন করলে সামনে দাড়িয়ে থাকা, এমনকি বাড়ীর ছেলে আমার সাথে এক ঘরে শোয়াটাও বন্ধ করে দিল। 


পন... শুধু আইনের খাতায় নিষিদ্ধ। বাস্তবে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সব মেয়ের বাবা টেবিলের তলা দিয়ে কিছু না কিছু দিয়েই থাকে ছেলে বাড়িতে। বাঙালি রীতিতে মেয়েকে বাপের বাড়ি কিছু নিয়ে যেতে হয়ে জানি যেটা উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া, কিন্তু চেয়ে নাওয়াটা কি খুবই জরুরী। তাও ঠিক আছে, সেটাও মেনে নিলাম। কিন্তু, বিয়ের পর চাওয়া টাকা পয়সা? সেটা পন নয়? সেটা আইনের বাইরে? নাকি সেটা শুধুই আত্মীয়ের নামে জুলুম করে চেয়ে নাওয়া লোভের অংশ?...


আমি বুঝলাম এই লোভ আর অত্যাচার থামার নয়। কিন্তু কি করব আমি? বাড়ি ফিরে গেলে এরা দমবে না। অভিযোগ জানালে বাবার অসুস্থতা বাড়বে। কিন্তু আমি তো চেষ্টা করলাম। বাপের বাড়ি যাই, অষ্টমঙ্গলাতে, কিন্তু সেখানেও মাকে বলতে পারিনি। ফিরে আসার পর ওই নির্যাতন আরও বাড়তে থাকে। একদিন তো আমাকে খেতে অবধি দাওয়া হয়না। রান্নাঘরের থেকে আটা গুলে সেটা দিয়েই আমি খিদের জ্বালা মেটাই।


নাহ!!!! অত্যাচার মেনে নিতে মা-বাবা শেখাইনি। ঠিক করলামা আমি এই বন্ধি নির্যাতিত  হয়ে সংসার ধর্ম পালন করতে পারবনা। 


২২শে অগাস্ট। স্যেনেটারি প্যাড কেনার নাম করে ওই বন্ধি ঘর থেকে বেরিয়ে পরলাম। মানুষ যে উড়তে জানে সেটা সেদিন বুঝলাম আমি। ২ ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি ফিরি। অনেক ঝর ঝাপটা যায়, আমি ওদের নামে থানায় নাম লিখাই, শাস্তি হয়ে ওদের। বিচ্ছেদের পর আমি বাড়িতেই চলে আসি। 


দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। আজ সেই ৫ম অগাস্ট। দুপুরে পায়েস, খাওয়া দাওয়া, বেলুন দিয়ে ঘর সাজানো, কেক কাটা হল। দিনটা বেশ মজাতেই কেটে গেল। জানলা খুলে এক ফালি চাঁদটার দিকে তাকিয়ে আছি। কালো মেঘ আসছে, ঢাকছে, আবারও সেটা কেটে যাছে। আমার ওই দিন গুলো এই কালো মেঘের মতন ছিল যেটা আমি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। কিন্তু... ওই বিষাক্ত সাপের ছোবলটা কপালে রয়ে গেল। সিঁদুরের লাল রঙটা হয়েতো নেই, কিন্তু ছোবলের দাগটা আজও আছে ডিভোর্সির নামে। 

Wednesday, March 10, 2021

শেষ যাত্রা

 বয়সটা বেশী নয় আমার, তাই পাড়ার কোন কাজে আমাকে ডাকা হয়না। বরং বাবা সব অনুষ্ঠানে আমাদের পরিবারের প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থিত হয়। আজও পোস্ট অফিসের ঠিকানায় বাবার সন্তান হিসাবে নিজেকে পরিচয় না দিলে চিঠি বাড়ি আসতে একটু আসুবিধা হয়। বিয়েবাড়ি, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন এমনকি শ্রাদ্ধ বাড়িতেও আমি যাই আমান্ত্রন পত্র পাবার পরেই। তাই আমার অভ্যাসটা তাই আছে- যদি কেউ না নিমন্ত্রন করে, আমি কারো কাজে নিজে থেকে এগিয়ে যাই না। দম্ভ কিন্তু একদমই নয়, শুধু একটু সঠিক পরিচালনার অভাব।

বসন্তের এক বিকেল, কিন্তু দিনটা ছিল সোমবার। হাঁ হাঁ !!!!! তাই গরম চা আর শরৎচন্দ্র নিয়ে বসে থাকার দিন ছিল না। আমি এক অফিসের ভার্চুয়াল মীটিং-এ ছিলাম। একটা ফোন এলো আমার ছোটবেলার বন্ধুর, দিপকের। মিটিং -কে মিউট করে দিপকের ফোন ধরলাম। 

-হাঁ, বল...

-ব্যাস্ত আছিস?

-ওই, অফিসের কলে আছি। তুই বল...

-কাল ছুটি নিস অফিস থেকে।বিকালে দরকার আছে। রিয়ার বাবা মারা গেছে। আমি তোকে এখন কিছু বলতে পারবোনা। আমি শ্বশুর বাড়ি থেকে সবাইকে নিয়ে হাসপাতাল যাচ্ছি। অন-ডিউটি হার্টঅ্যাটাক মারা গেছে, তাই ময়না তদন্ত করে কাল বিকালে শ্মশানে যাব। 

-( নিস্তব্ধতা...আমি কিছু বুঝতে পারছিনা কি বলব। দুবার শুঁকনো গলায় ঢোক গিলে বললাম...) আমি কিছু করব এখন? সায়ানও বাড়ি এসেগেছে, একসাথে বেরিয়ে যাব।

-না! তোরা বাড়ি থাক আজ। সায়নকে জানিএ দিস। আমি রাখলাম।

-খেয়াল নিস। 

-হুম

---কিছু না বুঝে আমি সায়ানকে ফোন করে সব বললাম। ও বলল- ঠিক আছে, কাল সকালে দেখা কর। 


একটু পরিচয় দিয়ে দি... আমি, সায়ান আর দিপক- ছোট্টবেলার বন্ধু। শুধু দিপক-ই আমাদের মধ্যে বিবাহিত আর রিয়া ওর বউয়ের নাম। 


...... পরদিন সকাল। 

আমি আর সায়ান পাড়ার দোকানে দাড়িয়ে। গোল্ড-ফ্লেকে টান দিতে দিতে বললাম...

-আমি কি করব বিকালে?

-কি আবার করবি! দিপকের সাথ দিবি। শ্মশানে যেতে হবে তো।

-(একটু আশ্চর্য হয়ে) মানে?? শ্মশানে যেতে বলেছে তোকে? আমাকে তো বললনা কিছু যেতে হবে কিনা।

-আরে গাধা!! শ্মশানে কাওকে নিমন্ত্রন করে না। সবাই এমনই যায়। তুই তো জানবি না, গেছিস কোনোদিন?

- কই না তো। বাবাই যায় সব জায়গায়। আমি জানিনা।

-শোন... শেষযাত্রাতে যাওয়া ভালো। পুণ্যি হয়। 

-আমার এই প্রথমবার। জানিনা কি হয় ,কি করতে হয়।

-তুই চিন্তা করিস না। দুজনে থাকব। বিকালে দেখা করছি। 


.........বিকালবেলা

সবাই এক জায়গায় হলাম। রিয়ার বাড়িতে হাহাকার। কান্নাকাটি, চিৎকার। আমি আর সায়ান অনেক দূরে দাড়িয়ে আছি। ময়না তদন্ত সেরে রিয়ার বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসা হল। ধরে রাখা যায়ে না কাওকে। আসলে বয়সতো মানুষটার বেশী নয়, ৫০-৫৫ হবে। 

সায়ান আমাকে টেনে আরও দূরে নিয়ে এলো। ও কান্নাকাটি দেখতে পারেনা। আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা। না পারছি, কষ্ট দেখতে, না পারছি কাওকে সামলে ধরতে। আমরাও দর্শকের মতন দারিয়ে থাকলাম ঠিক যেমনকরে সব প্রতিবেশীরা দাড়িয়ে ছিল। 

কিছুক্ষণ পরে, সবাই রওনা দিল মানুষটার অন্তিম কর্ম সাধন করতে। আমরাও যাচ্ছি পিছন পিছনে।


অদ্ভুত এক অনুভূতি। শুনশান জায়গা কিন্তু মানুষ ভরতি। একটু এগোতেই দেখলাম ছোট কাঠের বিছানায় সারি করে রেখেছে। সারি করা সেই চাতালের পাশে ছাউনি দাওয়া বসার জায়গা। আর তার পাশ দিয়ে বাঁধান গলি যেটা গঙ্গার সিঁড়িতে গিয়ে মিশেছে। আমি একটু অবাক হয়ে দাড়িয়ে থাকলাম। একটু লক্ষ্য করার পর বুঝলাম সবাই মৃতের আত্মীয় নয়। বিভিন্ন রকমের মানুষ সেখানে।  


...একটা গাড়ি এসে শরীর নামিয়ে বলল- "দাদা আমাদের টাকাটা দিন আর আমরা বেরুছি, শ্রীপল্লীতে আরও একজনকে আনতে যেতে হবে"।

...একজন মানুষ একটা অফিস ঘরে বসে অনেকক্ষণ কিসব অফিসিয়াল কাজ করে যাছে। জানতে পারলাম উনি সরকারি কর্মচারী। মৃতদের সরকারি খাতায় নাম লেখে।

...কোমরে লাল রঙের গামছা বাঁধা কিছু মানুষ দাড়িয়ে একজোট হয়ে কথা বলছে। কি না! তারা টাকা যোগার করে মদ্ খাবে।

...একটা মোটা করে মানুষ কাগজে লিখে দিপকের হাতে দিল আর বলল-"বাবা! এই নাও, পাড়ার শ্মশান যাত্রীর নাম। এই নামগুলো হাড়িও না"

...এসব দেখতে না দেখতেই চুল্লীর দরজা খুলে একজন লোক বেরিয়ে এলো। বড় আল্মুনিউমের একটা ট্রেতে জলন্ত অন্তিম দেহাবশেষ নিয়ে। আবার বলছে- "দেরী করবেন না, নিয়ে আসুন পরের জনকে"

...আমার পাশে একটা বয়স্ক কাকুও আমার মতন সব দেখছিল। হতাত আমাকে বলল- "আরও ৪০-৪৫ মিনিট লাগবে। তোমাদের তো ৩ নম্বরে, তাইনা? এখানও ভেবে নাও রাত ১২.৩০ হবে। তাও ভালো ইলেক্ট্রিক, কাঠে হলে ৭-৮ ঘণ্টা লাগত।"

...কিছু উত্তর না দিয়ে আমি সামনে তাকালাম। দেখলাম একজন পুরহিত একজনের মৃতের ওই সারিতেই মুখগ্নি করিয়ে দিছে। সে কান্না দেখা যায়ে না। কাজ শেষ করতেই সেই পুরহিত পাশের শরীরের দিকে এগিয়ে গেল। 


প্রায় ৫ ঘণ্টা ছিলাম, সব সেরে বাড়ি ফিরে নিজে যখন শুলাম, ভাবছি............ জীবনের শেষ চরম সত্য হল মৃত্যু।  এত বড় শরীরটা একমুঠো ছাই হয়ে যায়। সেই অন্তিম জাত্রাতেও মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য যায়ে, সেখানেও মদ পানের উল্লাস।  এ. টি.এম -এর  লাইনের মতন দাড়িয়ে থকাতে হয়। বড় কঠিন বাস্তব দেখে এলাম আজ। রক্ত মাংসের শরীর নিয়ে তো বেঁচে আছি, মরার পর স্মৃতি হয়ে কি বাঁচতে পারবো? তেমন কিছুই তো করলাম না। 

একটা ছেলের কথ মনে পরল। সে তার বাবার পাশেই বসে ছিল। কাঁদছিল না। কতবার ডাকল, তাও উঠল না ও বাবাকে ছেঁড়ে। শুধু চোখ বোজা মানুষটার দিকে তাকিয়ে ছিল আর ওনার কপালে হাত বুলিএ দিচ্ছিল। 

...... আমার মতে, যে মানুষটা শরীর ছেঁড়ে দেয়, তিনি মরে যায়ে না........... যাদের ছেঁড়ে মানুষটা চলে যায়ে, তারা মরে যায়। 

Wednesday, February 19, 2020

অপেক্ষা

বহুদিন পর আজ আবার লিখতে 🖋 বসা। পরিস্থিতি আমাকে এমন করে দেবে বুঝতেই পারিনি। ট্যাক্সের ফাইল খুঁজে পেলাম, অফিসের নোটবুক পেলাম, পুরানো প্রোজেক্ট ফাইলও হাতের কাছেই ছিল অথচ আমার নিজের লেখার সবুজ খাতাটাই 📗খুঁজে পেলাম না-যে খাতাটা একটা সময়ে আমার সব থেকে কাছের ছিল💖। তাই আজ পরিস্থিতিকে দূরে সরিয়ে রেখে নতুন একটা খাতা 📘খুলে বসলাম। অপেক্ষা করতে পারলাম না খাতাটা খুঁজে পাবার।

লেখার আগে একটাই কথা মনে পরল যে আমি অস্থায়ী কাগজ গুলোর মাঝে স্থিথিশিল নিজের জিনিষ গুলোকে সরিয়ে ফেলেছি। ভাবতেই মোবাইলে 📲একটা নোটিফিকেশান এলো- তি-সিরিস একটা গান 📀রিলিস করেছে ১ ঘণ্টা আগে। বুড়ো আঙ্গুল👍 নিয়ে গিয়ে সেই ট্যাবটা প্রেস করার আগে হটাতই মনে পরল- একটা সময়ে ছিল নতুন গান রেডিওতে 📻আসা অবধি অপেক্ষা করতাম, এমনই সেই নতুন গানটা আবার সোনার জন্য কত অপেক্ষা করতাম; কোন বাড়ীর রেডিওতে সেই গানটা শুনতে পেলে নিজের বাড়িতে চালানো🔊, একটু জোরেই চালানো যাতে সেও  শুনতে পায়। এইগুলতে কত খুশি খুঁজে পেতাম।😍 আজ প্রজুক্তি নিজেই এসে আমার কাছে ধরা দিয়েছে, ফলে অপেক্ষা করাটাই ভুলে গেছি, কান পেতে নতুন গানটা শোনার মর্মটাও হারিয়ে ফেলেছি😔।

আজ আমরা সবাই ভুলেগেছি অপেক্ষা করতে। কষ্ট করে পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিতে ভুলে গেছি-কারন- এখন সাজেশন এসে গেছে, প্রশ্ন সেই সাজেশন থেকেই আসবে খামকা পুরো বই কেন পরব। পরিক্ষার ফলাফল তো শিক্ষক মশাই জানিএ দায়ে বা ইন্টারনেটে 💻বেরিয়ে যাবে তাই অপেক্ষা কিসের।

ভুলে গেছি কাছের মানুষের একটু গলার আওয়াজ শোনার অপেক্ষা করা😒- সারাদিনি তো এতো কথা হয়ে😇, কিছু বাকি থাকে না সামনে দেখা হলে কথা বলার। এমনকি বহু দূরের মানুষটিকেও বলার দরকার পরেনা যে- কবে বাড়ি ফিরবে, তোকে কতদিন দেখিনা👥। সেই অপেক্ষা করাটাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শেষ হয়েছে অপেক্ষা করার ধৈর্য, শেষ হয়েছে কাওকে আঁকরে ধরে রাখার ধৈর্য💤। আলগা হচ্ছে সম্পর্ক। হয়েতো তাই মামনি-বাবার 💘সম্পর্কের গভিরতা আজও বুঝলাম না। আলগা সুতোয়🤏 ধরে রাখা সম্পর্কে থেকে তা বোঝাও যাবেনা কোনদিন।

একটা মুছকি হাসি পেল। "অপেক্ষা" হয়েত ভীষণ দরকার প্রতিটি সম্পর্কে, তা সে সজীব- সজীব সম্পর্কে বা সজীব- নির্জীব সম্পর্কে। ভুলে গেছিলাম সুবুজ খাতাটার কথা অআর এই পরিপ্রেক্ষিতেই হয়েত সবুজ খাতাটা আমার হারিয়ে গেছে আমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে। শুধু সবুজ খাতার কথা নয়, আমি এটাও ভুলে গেছিলাম যে আমার লেখা পরার জন্য কেও অপেক্ষা করে, আজ সেও হারিয়ে গেছে। আজ সব কিছুই আছে, কিন্তু কিছু শূন্যটাও আছে।  💔


Saturday, May 11, 2019

আমি পুরুষ

হ্যাঁ... আমি পুরুষ। ছেলে, ছোকরা, পোলা-- এসব আমার ডাক নাম। গালাগাল দিয়েও আমাকে ডাকা হয়ে অনেকভাবে। কিন্তু জানেন, আমি প্রতিবাদ করিনা; আমি মাথা গরম করি কিন্তু ক্ষমাপ্রার্থী থাকি; আমি ভালবাসি কিন্তু প্রকাশ করতে পারিনা; আমি মূল্য দিতে জানি কিন্তু মূল্য পাইনা; আমি কষ্টে টুকরো হতে পারি কিন্তু চোখের জল ফেলতে পারিনা।

অদ্ভুত বৈষম্য করে বানিয়েছে ভগবান আমাকে। প্রতি ৪৮ ঘণ্টায় আমি ৩০ কোটি পরিপূর্ণ শুক্রাণু তৈরি করি বলে আমার মূল্যটা অনেক কম। আমাকে জন্ম নিতে দৌড়ে যেতে হয়ে ডিম্বাণুর দিকে নাহলে সে ৬৭২ ঘণ্টা পর আবার পূর্ণতা পাবে। তারপর আমি আসি পৃথিবীতে অসংখ্য প্রত্যাশার দায়িত্ব নিতে। আমার ছোটবেলাটা খুব ভালই কাটে। কিন্তু জানেন ছোট থেকে দেখি বড়রা গায়ে হাত আমার উপরেই তোলে, নির্দ্বিধায়। আমাকে শেখানো হয়ে এমন এক শিক্ষা যেখানে আমি যেন দায়িত্ব সহকারে পরিবারের উন্নতি করতে পারি। শিক্ষার উপর দাড়িয়ে আমাকে যাচাই করা হয়ে- হয়ে "ভালো ছেলে" নতুবা "বখাটে"।

যৌনতা আসলে আমকে "কিশোর" থেকে "যুবক" হবার সম্মতি দাওয়া হয়ে। শেখানো হয়ে "দায়িত্ব" নামক বোঝা টানার কৌশল। ধিরে ধিরে আমকে একটা টাকা রোজগারের মেশিন তৈরির প্রস্তুতি চলে। সমাজ প্রথমে সেই প্রস্তুতির নাম দায় "শিক্ষা", আমার পছন্দ অপছন্দ পরয়া না করে আমি কিভাবে রোজগার করতে পারবো সেই দিকে ঠেলে দাওয়া হয়ে, মাধ্যম হয়ে সেই "শিক্ষা"। আর সেই শিক্ষিত হয়েও রোজগার না করতে পারলে "বেকার জুবকের" মূল্য কমতে থাকে, কারন সে পিছিয়ে পরেছে। এইবার আসি যৌনতায়। আমি ভালবাসতে শুরু করি এই যুবক অবস্থায়। বলাই বহুল্ল, আমি "নাড়ী"র মন রাখতে ৯৯.৯৯% সাফল্য পাই। কিন্তু সেই ভালবাসার ঠোটের আলগা চুম্বন পালিয়ে যায় আমার বেকার বেকার জীবন থেকে, বেরিয়ে যায় আমার ব্যার্থও জীবন থেকে। আমি তাও প্রচেষ্টা করি- কখনো প্রলভন দেখিয়ে, কখনো মিথ্যা প্রত্যাশা দিয়ে, কখনো হুমকি দেখিয়ে, কখনো অত্যাচার করে।

মধ্যবয়স্কে এসে ওই জুবকেরা পরিপূর্ণতা পায় টাকা রোজগারের মেশিনে। এরা শেখে নিজের আবেগকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিভাবে সে দায়িত্বকে বুকে জরিয়ে রাখবে। বলাই বাহুল্য অনেক পুরানো প্রেম, নতুন প্রেমের অবগত হতে পারে এই সময়ে- যারা এই পুরুষটিকে বেকার জীবনে চিনত না। নতুবা বাড়ীর ইচ্ছা পুরনার্থে আমার জীবনে "নাড়ী"র আগমন ঘটে বিবাহ রূপে। শুধু রোজগার, সংসারে তখন আমি আবদ্ধ নই, আমাকে তখন আরও একজন মানুষ আর তাঁর পরিবারকে আগলে রাখতে দায়বদ্ধ হতে হয়। এতটুকু ভুল করতে সে পারবে না এই বয়সে। ভুল মাত্রই সে মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষে পরিনত হতে হবে।
পুরুষের এই পর্যায় , ভালবাসার কোলে সে এই সময়ে "বাবা" ডাকের সাথে অবগত হয়। সুখী সেই প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষটি বাবা হবার আরও একটি বোঝা কাঁধে তুলে নায়।

জানেন- এতো দায়িত্ব কাঁধে নেবার শক্তি কোথায়ে সে পায়? --উত্তরঃ পরিবার। মুখ বুজে ঝর- বৃষ্টি- রোদে পুড়ে সে যেন  খাবার তুলে দিতে পারে তাঁর পরিবারে মানুষের মুখে। শেষ পাতের শেষ আইসক্রিমটা নিজের নয়, সন্তানের মুখে তুলে দিলে সে সন্তুষ্ট, টিফিনের পইসা বাঁচিয়ে স্ত্রীকে গোলাপ দিয়ে সে খুশি। নিজের ব্যাপারে বলতে গর্ব হয়, এই জাতিটার চাওয়া পাওয়া টাই অন্যরকমের। কার্যভারে পরিপূর্ণ আমার জীবনটা কেটে যায় সন্তানকে বড় করে তাঁর সংসার তৈরি করে দিতে দিতে। সুখের আশায় বিবাহিত জীবনটাও কেটে যায়।

কিন্তু সেই যে প্রকিতীর খেলা। ওই শক্ত কাঁধটাও একসময়ে বার্ধককের ভারে দুর্বল হয়ে পরে। যে ভাত- কাপড়ের দায় দায়িত্ব বহন করে এসেছি এতদিন আমি, বুড়ো হয়ে সে শুধু অবহেলিত হয়। আমি সেই ভালোবাসা পাইনা যেটার আমার প্রাপ্য। আমার মুখে অসুধ তুলে দিতে আমারই সন্তানের ঘৃণা হয়। আমি চাইনা জীবনের শেষ কটা দিন বৃদ্ধাশ্রমের দেওালের মধ্যে কাটাতে। আর তারপর... একসময়ে সেই "পুরুষের" শরীরটা থেকে আমার আত্মাটাও বেরিয়ে চলে যায়, আর মলিন হয়ে যায় আমার স্মৃতি।

এই ভাবেই আমি প্রতিটি পুরুষের মধ্যে সময়ের সাথে সাথে একটা জীবনচক্রের মতন করে বড় হতে থাকি। আমি থাকি তোমাদের সাথেই- ভাই, দাদা, বন্ধু, বাবা, কাকা, জেঠা, দাদুর রূপে। সোশ্যাল মিডিয়াতে "Men's Day"-এর Celebration-এর সাথে একটু পারলে ভালবেসো আমাকে। আমার চাওয়া পাওয়ার পরিমাণটা খুবই কম...

Friday, March 15, 2019

অবমাননা

তুলি বলেছে আমাকে জীবনের কষ্টটা লিখে প্রকাশ করলে নাকি মন হালকা হয়ে যায়ে। জানিনা কতটা সত্যি। তাও আজ জীবনের সব থেকে বড় কষ্ট আর ভুলের স্বীকারোক্তি করব এই কাগজে। তারপর সেটা আমি পুরিয়ে দেব।

সেদিন দুপুরে বৃষ্টি হয়েছিল। বিকালে আকাশটা লাল হয়ে থম ধরে ছিল। ফোন নিয়ে ঘাটতে ঘাটতে একটা নোটিফিকেশান এলো- "You have a friend request"। নির্মল দেবনাথ। প্রোফাইলটা ঘুরে দেখে ভালই লেগেছিল। confirm বাটনটা টিপেই দিলাম।

একটা মেসেজ এলো। "ধন্যবাদ রোশনি"। কিছুক্ষণ দেখলাম,তারপর একটা smiley দিয়ে ছেঁড়ে দিলাম। সব ছেলে গুলই ওই প্রথমে ভালো কথা বলে তারপর ওদের আসল রুপ বেরিয়ে আসে। দুএকটা আরও প্রশ্ন এলো- "কেমন আছো?","বাড়ির সবাই কেমন আছে?""স্টুডেন্ট না এমপ্লয়ী?"-- দায় সাড়া ভাবে উত্তর দিয়ে ছেঁড়ে দিলাম। এমনই করে চলল কটা দিন। বেশ মিষ্টি কথা বলে। আমি আর নির্মল বন্ধু হয়ে যাই। ভালো পটানোর অভিজ্ঞতা আছে ছেলেটার। না, আর পাঁচটা ছেলের মতন শারীরিক খিদে আর time-pass-এর জন্য মেসেজ করত না। ঘুমতে যাবার আগে হাসিয়েই তবে কথা শেষ করাতো। আর ঘুম থেকে উঠে দেখতাম- একটা গোলাপ দিয়ে "সুপ্রভাত" মেসেজ পরেই থাকত রোজ ইনবক্সে। আমি উত্তর দিলাম না, তাও ওর ভুল হতো না। ভালো টান অনুভব করা শুরু করেছিলাম। নিজের কথা মনে পরে, বাস্তবটা ভাবি আর তারপরেরই কথা বলা বন্ধ করেদিএছিলাম।

২০১৭ তে, আবার মেসেজ আসে ছেলেটার। প্রায় ৩ বছর আগের পুরানো কথা মনে করিয়ে দিল ছেলেটা। আবার সেই কথা, গল্প, রোজ গোলাপ, সায়েরি। জানিনা কেন ও আমাকে নিয়ে এতো কিছু ভাবে। কোনদিনও আমাদের মধ্যে কিছু হতে পারবে না। আমিও নিজেকে সামলাতে পারিনি। দেখাও করি ৩-৪ দিন। প্রতিবার ও হাতে করে গোপাল নিয়ে আসে- কিন্তু কোনদিন কিছু বলেনি। আকর্ষণটা দুদিক দিয়েই ছিল সেটা মনে হয়ে দুজনেই টের পেতাম।

সময়ে কেটেছে অনেকদিন। আমার জীবনের সাথে ওর সাথে সম্পর্কটা যেন সমান্তরালভাবে চলেছিল। আজ ৩ মাস ওর সাথে কথা বলিনি। কাল আমার নিকা হবে ইয়উসুফের সাথে।

সারাজীবন এই কষ্টটা বয়ে চলতে পারবোনা আমি। আজ এই চিঠিতে আমি বলতে চাই- "তোমাকে ভালবেসেছিলাম নির্মল। ধর্মের নামে দোষ দেব না, কিন্তু আমার সাহস হয়েনি আব্বু-আম্মিকে বলার কথা তোমাকে। অনেক অবমাননা করেছি। পারলে ক্ষমা করে দিও"

তোমার দাওয়া অনেক সায়েরির মধ্যে একটা-

"Zaroori nehi ki jeene ka koyi sahara ho,
Zaroori nehi ki jiska hum ho, wo bhi tumhara ho,
Kuch kashtiyan doob jaya karti hain
Zaroori nehi ke har kashti ke naseeb main kinara ho"

Thursday, December 27, 2018

কলঙ্কিনী রাঁধা

আজ সকাল থেকেই দিদিভাই খুব সেজে গুজে ছিল। ও এতো সকালে সেজে গুজে অফিসে যায় না। জানিনা কেন। যাইহোক, আমি রোজকারের মতন সকালে উঠে ঘরের কাজ গুলো করে, খাবার খেয়ে পরতে বসে গেছিলাম। দিদিভাই আর বাবা খেয়ে বেরিয়ে গেছে। এবার ঘর একলা, শান্তি। আমি নিশ্চিন্তে পরতে বসে গেলাম। আমার আবার সামনেই পরিক্ষা। তার উপর আজ বিকালের পড়াটা বাতিল করতে হল। বিকালে জানিনা ভুলভাল কে সব আসবে। জানিনা বাবা! কিসব শুরু করেছে বাড়িতে, আমি এমনই ছোট্ট; সবে বি.এ ২য় বর্ষ।

ভুলভাল বলে কথাটা উড়িয়ে দিলেও আজ আমার জীবনে একটা বড় পরিক্ষা- মা এই কথাটা কেন যে মাথায়ে ঢুকিয়েছিল। আজ আমাকে দেখতে আসবে। তাই সারাটা দিন মাথার মধ্যে একটা গুমোট চিন্তা বাসা বেঁধে পরে ছিল। বিকালের শাড়ীটা দিদিভাই পছন্দ করে বিছানার উপর রেখে গেছিল, আর ওই শাড়ীটার দিকে চোখ গেলেই আরও চিন্তা গুলো নড়ে চড়ে বসে। নীলাভ সবুজ শাড়ীটা, উপরে কালচে বেগুনী রঙের জড়ির কাজ করা, পড়লে এতো মখমলে আর মলায়ম যে অন্যান্য জামদানী শাড়ীর মতন চলা ফেরা করতে অসুবিধা হয়ে না। তাই এই শাড়ীটা ওর খুব পছন্দের।

সকাল থেকে ২০-২৫ বার ফোন করে আমার খোঁজ নাওয়া হয়েগেছে ওর। এইতো দুপুরে খাবার পর ফোনে মাকে বলছে- টুলু যেন খেয়ে না ঘুমিয়ে পরে। স্নেহ, মমতায়, ভালোবাসা, আদর, শাসনে দিদিভাই আমার দ্বিতীয় মা।

ঘড়ীর কাঁটায়ে ৪.৩০ তখন, মা বলল তৈরি হতে। ছেলে বাড়ি থেকে নাকি ৬ টার দিকে আসবে। বাবা, ছেলে বাড়ির লোকজনকে ফোনে বাড়ির পথের দিকগুল বলছে মনে হয়ে। মা কি যেন করছে রান্না ঘরে। আমি একগুচ্ছ উত্তেজনা আর উদ্দেক নিয়ে নিজেকে আয়ানায় সাঁজাতে ব্যাস্ত। এমনই সময়ে শাঁখের কড়াত! আজই টি.ভি সারানোর মেকানিকটা এসেছে। শাড়ীতে সেফটি পিনটা লাগাতে যাব আর ওইদিকে ছেলে আর ছেলে বাড়ির লোকজন এসেগেল। কি আর হবে! বাবা ওদেরকে আমার ঘরেই বসাল। কারন দস্যু মেকানিকটা ওই ঘরে টি.ভি নিয়ে বসেছেন।

হলুদ টি- শার্ট, একটা জ্যাকেট আর জিন্‌স পরে চলে এসেছে দিব্যি ছেলেটা, ভুল! যুবকটা। আমি মনে মনে যতটা বুড়ো আর খারাপ ভাবছিলাম, ততটাও খারাপ নয়। শাড়ী ঠিক করার নাম করে ৩ বার দেখেও নিএছি। অগত্যা পাথরের মতন চেয়ারে বসতে হল। কিন্তু যতটা উদাসিন হবো ভেবে বসেছিলাম, ততটা হইনি। ছেলে আর ছেলে বাড়ির লোকজন খুব অমায়িক আর সরলপ্রাণ। খুব অল্প সময়েই একটা স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশের শুরু হয়েগেছিল। সেটা বেশিক্ষণ থাকল না। তীরের বানের মতন একটা প্রশ্ন এলো ওদের তরফ থেকে- " আচ্ছা! বড় মেয়ের বিয়ের বাপ্যারে ভাবেননি? "

২ সেকেন্ডের জন্য সবাই চুপ। মায়ের হাসিটাও হারিয়ে গিয়ে একটা কৃত্রিম হাসি বেরিয়ে এলো। তারপর একটা স্থব্ধতার মধ্যে মা কিছু কথা ওদেরকে বলছিল যেই কথা গুলো আমি মনে করতে চাইনা কোনদিনও।

মা বলল- তখন ২০১৬ সাল, তুকাই, আমার বড় মেয়ের খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল। ওর ভালো নাম শ্রেয়সী। সে কি মজা। আমাদের বাড়ির প্রথম বিয়ে। খুব হুল্লোড়। ছেলের বাড়ি থেকে জানেন ৩ তোলার একটা হার আমার মেয়েকে দিয়েছিল। খুব আনন্দ হয়েছিল বিয়ের দিন। কত্ত বাজি পোরানো হয়েছিল। খুব আনন্দের সাথে দিনটা কেটেছিল। ওর বাবা, মানে আমার হাসব্যান্ড একটা বড় চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। বিয়ের দিন রাতে ওনার হাসি মুখটা আজও মনে পরে আমার।
বউ ভাতের দিন আমরা আবার মজা করে গাড়ি নিয়ে ওদের বাড়ি যাই। গিয়ে দেখি তুকাইের চোখ লাল। প্রথমে ভাবলাম আমাকে দেখে কাঁদছে হয়েতো, কোনদিন আমাকে ছেঁড়ে থাকেনি। কিন্তু না। মেয়ে জানাল আমাকে- মা! কালরাত্রিতে, ছেলে আমাকে আলাদা করে ডেকে বলল- একটা কথা বলি, দয়া করে কাওকে জানিও না। তোমার যত খুশি শপিং করার করো, সোনায় মুরিয়ে রাখব তোমাকে, কিন্তু দয়া করে কোনদিন কাওকে জানিও না যে আমি যৌনসঙ্গমে শক্তিহীন।
কি আর বলি দুঃখের কথা, মেয়ের কান্না আর ওই কথা শুনে রক্ত হিম হয়ে যায়ে আমার, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। সাথে সাথে ওর বাবার হার্ট এটাক।
দেড় বছর লাগে। কোর্টের মামলার রায় বেরোয়। তুকাইের বিয়েটা নাকচ করা হয়। এটা কোর্টের ভাষায় নালিফায় বিয়ে, ডিভোর্স নয়। কারন ও ছেলের বাড়িতে ৩দিন থেকেছিল। সম্পর্ক তো দূর, কাঁদতে কাঁদতে মেয়টার জীবন শেষ হয়ে গেছিল।
সব সেরে উঠতে ২ বছর লাগে। তুকাই তাই বলে- টুলুর বিয়েটা আমি সামনে দাড়িয়ে দেব।

২ বছরের অবসাদটা মা কয়েকটা লাইনে ওদেরকে জানিও দিল। মিষ্টি খাওয়া দাওয়া আর কিছু প্রশ্ন উত্তরের বৈঠক শেষ করে ছেলে আর ছেলে বাড়ির লোকজন চলে গেল।

রাত ১০.৩০। দিদিভাই,মা আর আমি আমার ঘরেই বসেছিলাম। দিদিভাইকে সব বলছিলাম। চুলে ঢাকা মাথা নিচু করে রাখা দিদিভাইয়ের মুখটা দেখতে পাছহিলাম না। মুখ তুলতেই সেই বউ ভাতের দিনের মতন চোখ লাল করে মায়ের দিকে তাকিয়ে দিদিভাই বলল- মা, আবার বলছি , টুলুর বিয়েটা আমি সামনে দাড়িয়ে দেব। ওর মুখের হাসি দেখলেই আমি সুখি হবো। ১ টা বাচ্ছা বা ২ টো বাচ্ছার বাবাকে আমি বিয়ে করতে পারবো না মা। আমি ডিভোর্সি মেয়ে নই, ৩ দিনের সিঁদুরের বিয়ে আমি মানি না। আমি কলঙ্কিনী রাঁধা। আমাকে বিয়ের জন্য জোর করো না মা।

বাইরে চলে আসি। মাকে জরিয়ে দিদিভাইকে কাঁদতে দেখতে পারছিলাম না আমি।
৩ দিনের সিঁদুরের বিয়ে আমি মানি না মা

Wednesday, December 5, 2018

দশ টাকা

"দাদুভাইইইইইইইইই!!!!" ভারী পরিনত অথচ তীব্র গলার আওয়াজ শুনলাম।

দাদুবাড়িতে আমার সব থেকে প্রিয় ডাক। আগে "মুন" বলে দিদুন ডাকত। দিদুন চলে যাবার পর ওই বাড়িতে আমার ঘুরতে যাবার জন্য যে সব থেকে বড় অপেক্ষা করে সে হল আমার দাদুভাই।

আমি হলাম মডার্ন নাতি। সকালের গরম দুধ চা আর খবরের কাগজে সকাল হয়ে না আমার, ফেসবুকের নোটিফিকেশান চেক করেই আমার সকাল হয়ে। সেই দিনটার শুরুটাও অন্যথা হয়েনি। তাই দাদুভাইের ডাকটা রীতিমত অবজ্ঞা করে দিলাম। মোবাইলের ৬ ইঞ্চির স্ক্রিনটা আমার সমস্ত ধ্যান, ভাব, বিবেচনা, একাগ্রতাকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে একটা কাল্পনিক জগতের মধ্যে, যেখানে থেকে আমি বাস্তবিক স্নেহ, আদর, ভালবাসাকে অনুভব করতে পারিনা।

"দাদুভাই, চল ঘিএর পরোটা খেয়ে আসি" আমার কোন সাড়া না পেয়ে দোতলা থেকে দাদুভাই আবার আমাকে বলল।

শিবু ময়রার দোকানের ঘিএর পরোটা,সাথে ছোলার ডাল; শালপাতা থেকে পরোটা একটা টুকরো নিয়ে ছোলার ডালে ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে মুখে দিলে প্রথম যে নিঃশ্বাসটা নাক দিয়ে বেরোয়, সেটা ঘিএর; তারপর ময়দা ভাঁজাটা ডালের সাথে মেখে যখন মুখের চারপাশে দাঁত দিয়ে পেষা হয়ে- আমি স্বর্গ সুখ পাই। তাই পেটুক বলে জিভের লালসাটাকে অবহেলা করতে পারলাম না। সাড়া দিলাম- "চলো, যাচ্ছি দাদুভাই"

ফোনটা রেখে জামাকাপড় পরে দোতলা চলে গেলাম। দেখি দাদুভাই আগে থেকেই তৈরি হয়ে বসে আছে, ধবধবে সাদা পায়েজামা আর সিফন ধুতি, সাথে এক গাল হাসি আর বলল- " এইযে দাদুভাই, কই ছিলে? আমি কখন থেকে ডাকছি। শোন আর দেরী করও না, চলো বেরোই। ওই কোনা থেকে আমার লাঠিটা দাওতো"

আমি আমার কোম্পানিতে টিম লিড, তাও দাদুভাইএর কাছে আমি ছোট নাতির মতন প্রবৃত্তিটা রেখে দিয়েছি।
দরজার পাশ থেকে লাঠিটা এনে দিয়ে দুজনে বেরিয়ে পরলাম আসতে আসতে। ঠিক যেমনটা বছর ২০ আগে আমার ছোট্ট হাতটা ধরে দাদুভাই ঘুরতে নিয়ে যেত।

মিনিট আটেকের রাস্তা আমরা ১৬ মিনিটে পৌঁছালাম। শিবু ময়রা এখন আর বেঁচে নেই তবু তার নামের দোকানটা ওনার ছেলে বাবার মতনই চালিয়ে যাছে। দাদুভাই আস্তে আস্তে দোকানের ভিতরে ঢুকে বলল- "কই হে! দুটো করে পরোটা দুই জায়গায় দাও হে দেখি।" আমি সুবোধ বালকের মতন বসে রইলাম।

মিনিট দুয়েক পর পরোটা এসে গেল, দাদুভাই একগাল হাসি দিয়ে বলল-" এই নাও দাদুভাই! গরম গরম খেয়ে নাও"। তারপর দুজনেই পরোটা খেতে মনোনিবেশ করলাম। আমি যেন সেই ছোট্ট বেলার দিনের সুখ ফিরে পাচ্ছিলাম। পরিনত বয়স বলে স্বভাবতই দাদুভাইএর খেতে সময়ে লেগেছিল, তাও আমি খাবার পর হাত ধুয়ে এসে বসলাম। দাদুভাই হাত ধুয়ে কোচল থেকে ৪০ টাকা আর কিছু খুচরো পয়সা নিয়ে দোকানদারকে দিল। আমি ওয়ালেট বার করে ১০০ টাকা বারিয়ে দিতেই ভ্রু কুচকে দাদুভাই তীব্র স্বারে বলল- "পইসা সরা। আমি দিছি তো"

তুমি থেকে তুইতে দাদুভাইের কথা শূনতেই আমি একটু ভয়ে পেয়ে যাই, ছোট্ট বেলা থেকেই ভালবাসা আর ভয়ের অন্যতম স্থান হল দাদুবাড়িতে, দাদুভাইএর উপর। আমি চুপ করে গেলাম। অথচ উৎসুক মন দেখছে  দাদুভাই কিছু একটা খুজছে কোচলে, কিছুক্ষণ পর টের পেলাম যে ৫০ টাকা দিতে পেরেছে, আরও ১০ টাকা বাকি, সেটাই কোচলে হাত বারিয়ে খুঁজছে।

ওয়ালেট পকেটে ঢোকাবোই কি এই দৃশ্য দেখে ১০ টাকা বার করে আমি চুপিসারে দোকানদারকে দিয়ে দিলাম। রৌদ্রের আলোয়ে চিন্তিত দাদুভাইকে ডেকে দোকানদার বলল- "কাকামশাই, হয়েগেছে, আর তো টাকা লাগবে না"

৩২ বছর ব্যাবসাদারের ১০ টাকার হিসেব ভুল হতে পারে না। জিজ্ঞাসা করল ঘুরে- "কেন হে! ৪টা পরোটা ১৫ টাকা করে ৬০ টাকা হয়ে, ৫০ টাকা আমি দিলুম যে!"
"ও লাগবে না কাকামশাই!"- দোকানদার একটু হেসেই বলল।
"ও আচ্ছা"- মনে অনেক প্রশ্ন রেখেই একটা সম্মতিজনক উত্তর দিল দাদুভাই।

দুজনেই বাড়ি ফিরে এলাম। আমার শুধু দিনটাই মনে থেকে গেল। অনেক প্রশ্ন নিরুত্তর থেকে গেল। "কেন দাদুভাই দোকানদারের মিথ্যে কথাটা ধরতে পারল না?", "সবটা জেনে শুনেই কি দাদুভাই চুপ থেকে গেল?", "নাকি বয়সের ভারে ওত হিসেবের খুঁটিনাটি দাদুভাই বুঝতে পারেনি?", "আমি টাকাটা দিয়ে দাদুভাইকে ছোট করলাম না তো?"

কোন উত্তর নেই আমার কাছে। তবুও এখন মনে হয়ে, স্বর্গসুখটা মনে হয়ে পরোটা খাওয়াতে নয়, স্বর্গসুখ হল জীবনে প্রথম আর শেষবার দাদুভাইকে ১০ টা টাকা দিয়ে সাহায্য করার সুযোগ পেয়েছিলাম।

হাসি মুখী শরীরটা জ্বরা জীর্ণ হয়ে কাঁধে উঠলেই শোনে হরিনাম
জানিনা কোথায় আছো? ভালো থেকো, লহো শত সহস্র প্রণাম ।।

Saturday, October 13, 2018

ভয়

"বিকাল ৫টা বেজে গেল, তানিয়াটা এখনও এসে পৌঁছাতে পারল না"- দূর্বা ঘাসের পাতাগুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিজের মনেই বিড়বিড় করছিল রিশভ। "আজ ওর একদিন কি আমার একদিন, সপ্তাহে একদিন দেখা করার সুযোগ মেলে, তাও সময়ে আসতে ওর কি যে হয়ে কে জানে"

এইভাবে বিড়বিড় করতে করতেই ডানদিকের পার্কের গেঁটের দিকে তাকাল রিশভ, মনে একটা শান্তি আর চোখে মুখে রাগের ছাপ ফেলে দেখতে পেল তানিয়াকে। আসতে না আসতেই জোর গলা করে বলে উঠল রিশভ-

"এতো কিসের কাজ তোমার বাড়িতে যে একটা দিন সময় করে দেখা করতে আসতে তোমার এতো অসুবিধা হয়?"

তানিয়া কিছু বলল না, শুধু এক গাল হাসি দিয়ে বলল- "দুপুরে কি খেয়েছো?" বলতে বলতে কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে ব্যাগ থেকে একটা টিফিনবাটি বার করে রিশভকে দিয়ে বলল- "পায়েসটা খেয়ে নাও"

কিন্তু রিশভকে দেখে মনেনা হচ্ছে তানিয়ার দেরী করে আসাটার কথা এখানও মন থেকে ক্ষমা করে দেবার মনভাব নিয়ে বসে আছে। পায়েসের বাটিটা হাতে নিয়ে, আবার বলে উঠল-

"কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলাম কিন্তু।" আজ উত্তর জানতেই হবে,মিষ্টি হাসি আজ মায়ার কাজ করলনা রিশভের উপর, ভ্রু কুচকে সহস্র প্রশ্নের হাড়িওয়ালা চোখ নিয়ে তাকিয়ে- "না সত্যিটা বলত আজ, তোমার এতো কিসের অসুবিধা দেখা করতে আসার?"
"কোথায়ে অসুবিধা? এইতো এসেছি, একটু দেরী হয়েগেছে।"- আবারও হেসে বলল তানিয়া।

"একদিন হলে মানতাম, রোজরোজ মানা যায় না, তানিয়া। তোমাদের মেয়দেরই দেখি এতো আসুবিধা। দেখা করতে আসতে অসুবিধা, ফোনে কথা বলতে অসুবিধা, ঘুরতে যেতে অসুবিধা।"

নিজের উপর কথাগুলো সহ্য করতে পারছিল তানিয়া, কিন্তু রিশভের মেয়দের নিয়ে বলাটা সহ্য করতে পারলনা, নিজের মধ্যে একটা অহংবোধ চারা দিয়ে উঠল। মিষ্টি হাসির পিছনের শত সহস্র  প্রতিবাদে জিতে আসা মনটা থেকে শ্রান্ত হাসিটাও মিলিয়ে গেল তানিয়ার। বলল-

"কথায় কথায় না জেনে মেয়েদের নিয়ে কেন মন্তব্য কর? কতটুকু জানো তুমি মেয়েদের জীবন নিয়ে?"

"সব জানি আমি, তোমরা শুধু অজুহাত খোজ আর ভয় পাও, হা, কথা বলতে ভয় পাও, ঘুরতে যেতে ভয় পাও, শুধু ভয় পাও"

"তাই না?"বিনত হাসি দিয়ে তানিয়া মুখ নিচু করে বলল-"হ্যাঁ, আমরা মেয়েরা ভয় পাই।
ঠিক বলেছ, শুধু ভয় পাই। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ভীত থাকে নারীদের মন।" একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে চোখ মেলে তানিয়া আবারও বলে উঠল-"হ্যাঁ ভয় পাই। আমরা ভয় পাই এটা ভেবে যে মায়ের পেটে ৯ মাষ থাকার পর মেয়ে হয়ে জন্মে নর্দমায় মরে যেতে হয়ে। আমরা ভয় পাই শ্যামলা হয়ে জন্মানোর পর থেকেই। ভয় পাই মেয়ে হয়ে জন্মানোর পর ছেলেদের সাথে খেলতে যেতে। স্কুলে প্রথম পিরিয়ডের লাল দাগ দেখে উত্ত্যক্ত করা ছেলে বন্ধুদের সাথে দিতিয়বার কথা বলতে ভয় পাই। বয়ঃসন্ধি কালের পর মায়ের মানা না শুনে দৌড়াদৌড়ি করতে ভয় পাই। ভয় পাই পুরুষ আত্মীয়সজনের চোখে চোখ রাখতে। গরমকালে ছোট প্যান্ট পরতে ভয় পাই। সালওারের সাইডে বেশি কাটতে, বড় পিঠের ব্লাউজ পরতে ভয় পাই। এমনকি ছেলেদের সাথে উঁচু গলা করে কথা বলতে, একটু ভালভাবে মিশতে ভয় পাই। ভালোবেসে বারে বারে কষ্ট পেটে ভয় পাই। বাড়ি ফেরার সময়ে গণ্ডির বাইরে একটু মজা করতে  ভয় পাই। নাইট ডিউটি করে বাড়ি ফিরতে ভয় পাই, এমনকি দিনের বেলায়ে ৫ টা ছেলে এক জায়গায়ে থাকলে সেখান দিয়ে যেতে ভয় পাই। শ্যামলা হওয়াতে সম্মন্ধ আসলে প্রত্যাখ্যাত হতে ভয় পাই। মায়ের আদর, বাবার ভালবাসা ছেঁড়ে স্বামীর নতুন ঘরে যেতে ভয় পাই। স্বামীর পছন্দকে নিজের করে নিয়েও আমার পছন্দগুলোকে অগ্রাহ্য করতে ভয় পাই। বিবাহিত বলে প্রতি রাতে স্বামীর ব্যবহার হতে ভয় লাগে। ৯ মাষ পেটে রাখার পর নিজের অংশকে পৃথিবীতে আনতেও মেয়েরা ভয় পায়। সংসার সামলে, চাকরি সামলে, অফিসের ইভ টিজিং দূরে রেখে, স্বামিকে সামলে সন্তান বড় করতে ভয় পাই। স্বামীর ঘরকে নিজের করে বানিয়ে, সন্তানের অব্বগ্যা শুনে সেই ঘর ছেঁড়ে বৃদ্ধাশ্রমে মরতে নারীজাতি ভয় পায়।
হ্যাঁ রিশভ, তুমি ঠিকই বলেছ, আমরা মেয়েরা ভয় পাই"

Thursday, September 13, 2018

নিস্তব্ধতা

"আজ বিকালটা যেন কাটতেই চাইছে না। কলেজের ল্যাবটাও আজ তারাতারি শেষ হয়ে গেল।"- বিড়বিড় করে এই কথাটা বলে বিছানাটা ছেঁড়ে উঠে পড়ল সুদীপ। বিছানা ছেঁড়ে ৪-৫ হাত দূরে ড্রেসিং টেবিল পর্যন্ত পায়চারি করছিল, হটাত কি মনে হোল ; বিছানার নীচে সিগারেট আর দেশলাইয়ের বক্সটা বার করে নিয়ে বিছানার পাশের বাল্কনির দরজাটা খুলে বাইরে এলো।

আশ্বিনের বিকাল। সূর্যটা তখনও পুরোপুরি ডোবেনি। আকাশের এক কোনে যেন কে এক ছড়াক আবীরের লাল রঙটাকে ছড়িয়ে দিয়েছে। সুদীপ একটা সিগারেট বার করে জ্বালিয়ে বাল্কনিতে দাড়িয়ে আছে ওই লাল রঙের আকাশটাকে স্থির চোখে তাকিয়ে। আনমনা মনে হটাতই ওর চোখ পড়ল সামনের বাড়ির জানলাটার উপর। রিমা যে জানলার ধারে বসেই ছিল, সুদীপ সেটা বুঝতেই পারেনি।

রিমা, সুদীপের কলেজেই পরে। সেই ছোট্ট বেলা থেকে ওরা দুজন দুজনকে চেনে। একসাথে বড় হওয়া, একসাথে খেলাধুলো, একসাথে বন্ধুত্ব, একই সাথে একই সাবজেক্ট নিয়ে কলেজে প্রবেশ। এক সাথে বড় হওয়া বন্ধু গুলোর মতন ওদের মধ্যে কোন রেষারেষি ছিলনা কোনোদিনই। কলেজটা যত শেষের দিকে এগিয়ে আসছে, সুদিপ-রিমার সম্পর্কের সেঁকলটা ততো ওদের আস্টেপিস্টে বেঁধে ফেলেছে। বলাই বাহুল্য, সুদীপ আর ওর নিজের জীবনটাকে রিমা ছাড়া ভাবা শুরু করেনি। ওর ভাবনা- যেমনটা করে ওদের জীবনের ২৪ টা বছর কেটে গেছে, বাকি জীবনটাও সেভাবেই বন্ধুত্ত-স্নেহ-খুনসুটিতে কেটে যাবে।
কিন্তু এমনটা হয়েতো ওদের বাবা-মা ভাবেনি। গত পরশু কানা-খুসোতে সুদীপ জানতে পারে, রিমার বাড়িরতে ছেলে দেখাশুনো চলছে। যাচাই করতে কাল সুদীপ, রিমাকে জিজ্ঞাসা করেছে, কিন্তু কোন লাভ হয়েনি। ব্যাপারটা রিমাও প্রথম শুনেছে সুদীপের মুখ থেকে, রিমাও তাই আশ্চর্য হয়ে যায়ে। এই নিয়ে ওরা আর আলোচনা করেনি নিজেদের মধ্যে। ওরা দুজন এখনও বিচ্ছেদের ব্যাথা অনুভব করেনি।

আজ হয়েতো সেই কথাগুলই সুদীপকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। জানলাতে চোখ পরতেই সুদীপ তাই সেই পরিচিত চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে ছিল। কি যেন একটা বই পরছিল রিমা। হটাত একটা দমকা হওয়া দিল। হরিণী ওই চোখ দুটো থেকে রেশমি চুলটা সরাতে রিমাও দেখল ওর সাথীকে, বাঙ্কলিতে দাড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে। কত কি বলা বাকি থেকে গেল , সুদীপের চাওনিতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাছে। হয়েতো একটু ভুল বলা হোল, রিমার চোখে আজ সেই প্রফুল্লতা কেমন মলিন হয়েগেছে সুদীপকে দেখে। এক দৃষ্টিতে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে, একটা শূন্যটা দুজনকে ভিতর থেকে খেয়ে ফেলছে। দুজনে জীবনের বইটা লেখা শুরু তো করেছিল, কিন্তু শেষটা লিখতে পারবে কিনা সেটার কোন সম্ভাবনা ওরা খুজে পেল না। একে অপরের চিন্তায়ে হারিয়ে ফেলা  মনে সুদীপ নিজেকে খুজে পেল যখন বুঝতে পারল ওর হাতের সিগারেটটা জ্বলে ওর আঙুলে সেঁকা দিল। হাত নাড়িয়ে সিগারেটটা ফেলে দিতেই সুদীপ এক চেনা হাসির আওয়াজ শুনতে পেল, দেখতে পেল সুদীপের বাড়ির বাল্কনির উল্টো দিকে থাকা মেয়েটির অপরিম্লান হাসিটা এখানও একই রকম আছে।

Tuesday, September 4, 2018

খুশির দিন

আজ সকাল থেকেই অজানা খুশিতে মিনু ঘরের কাজ করে যাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে বাসি কাজ সেরে মিনু সকালের জল খাবার তৈরির প্রস্তুতি করছে আর গুন গুন করে কি যেন একটা গান ধরেছে। "আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রান সুরের বাঁধনে---" বোধ করি এই গানটাই গুন গুন করে গাইছে। হটাতই গান বন্ধ করে দিয়ে তারস্বরে চিৎকার করল- "অঅঅঅঅমিমিমিতততত!!!!!"
-"উউঠছি"- ভিতরের ঘর থেকে বালিশে চাপা মুখ থেকে খীণ স্বরে ভেসে এলো আওয়াজটা।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার কাজে মন দিল মিনু। ঠিক যেন হটাত বিস্ফোরণের পরের স্থির পরিবেশের মতন।

অমিত,২৯ বছর বয়সই একটা প্রোডাক্ট কোম্পানির ব্যাস্ত ম্যানেজার। বাড়িতে এসে রাতের খাবার খাওয়া, রাতের ঘুম আর ভোরবেলা স্নান সেরে আবার অফিস যাওয়া- বাড়ির সাথে তার এইটুকুই সম্পর্ক। এমনকি রবিবারও সে বাড়িতে ল্যাপটপে কাজের রাশি নিয়ে বসে থাকে। সহজ সরল জীবন জাপনের থেকে মুখ সরিয়ে ধকলমূলক ব্যাস্ত কাজে অমিত নিজের খুশি খুজে পায়ে।

অপরদিকে- মিনু ওরফে মানসী, ২৭ বছরের প্রাপ্তবয়স্কা শুভ্র, শান্ত, সুশ্রী, স্রান্ত একটি মেয়ে, যে বাঁধনছাড়া জীবন থেকে বেরিয়ে এসে সে প্রনয়ে বাঁধা পরেছে। সে ব্যাস্ত, নিজের সংসারকে স্বপ্নের সংসারে পরিনত করতে,সে ব্যাস্ত, স্বামীর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে, উড়িয়ে দাওয়া খুশির ডানা গুলোকে লাগাম দিয়ে নিজেকে কারো মনের মতন করে তুলতে ব্যাস্ত, সর্বোপরি ওর ওই লাল সিঁদুর-শাঁখা-পলাকে জিয়িয়ে রাখতে সে ব্যাস্ত।

-"কি করছ মিনু?"- ঘরের ভিতর থেকে গম্ভীর গলায়ে জিজ্জাসা করল আমিত।
-"চা বসালাম, রুটি তরকারী করব এরপর, তুমি তারাতারি তৈরি হয়ে নাও" অনুরাগী মন, নিজ মনে হেসে মিনু আবারও বলল- "আজ জানো তোমার প্রিয় বাটার পনিরটা করব ভাবছি"

কথাটা শেষ হতে না হতেই ঘর থেকে কি যেন খছ খছ আওয়াজ এলো। সন্দেহের মতন করে একবার ভেবে মিনু আন্দাজ করলো অমিত হয়তো নতুন টুথ ব্রাশ খুঁজছে। আনমনা হয়ে গুন গুন করতে করতে আবার নিজের কাজে মন দিল সে।

রান্নাঘরে হটাত বজ্র বিদ্যুতের মতন আবির্ভাব ঘটল আমিতের। কাজে ব্যাস্ত মিনু সবজি হাতেই ঘুরে দাঁড়ালো।এ যেন এক হাসকর রূপে! মিনুর এক হাতের পনিরের এক টুকরো, তাই নিয়ে ও ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আমিতের দিকে; কালকে রাতের বাসী নমনীয় কাপড় পরা, চুল এলমেল, ঘুম ভরা চোখ আর হাত দুটো পিছনে করে রাখা। আকস্মাত উদয়নে বিস্মিত মিনু বলল "কি হয়েছে?"

২ সেকেন্ড সব স্তব্ধ। আমিত একটা মলিন হাসি হাসল।

এ যেন সেই ব্যাস্ত মিনুর জীবনের এক বিরল দিন। না! ব্যাস্ততায়ে সদ্য বিবাহিত সম্পর্ক ভুলে যাবার ছেলে আমিত নয়। এর আগেও অনেকবার কাটা সবজি থেকে গাজর তুলে খেয়ে নাওয়া, এঁটো বাসন রান্নাঘরে এসে রেখে দাওয়া, ব্যাস্ত কাজে বিরক্ত করতে এসে পিছন থেকে মিনুকে আদরের আলিঙ্গন- এসবে মিনু ওয়য়াকিবহল। কিন্তু আজ যেন সেসব ইঙ্গিতের কোন লক্ষন পেল না মিনু আমিতের আকস্মাত উদয়নে।

হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল আমিত। অপ্রত্যাশিত মিনুর মন তখন, চখ দুটো বড় হয়ে গেলো, হাত থেকে পনিরের টুকরোটা পরে গেলো। আমিত পিছনে রাখা হাতটা  সামনে আনল। বিস্মিত মিনুর চোখ তখন আমিতের হাতের দিকে। 

একটা লাল গোলাপ আর একটা চকোলেটের প্যাকেট মিনুর দিকে বাড়িয়ে অমিত বললো -

তুমি চাইলে মেঘ হবো ,এনে দেবো বৃষ্টি ।।
তুমি চাইলে আকাশ,হবো ,হবো হাসির মিষ্টি ।।
তুমি না চাইলেও জনম জনম ,,
বাসবো তোমায় ভালো ।।
তুমি চাঁদ নও, তবে চাঁদের আলো।
তুমি ফুল নও, তবে ফুলের সৌরভ।
তুমি নদী নও, তবে নদীর ঢেউ।
তুমি অচেনা নও, তুমি আমার চেনা কেউ॥
““শুভ জন্মদিন সোনাই!!””

Friday, August 31, 2018

না বলা কথা

আজ ৩১ শে অগাস্ট, আজ থেকে এক বছর আগে তোর সাথে আমার পরিচয়। আজ দিনটা ভুলতে পারছিনা একটুও। আজ সকাল থেকেই তোর তোর ফেসবুক প্রোফাইলটা খুলে খুলে দেখছি। গত বছর এইদিনটায়ে অফিস থেকে ফিরে দেখেছিলাম তুই আমার রিকোয়েস্টটা একসেপ্ট করেছিলি। সেই রাত থেকেই তোকে ভালবেসেছিলাম। আজও বুঝে উঠতে পারলিনা।

আচ্ছা তোর মনে আছে ? নভেম্বরে সেই রাতটা খুব কষ্ট হয়েছিল না তোর ? আমার জন্য তুই স্টেশনে ১.৫ ঘন্টা দাড়িয়েছিলি । আমি দূর থেকে তোকে দেখেছিলাম হলুদ সালোয়ার পরে এসেছিলি, উফফফ কি সুন্দরী না তোকে লাগছিলো । লজ্জায় আমার দিকে তাকাচ্ছিলিই না। তুই গঙ্গার ধারে ওই শিব মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে জানিস আমি কি চেয়েছিলাম ? শুধু তোর খুশি। সেদিন আমি যেন সব পেয়েছির দেশে চলে গেছিলাম। তোর আর আমার তোলা সেদিনের ছবিটা এখানও মামনির মোবাইলে আছে জানিস।

ছুটি শেষ, বেঙ্গালরে ফিরতে হবে। লাস্ট সেদিন কি কান্না কেঁদেছিলি, জানিস রানী, আজও তোর মুখটা ভেসে আসছে। খিমছে ধরে রেখেছিলি আমার হাতটা, চোখ বন্ধ করে রেখে কাঁদছিলিস। আমার কান্নাটা বোধ হয়ে দেখতে পাসনি সেদিন।

ভিডিও কলের জন্য রোজ জালাতিস। আর ঘুমনোর আগে কি একটা মন্ত্র ফুকে দিতিস, আজও জানালিনা। আজও সেদিন কিভাবে বালিশ ছিরেছিলি বলিসনি কিন্তু। ভুলতে পারছিনা জানিস রানী। রোজ ভাবি -ভাবব না তোর কথা, কিন্তু কেন জানিনা এই স্মৃতিগুলো লোহার শেকলের মতন আটকে রেখেছে আমাকে। মনে হয়ে রোজ কেউ হৃদয়টার মধ্যে পাথর দিয়ে মারছে সাথে ওই তীক্ষ্ণ নখর গুলো দিয়ে আসতে আসতে সেই পাথর বার করে দিছে।  দিন দিন এই স্মৃতিগুলো তাড়া করে বেরায়, শুধুমাত্র মামনি বাবার জন্য বেচে আছি, নাহলে ইছা করে ওই স্মৃতির মধ্যে মিসে যাই। একটুও সুখে নেই আমি জানিস। কেন আসিস রোজ তিলে তিলে আমাকে মারতে? কি চাই? যা ছিল সবই তো নিয়ে গেছিস, একটা আধমরা প্রান ফেলে রেখে দিয়ে। 

আবার, আবার আসছে ওই ভাবনা গুলো। কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়ে গেছে মনের ভিতরে সব। যেদিন তোর সাথে দেখা হয়েছিল, লাফিয়ে উঠে জরিয়ে ধরেছিলিলিস সবার সামনে। মনে আছে তোর? বলেছিলি আমাকে জরিয়ে যেন আমি আর কোনদিন তোকে ছেঁড়ে না যাই। সাধে কি বলতাম পাগলী ছিলিস। তা না হলে সারাদিন বাজার করে নিজে না খেয়ে আমার জন্য খাবার রেঁধে নিয়ে আসতিস? সেদিন মনে মনে তোকে নিজের জীবন সঙ্গিনী ভেবেছিলাম। মামনি ছাড়া ওইভাবে আমাকে কেউ ভাত বেড়ে খাওয়াএনি।

কি এমন তাড়া ছিল রে তোর? যে আমার আসার জন্য ৬ টা মাষও অপেক্ষা করতে পারলি না? আমাকে বাড়ি ফেরার, আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা সুযোগ দিতে পারতিস। তুই জানিস আমার জীবন কিভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছে। নিজে বুঝতে পারিনা আমি কোণটা ভালো কোণটা খারাপ। সবাই বলে কেমন যেন আমি বদলে গেছি, আগের মতন খুস মেজাজি ভাবটা নেই। শুধুমাত্র বেচে আছি, নিজেই বুঝতে পারছিনা আমাকে কি করতে হবে না করতে হবে।

মানছি আমি তোর কাছে ছিলাম না, আমার খারাপ সময়ে চলছিল, তোর বন্ধুদের নিয়ে আমার অসুবিধা ছিল, আমার অনেক ভুল ছিল, তোর আর তোর স্বাধীনতার মাঝে আমি দেওাল ছিলাম, মানছি আমি ওত তোকে বুঝতে পারতাম না, কথায়ে কথায়ে ছেঁড়ে চলে যেতাম, খুব চিৎকার করতাম তোর উপর, অনেক কাঁদাতাম তোকে কিন্তু রানী জানিস তোর দিব্যি বলছি- শুধুমাত্র তোকে ভালবেসেছিলাম ।আজ আমি কলকাতার বুকে বসে আছি। চাইলেও তোকে দেখতে পারছিনা। আজ চাইলেও তোর বকাবকি শুনতে পাইনা জানিস।

১৫ দিনের মধ্যে আমাকে ভুলে গেলি বল? ১৫ দিনের মধ্যে আমাদের দেখা সব স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে খুন করে দিলি। ২দিনে আমাকে ভুলে গেলি। তোর মধ্যে কি মনুষ্যত্ব নেই? নারে ঠিকই হয়েছে, আমার সেদিন থেকেই দূরে চলে আসা উছিত ছিল যেদিন থেকে তোকে ভালবাসতে শুরু করেছিলাম, কারন তুই না আমার চাওয়াতে আমার জীবনে এসেছিলিস, না আমার ইছেতে তুই চলে গেছিস। আজ অবধি জানিস তোর ছবি ডিলিট করতে পারিনি; রোজ একবার করে তোর প্রোফাইল খুলে ঢেকে আসি। ভিডিও কলেও কাঁদতিস আমাকে দেখার পর। হ্যাঁ সেবার রেগে বলেছিলাম যে আমাকে আর ফোন করবিনা। কিন্তু তাই বলে এটা বুঝিনি তুই আর ফিরবিনা। কোনদিনও ফিরবি না।

"পাশে থাকাটা জরুরী নয়, সাথে থাকাটা জরুরী"- তোর বলা এই কথাটা বিরক্তিকর লেগেছিল সেদিন যেদিন দেখেছি এই কথাটা  আমি অন্যের জন্য তোকে বলতে।

খুব সুখে আছিস না? অনেক অবলা কথা থেকে গেছে জানিস মনে। আজ তুই সামনে থাকেলে বলতাম-

তোর চোখে চোখ রাখলেই
ধংস অভিযান,
তুই মানেই প্রেমের সুরে
হারিয়ে যাওয়া গান।।
তোর সাথে মাতাল হবো
করব আমরা জরাজরি,
হটাত করেই পাবে প্রেম
লোকে বলবে বারাবারি।।
মধ্য রাতে ফের বেজেছে
বালিশ পাশের ফোনটা,
ওমনি কেমন করছে দেখ
ব্রেইন নামক সেল টা,
ফের বেজেছে
ফের জেগেছে
মধ্য রাতের প্রেমটা।।

Monday, August 27, 2018

অপরাধবোধ

অমিত-নিলেশ-রমিত হোল ৩ বন্ধু। আনন্দগ্রামের বসবাসকারী একদম বাল্যকালের বন্ধু, লোকে ওদের থ্রি মাস্কেটিয়ার্স বলে। ব্যাস্ত জীবনে রোজের খাটাখাটনির পরেও রবিবার বিকালে লালুদার দোকানে চায়ের আড্ডা ওদের কোনদিনও বন্ধ হয়েনা। ওদের কথা বলার জন্য কোন বিষয়ে ভাবতে হয়েনা, ওরা একসাথে ৩জন মিললেই ৪-৫ ঘণ্টা এমনই কেটে যায়ে।

এমনই এক রবিবারের বিকালে ওরা ৩জন বসে গল্প করছে। রমিতের মুখের ভাবমূর্তিতে কেমন এক অসহায়ের ছোপ দেখা গেলো। জিজ্ঞাসা করাতে বলল-ভাই, কদিন ধরে কেমন একটা নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে জানিস।

-কেন রে? আবার কেউ ব্লক করে দিল নাকি?- মজার মেজাজে বসে থাকা নিলেশ বলে উঠল।

-আরে নারে।শোন দাড়া। এইবলে রমিত কিছুটা স্তব্ধ হয়ে আবার বলতে শুরু করল।

সেদিন অফিস থেকে ফিরছিলাম। জানিসই তো বিকাল ৬ টায়ে ওই রাস্তায়ে পিঁপড়ের মাথার মতন মানুষ গিজগিজ করে। ভাগ্য করে ৮৬ নাম্বার বাস টাও পেয়ে গেলাম। ভিড় ঠাসা বাস; কিন্তু উঠে দাঁড়াবার জায়গা কোথায়ে। কিন্তু কার ঘাড়ে কটা মাথা যে কন্ডাক্টরকে বলবে। কন্ডাক্টরের চোখে তো বাস পুরো ফাঁকা। ল্যাপটপের ওজনে পিঠের ব্যাগটা আমাকে পীঠ ধরে যেন নিচে ফেলে দায়ে। সহ্য করতে না পেরে ব্যাগটা সামনে নিলাম ওই ব্যাগের দুই হাতল পিছনে করে বুকের সামনে বোঝার মতন করে। পিছনে লোকজনের ঠেলা খেতে খেতে বাসের বাঁ দিকের লেডিস সিটের দিকে তৃতীয় সিটের সামনে দুই হাত দিয়ে সিট দুটো আঁকড়েধরে দাড়িয়ে থাকলাম। নিশ্চিন্ত এবার ঠেলাঠেলিতে পরে যাবার ভয়টা রইল না। মিনিট সাতেক পর কন্ডাক্টর এসে যথারীতি বাস ভাড়াটা নিয়ে গেলো। নিশ্চিন্ত হয়ে খুচরো পয়সাগুলো পকেটে রাখলাম। খেয়াল করলাম আমার সামনে দুটি মেয়ে আমারই বয়সই হবে, কানে হেডফোন নিয়ে বসে গান শুনছে আর জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। আমার ঠিক সামনের মেয়েটি পরনে ধুসর রঙের কুর্তি, তাতে ছোট জড়ির পার লাগানো, সুশোভিত গোছালো চুল- আলগা বেনুনি করা আর সেই ঘন চুলের গোছাটা ঘাড়ের পাশ দিয়ে সামনে করে রাখা, টিকালো নাখ, শুভ্র দেহ, ওড়না ছাড়া থাকায়ে আমি ওর ঘাড়ের ছোট ছোট চুল গুলোয় ললুপ্ত হয়েগেছিলাম, মেয়েটির সুদৃঢ় সুডোল তনু, ডান হাতে মোবাইল যার সাথে হেড ফোনের তাঁরটা লাগানো আর বাঁ হাতটা এমনই উরুর উপর রাখা। আমি অতি নির্লজ্জের মতন মেয়টিকে দেখে যাচ্ছি। ল্যাপটপের ওজনের ব্যাথার কথাটা যেন আমি ভুলেই গেলাম। শকুনের চোখ দিয়ে আমি ওই মেয়েটির শরীর গ্রাস করছি। নিজের মধ্যে দোষী হবার কোন ভাবনা আমার মধ্যে নেই। ওর শরীরের প্রতিটি ক্ষেত্র যেন আমি অতি সুক্ষতার সাথে দেখে চলছি, আমার এতটুকু চক্ষু লজ্জা নেই।
এইভাবে কিছুদুর বাস এগিয়ে গেলো। সামনে করুন্ময়ি বাস স্টপ, এখানে বাস বেশ কিছুক্ষণ দারাবে। আচমকা মেয়েটি ফোনটা নিয়ে কি যেন দেখল। আনমনা মেয়টি হটাতই অনুধাবন করল আমি মেয়টির পাশে অনেকখন দাড়িয়ে আছি। মেয়েটি আমার দিকে তাকাল। আমি অবাক দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। ওর চিকন গাল, মায়াবী চোখ, ছোট্ট কিন্তু পুরু বিলাসী ঠোঁট, অথচ আমি ওর মুখে এক হাসি দেখতে পাই। সেই মনোহর মুখে চেয়ে আমাকে বলল- "আপনি আপনার ব্যাগটা আমাকে দিতে পারেন। আমি ধরছি।"
কামনতা আমার চোখটা তখন লজ্জায়ে নিচু হয়েযায়ে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি যেন ওই মেয়েটির কথার দাস হয়ে যাই। কিছু না ভেবেই হাত থেকে ব্যাগটা খুলে মেয়টির হাতে দিয়েদি। কৃতার্থবোধের অবকাশ টুকু আমার মনে এলো এর পর, আমিও বললাম- "আপনার অসুবধা হবে না তো?"
মেয়েটি মুগ্ধকারী হাসিতে বলল- "না না" তারপর আবার হেড ফোনের গানে মননিবেশ করল।
আমার মনটা তখন কেমন এক উদাস হয়ে পরল। পুরুষসমাজই দেশে মেয়টি কেমন করে আমকে "নারীপুরুষ অভিন্ন" মানসিকতাটাকে দৃঢ় করে দিল। সমস্থ রাস্তা আমি নিজেকে ধিক্কার জানালাম নিজের পাপ চিন্তাধারার জন্য। "ধন্যবাদ" বলে অতি লজ্জিত চোখে মেয়টির থেকে ব্যাগ নিয়ে গন্তব্য স্থলে নেমে গেলাম।

সেদিন থেকেই জানিস ভাই আমার নিজেকে কেমন একটা অপরাধী লাগছে।

-এতো চিন্তা করিস না। মুচকি হেসে বলল নিলেশ। আরও বলল- তুই যে নিজের অপরাধটা বুঝতে পারলি, এটাই যথেষ্ট। প্রতিদিন ট্রেন বাসে কত মেয়ের এইভাবেই সতীত্বনাশ হয়ে। কখনও পুরুষের চোখ দিয়ে, কখনও ক্ষিপ্ত হাত দিয়ে, কখনওবা ব্যঙ্গ ভাষায়ে কটূক্তি করা। ওই মানুষগুলোর সেই অপরাধবোধটা আজও এলো না।

এই বলে তিনজনেই চায়ে মুখ দিল।

Friday, August 24, 2018

প্রশ্ন

"দাদা, সেই সকাল থেকে কিছুই খেতে দিসনি। খিদে পেয়েছে রে। কিছু খাবার এনে দেনা।"- রাস্তার ধারে ওই আস্তাকুড়োর পাশে খিদেয় কাতর হয়ে পেট চেপে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকা একটা বাচ্চা মেয়ে বলে উঠল। ঝাঁকরা চুল, ছেলেদের ময়লা জামা পরা, হাঁটু ভাঁজ করে বসে লাল চোখটা দিয়ে মেয়েটি চারপাশ দেখছে। নতুন নতুন রঙবেরঙের জামা-কাপর পরে সব মানুষজন হেটে বেরাছে। সামনে একটা খাবার স্টলও আছে, তাতে কি জানো খাবার বানাচ্ছে আর বিক্রিও করছে। মেয়েটি র দেখছে, ওর মতন বয়সী একটা ফুটফুটে মেয়ে হাতে বেলুন নিয়ে কি জানো একটা খেতে খেতে ওরই দিকে তাকিয়ে ছিল, তারপর ওর বেলুন ধরা হাতটা টেনে নিয়ে চলে গেলো একটা বড় মেয়ে। ও আবার খাবারের স্টলটার দিকে তাকাল- সাদা জামা পরা একটা ছোট্ট মেয়েকে মমতার আদরে আপ্লুত হতে। পেটের খিদেটা আবার চারা দিতেই চিৎকার করে উঠল- "এই দাদা, খেতে দিবি?"- এবারের আওয়াজটা আরও জোরে এবং যথেষ্ট গম্ভীর।

সবকিছু জানা, সবকিছু দেখতে পাওয়া ছেলেটা বোনের কাছে আগিয়ে গেলো রাস্তার এপার থেকে। ছিপছিপে চেহারা, খালি গা, খালি পা, পরনে একটা হাঁফ প্যান্ট তাও দড়ি দিয়ে আটকানো। চোখে মুখে অজানার ভান করে বলল
-"কি হয়েছে?এত জালাস কেন? জল খা"
-"সারা দুপুর জলই খেয়েছি। দে না খেতে কিছু"
-"দেখছি। এইখানেই বসে থাকবি, কথাও জাবি না"
এই বলে অজানা এক আশা দিয়ে ছেলেটি আবার রাস্তার এপারে এসে খাবার দোকানটার পাশে দারিয়ে রইল। রাস্তায়ে প্রচুর লোকজন। দুর্গাপূজা বলে কথা, বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ পুজা, তাও নবমী। সারা বছর অপেক্ষারত মানুষগুলো এই পুজার ৪টে দিন খুশির ভাণ্ডারের শেষ বিন্দু অবধি রস আছাধন করতে ব্যাস্ত। তাও ছেলেটা আশা করে দারিয়ে রইল ছোট্ট হাতটা পেটে, কিছু পয়সার আশায়ে।

দূর থেকে গল্পরত ৩টে ছেলে আর ২ জন মেয়ের দল এসে দাঁড়ালো খাবার দোকানটার পাশে। ওদের ফরমাইশে কিছু খাবার তৈরিতে বাস্ত দোকানদার। ছেলেটি ওই গল্পরত দলের মাঝে এসে হাত পাতল। একটি ছেলে সহৃদয়ে জিজ্ঞাসা করল-
-"কিছু খাবি?"
হটাত আশা খুজে পাওয়া ছেলেটা ঘাড় নাড়িয়ে ওর সম্মতি জানাল আর একটা খুশি খুশি মুখ করে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর ওর হাতে কিছু খাবার পেতেই এক হাত দিয়ে সেলাম জানিএ রাস্তার ওপারে চলে এলো।

ছোট্ট বোনের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম ওই ছেলেটি খাবার গুলো ৪ টে ভাগে ভাগ করল। নিজের ভাগের খাবারটা মুখে দিতেই ছেলেটি বোনের মুখের দিকে তাকাল। খাবার খেতে ব্যাস্ত মুখটা কিন্তু ভীষণ খুশি। একটা হাসি দিয়ে ছেলেটিও ওর খাবার মুখে দিল।

নিজের খাবার খেয়ে পরে থাকা দুটি ভাগে হাত দিতে যাওয়া মেয়টির হাত ধরল ওর দাদা। বলল- "ওই দুটি, কালকের বোন। জল খেয়েনে এবার"
দাদার কথা মতন জল খেতে যাবার সময়ে প্রশ্ন করল বোনটি- "হাঁরে দাদা, ওরা কাল আবার আসবে তো?"

Saturday, August 18, 2018

বাড়ির খাবার

"নাহ! তারাতারি স্নান করেনি, বিকালে ফল কিনতে যেতে হবে"- আনমনে নিজেই বিড়বিড় করে বলে স্নান ঘরের দিকে চলে গেলো অনিমেষ।

বেঙ্গালরে আইটি সেক্টরে কাজ করে অনিমেষ, ৪ বছরের অভিজ্ঞতায়ে ৯ জনের টিমের টিম-লিড সে এখন। কলকাতার বিমাগঞ্জে বাড়ি। ব্যাবসাদার বাবা আর ছেলের বাড়ি ফেরার আশায়ে বসে থাকা মামনি; এই হল অনিমেষের বাড়ির কথা। ছোট বেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র, খুবই কষ্ট করে, বাঙ্কের কাছে লোণ নিয়ে ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানায় মনোময় বাবু, অনিমেষের বাবা। নিমন্ত্রন বাড়ি খেতে গেলে, খাবার শেষে আইস-ক্রিমটা নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আসত মনোময় বাবু, নিজে না খেয়ে ছেলেকে খাওয়াবে বলে। কিন্তু কপাল! কলকাতার চাকরিটা বেশিদিন করতে পারলনা অনিমেষ, এই ছোট্ট সুখের সংসারটাকে খাঁখাঁ করে দিয়ে চলে আসে বাঙ্গালরে।

বামুন ছেলের মতন অনিমেষ পইতাটাকে মুছে, জামা-কাপর পরে স্টিলের থালাটা নিয়ে বাড়ির নিচে চলে গেলো। ও এখানে পেয়িং গেস্টে থাকে। সারাদিনের ব্যাস্ততার মাঝে নিজের জন্য সময়ে কম, তিনবেলা খাবার পায়ে বলে নিশ্চিন্তে থাকার আশায় অনিমেষ পেয়িং গেস্টে থাকে। নীচ থেকে খাবার নিয়ে আবার ৪তলায়ে উঠে এসে খাবারটা একটা পেপারের উপর রাখল। সবুজ প্লাস্টিকের বাটিতে একটু চানাচুর আর ভুজিয়া নিলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াটা খুলল, হটাৎ ২ বছর আগের শেয়ার করা পোস্ট দেখছে ও। হ্যাঁ! ৭ই অক্টোবর আজ, ২৮ বছরে পা দিল আজ অনিমেষ।

২ বছর আগের ওই পোস্ট গুলো ওকে সেই পুরানো দিনগুলোতে নিয়ে গেলো। এই জন্মদিনের দিন অনিমেষ হল বাড়ির রাজা। ওর পছন্দের রান্না হবে, ওর পছন্দের ইংলিশ গানে বাড়ি কাঁপবে। পোস্টের ওই ছবিটাতে ওর ২ বছর আগের জন্মদিনের দুপুরের খাবারের পিকচার। তাতে রয়ছে  - বাসমতী চালের ফ্রাইড রাইস, ৫ রকমের ভাজাতে সাজানো থালা, আর থালাকে ঘিরে আছে বিভিন্ন সুস্বদু তরিতরকারি; বা দিক দিয়ে শুরু করলে ঢাকা যাচ্ছে: সুক্ত, পটল চিংড়ি, দই ইলিশ, কষা মুরগি, চাটনি, মিষ্টি দই, ৪ রকমের মিষ্টি ভরা ছোট্ট বাটি আর পায়েস। অনিমেষের মামনি একা হাতে প্রতি জন্মদিনে এমন করে সাজিয়ে খাওয়ায়ে।

মোবাইলটা বন্ধ করে পি.জির খাবারের দিকে তাকাল অনিমেষ, মোটা চালের ভাত আর রসম। ভাতটা মুখে দিতেই বাঁ চোখটা দিয়ে জল গড়িয়ে পরল। আজ সত্যি ওর খুব মনে পড়ছে মায়ের হাতের বাড়ির খাবারের কথা। পুরানো কথা ভাবতে ভাবতে চানাচুর দিয়ে খাবার খাবার খাছে অনিমেষ। মায়ার টান; মামনি ফোন করল, চোখের জলটা মুছে ও ফোনটা তুলল-"হ্যাঁ, মামনি বল"।
-"কি করছিস মনা?"
-"এইতো খেতে বসেছি, মামনি। তুমি কি করছ?"
-"কিছুই নারে, কাজ সেরে টি.ভি টা খুললাম, ভাবলাম মনাকে ফোন করি, কি করছে জন্মদিনের দিন ছেলেটা"
-"সকালে বললাম তো। আজ সারাদিন কোন কাজ নেই।"
-"কি খাছিস রে?"
২ সেকেন্ডের জন্য চুপ, "এইতো মামনি, ভাত, ডাল, তরকারী, আর তোমাকে বলি না যে চানাচুর দিয়ে খাই, দারুন টেস্ট লাগে"
-"কি তরকারী রে?"
-"বাঁধা কপির তরকারী, আলু দিয়ে, পুর তোমার হাতের রান্নার মতন। তুমি চিন্তা করনা মামনি, এখানে তো মণ্ডা মিঠাই পাব না, তবে বিকালে গিয়ে মিষ্টি কিনে খেয়ে নেব"
-"আছা! তুই খাঁ, বিকালে ফোন করব"
-"হ্যাঁ মামনি"।
কাঁদতে কাঁদতে ফোন রাখল দুজনেই।

নাম্বার ডিলিট

কার্ত্তিক মাসের (নভেম্বর মাস) কোনও এক ব্যাস্ত মঙ্গলবার(টুয়েসডে) রোদ্দুর ভরা সকালে অনু কালো চুড়িদার পরে তড়িঘড়ি করে যাচ্ছে বিকালপুর স্টেশনের ট্রেন টিকেট কাটার জন্য। ওহ হ্যাঁ, পরিচয় করিয়ে দি, আনুর ভালো নাম আনুমিতা দে; বাড়ি বিকালপুর , বয়স ২৬,  শ্যামবর্ণা, ৫'৪" উচ্চতা, বেশ সাস্থকর , কোঁকড়ানো চুল, হাসিবিহীন দুটি গাল আর দাম্ভির্য ভরা চোখ। আনু ওকালতি পরে বা বলা যেতে পারে ল প্রাকটিস করতে যায়ে কলকাতা কোর্টে, সপ্তাহে তিনদিন। ৩ বছর বড় দাদাও আছে ওর, কিন্তু ও যা ঠোঁটকাটা , কেই বা সাহস করে ওঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে? ওর মা তো বলা বন্ধ করে দিয়েছে, রেলের কাজ থেকে অবসরপ্রাপ্ত বাবা অসুস্থতার কারণের অনুকে বেশি ঘাটায় না। হয়তো ওকালতি যারা করে তারা এমন স্পষ্টবাদী হতে হয়ে। কিন্তু অনু তো ছোটবেলা থেকেই এমন, হয়তো ছোটবেলা থেকেই ওর উকিল হবার ইছা।

সেদিন ট্রেন খুব লেটে চলছিল। ট্রেনের সময়সীমা অনুযায়ী অনু তড়িঘড়ি করে টিকেটটা কেটে নিলো। ৪ নং প্ল্যাটফর্মের পিছনের ওভার ব্রিজের দিকে এগিয়ে গেলো । বাস্ততার মধ্যে একবার ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বার করে নোটিফিকেশান চেক করতে করতে ব্রিজ দিয়ে হেটে ২ নং প্ল্যাটফর্মের দিকে নেমে চলছে। ওর খুব অদ্ভুত স্বভাব আছে, যে কোন মোবাইল নোটিফিকেশান আসলেই আগে চেক করা, তা সে প্রত্যুত্তর এক সপ্তাহ পরে দিক না কেন।

আনমনা অনু নেমে এলো প্লাটফর্মে, ব্রিজের সিরিটার পাশেই ও দারিয়ে। আনমনা মনে অপেক্ষারত চোখ নিয়ে বাঁ দিকে ট্রেনের সিগনালের দিকে তাকাল, তখনও লাল দেখাছে। ডান দিকে ঘুরে মোবাইলটা সাইডের বাগে ঢোকাতে যাবে এমন সময়ে ওর চোখে পরল সেই জায়গাটা...

৫ বছর আগের কথা... ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট শুভর সাথে অনুর পরিচয়। শুভাদিত্ত রয়চৌধুরী ওরফে শুভ, এক সোশাল মিডিয়াতে অনুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়ে। এক দুর্গা পুজার মহাষ্টমীতে ওদের প্রথম কথা বলা শুরু। সেখান থেকে বন্ধুত্ব বাড়তে থাকে। কোন দিনক্ষণ নেই, এমনই আসতে আসতে দুজন দুজনের খুব ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে। রোজ রাতে গল্প, খুনসুটি, ঝগড়া, নিজের নিজের অহং বোধ , রাগ করে চুপি চুপি কাদা, কথা না বলার পর দুজন দুজনের সোশাল মিডিয়াতে লাস্ট সিন চেক করা আর কথায়ে কথায়ে ব্রেকাপ-- এই ছিল ওদের নিত্ত সঙ্গী। কিন্তু সেবারে অনু খুব কেঁদেছিল যখন জানতে পারল শুভকে ওর চাকরিসুত্রে বেঙ্গালরে চলে যেতে হবে। যাবার আগে ওরা শেষ বাড়ের মতন বিকালপুর স্টেশনে দেখা করে, শুভকে জরিয়ে সেই কি কান্না অনুর। অনেক প্রতিশ্রুতির মাঝে বিদায় দেয়ে অনু শুভকে।

আজ অনুর সেই দিনটার কথা মনে পরে গেলো। ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত চোখ দুটো হটাৎ কেন যেন লাল ভারাক্রন্ত হয়ে উঠল। অনু আর মোবাইলটা ব্যাগে ভরলনা, কন্টাক্ট লিস্টটা খুলে সার্চ করল - "শুভ" বলে। শুভর নীল রঙের শার্ট পরা ছবিটা ভেসে উঠল মোবাইলএ, আর জলে ভরে গেলো অনুর দুচোখ। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিলো অনু। বাঁ হাত দিয়ে আরাল করে চোখের জলটা মুছেনিল। ঠিক এইভাবেই ৫দিন কান্নাকাটি করার পর অনু নিজেকে সামলে নিয়েছিল যখন শুনেছিল রাস্তার মাঝে শুভকে একটা লরি... শেষদিনেও অনু দেখতে যায়নি। আজও চোখ ছলছল আর বুকফাটা অবস্থায় অসহায় অনু "শুভ"র নাম্বার ডিলিট করে দিল।

Wednesday, August 15, 2018

স্বাধীনতা



প্রণমি তোমায়

পেয়েছি? হ্যাঁ, পেয়েছি। শহিদেরা জীবন দিয়ে এনে দিয়েছে ভারতের স্বাধীনতা। আজও ভারতের জাতীয় পতাকায়ে গেরুয়া, সাদা , সবুজ, নীল রঙের সাথে শহীদের রক্তের লাল রঙ দেখা যায়। ব্রিটিশদের অমানবিক অত্যাচার থেকে আজ ভারতীয়রা মুক্ত। কিন্তু আজ? এতদিনের পর যদি আবার ইতিহাসের দিকে তাকাই আমার মনে আবার প্রশ্ন জাগে আমরা কি সত্যি সেই স্বাধীনতা পেয়েছি, আন্তর্জাতিক আধিপত্য ছাড়া?

রাজনৈতিক দলীয় অত্যাচার থেকে স্বাধিনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে স্বাধীনতা, বহু পুরানো কুসংস্কার চিন্তাধারা থেকে স্বাধীনতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধ্যে সোচ্ছার হবার স্বাধীনতা, পারিপার্শ্বিক চাপ থেকে মুক্ত ছিন্তাধারার স্বাধীনতা, নারী অত্যাচার থেকে স্বাধীনতা, সর্বোপরি অশিক্ষা- অরাজকতা- অন্যায়- অত্যাচার- অবিচার- নাশকতা থেকে স্বাধীনতা। বেশিই বলে ফেললাম।  বাস্তবতা দেখলে একটা দেশ স্বাধীন হবার কয়েক বছরের মধ্যেই এত উন্নত হয়না, কিন্তু আমরা হয়েছি, এটা আমার দেশ; ভারত। খুব আশা করি একশবত্ত্রিশ কোটি ভারতিয়বাসিরা যদি প্রতিদিন একটু একটু করে চেষ্টা করে তাহলে আমরা একদিন এই পুণ্যভূমিকে ঠিক পারবো হাজার হাজার বীর শহিদদের স্বপ্নের মতন করে তুলতে।

কিন্তু এখন স্বাধীনতা দিবস বলতে আমরা এখান আমরা যেটা বুঝি তা হলঃ ব্যাস্ত কর্মরত জীবন থেকে একদিনের মুক্তি, দেরী করে ঘুম থেকে উঠে সোশ্যাল মিডিয়াতে স্বাধীনতা দিবসদের একটা পাবলিক পোস্ট , অথবা দায়বদ্ধ হয়ে একটা স্তম্ভে তিরঙ্গা টানিয়ে -সোচ্ছার করে "বান্দেমাতারাম" আর "জয় হিন্দ" বলার পর চারটে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত চালানো - তা সেটা পাড়ার ক্লাব অথবা বাড়ির ছাদ, ব্যাস। সেই দেশভক্তিটা কেন জানো পরেরদিন সকালবেলা থেকে আর খুজে পাওয়া জায়না। মাটিতে লুটিয়ে পরা সেই তিরঙ্গটা সহ্য করে তার সন্তানের দাওয়া অমর্যাদা আর অশ্রদ্ধা। না, খুব নেতিবাচক চিন্তাধারা নয় আমার। প্রেরচিত হই, বহু বহু মানুষের সৎবুদ্ধি, সৎচিন্তা, সৎকর্মের দাড়া। আমি এটা বুঝিনা ওই মানুষগুলোর ভিডিও আর ছবি দেখার পর একটা লাইক বা শেয়ার ছাড়া জেড করে নিজেও কিছু করার কথা কেন ভাবিনা। এই মা কি শুধু তাদের একার? এই মায়ের দুধের একফোঁটা ঋণ কি আমরা শোধ করার চেষ্টা করতে অক্ষম? নই। তাইতো আগেই বললাম একটু চেষ্টা করলেই পারবো। কারন এটা আমাদেরই দায়িত্ব, ওই কাঠফাটা রোদ্দুর এ ঘাম ঝরিয়ে আমরা যেমন চাই আমাদের সন্তানেরা একটু সুখের মুখ দেখুক, ঠিক তেমনি একটু একটু করে ভালোবেসে একটু করে পা বাড়ানো মানে ভারত মাতাকে বলে যাওয়া- মা, তোমার আসন্ন "সন্তানেরা যেন থাকে দুধে-ভাতে"।

তিন থেকে তিনে

রবিবারের দুপুর...খাওয়া শেষ করে টিভি চালিয়ে বসে আয়েস করছিলাম। হটাত শেখরের ফোন এল- "বিকালে চা খেতে আসবি? আড্ডাও দেব"। আমি ঘড়ির দিকে ...